কলটা শেষ করে আরেক বার নিজের পরিকল্পনাটা গুছিয়ে নিলো মুশকান। রাতের এ সময় কোনো জ্যাম নেই, নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে বড়জোর চল্লিশ মিনিট লাগবে। এই সময়ে আসকার বাকি সব কিছুর ব্যবস্থা করে ফেলতে পারবে বলে তার বিশ্বাস।
বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে আসতেই দেখতে পেলেউবার প্রিমিয়ারের সিলভার রঙের প্রাডো গাড়িটা পার্কের মেইনগেটের সামনে চলে এসেছে। গাড়ির রঙটা তার কাছে অন্য অর্থ বহন করলো এ মুহূর্তে।
সিলভার লাইন ইন দ্য স্কাই!
একটু আগে টলে যাওয়া আত্মবিশ্বাসটা ফিরে পেয়েছে মুশকান।
.
অধ্যায় ৮৬
ছফার ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝরছে, মেঝেতে বসে আছে এখন। আসলামের মতো বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী নয় সে, তাই বলে সশস্ত্র অবস্থায় নিরস্ত্র একজনের সাথে পেরে উঠতে পারবে না, তা মেনে নিতে কষ্টই হচ্ছে।
কিন্তু সেটাই হয়েছে। কারণটাও তার জানা। সুস্মিতার হাতের বাঁধন খুলতে গিয়ে তাকে একটু উপুড় হতে হয়েছিলো, কোনোভাবে হয়তো পিস্তল তা করে রাখা হাতটা সরে গিয়েছিলো। আর আসলাম সুযোগ পেয়েই সদ্ব্যবহার করে ফেলেছে, চোখের নিমেষে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার উপর। ছফাকে নিয়ে আছড়ে পড়েছিলো মেঝেতে। আসলামের টার্গেট ছিলো তার ডান হাতটা, সেই হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে ফেলে শূন্যের মধ্যেই, মেঝেতে পড়ার পর তাই ছফার পিস্তলটা বেহাত হয়ে যায়।
এরপর পিএসের গানম্যান পর পর দুটো ঘুষিতেই কাবু করে ফেলে তাকে। ছফা তেমন প্রতিরোধ করার সুযোগই পায়নি। প্রথম ঘুষিটা লেগেছিলো ডান কানের পাশে, ঘুষিটা পড়তেই চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করে। এরপরই কোনো রকম সময়ক্ষেপন না করে ক্ষিপ্রতার সাথে দ্বিতীয় ঘুষিটা মারে তার মুখ বরাবর, ফলে ঠোঁট কেঁটে রক্ত বের হয় যায়। এখনও সেখান থেকে রক্ত ঝরছে।
ছফার পিস্তলটা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে তার দিকে তাক করে রেখেছে আসলাম। কিছুক্ষণ আগে আশেক মাহমুদ সুস্মিতার কোল থেকে ফোনটা নিয়ে মুশকান জুবেরিকে পাল্টা আলটিমেটাম দিয়ে দিয়েছে-এক ঘণ্টার মধ্যে ধরা না দিলে ডাক্তারের মেয়ের পরিণাম হবে ভয়াবহ। ছফা অবশ্য জানে না, মুশকান এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে কিনা।
এখন ফোনটা সোফার উপরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পিএস ঘৃণাভরে তাকালো। “দেখলেন তো কিভাবে ডিল করতে হয়, পাশার দান উল্টে দিতে হয়!”
ছফা রক্তমাথা থুতু ফেললো মেঝেতে। তিক্ততায় নাকি আক্ষেপে বোঝা গেলো না।
“এতোদিন ধরে ডিবি’তে চাকরি করে এই শিখেছেন!” ভৎসার সুরে বললো এবার।
এসব কথার জবাব দিলো না ছফা। সে এখন ভূপাতিত। পরাজিত। আস্তে করে আশেক মাহমুদের দিকে তাকালো। লোকটার চোখেমুখে বিরক্তি। আসলামের ঠোঁটে লেগে রয়েছে তাচ্ছিল্যের হাসি।
“এরে কী করবো, স্যার?” পিএসের কাছে জানতে চাইলো গানম্যান।
নুরে ছফা অবিশ্বাসে তাকালো আশেক মাহমুদের দিকে। লোকটা কী বলবে বুঝতে পারছে না, তবে খারাপ কিছুর আশঙ্কা করছে সে। এই লোক নিরীহ এক ছেলেকে গুম করে ফেলেছে এরইমধ্যে, তাকেও যে ওরকম কিছু করবে না তার কী নিশ্চয়তা আছে।
একটু গাল চুলকে নিলো পিএস, যেনো কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। “ওকে–”
অমনি হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো একজন। তাকে দেখে আশেক মাহমুদ আর আসলাম চমকে গেলো।
“কি হয়েছে, বদরুল?”
“স্যার, বাড়িতে পুলিশ আসছে!”
*
গুলশান থানার এসআই মিজান দাঁড়িয়ে আছে পিএসের গোপন আস্তানার সেই বাড়িটার সামনে। টহল পুলিশের একটি ইউনিট আছে তার সঙ্গে। আজকে তার রাতের ডিউটি পড়েছে, বিরক্তি নিয়েই টহলের মতো একঘেয়েমির কাজটা শুরু করেছিলো, কিন্তু একটু আগে থানা থেকে স্বয়ং ওসিসাহেব তাকে ফোন করে বলে দিয়েছেন, গুলশানের এই বাড়িতে রেইড দিতে হবে। বিরাট বড়সর একটি ক্রাইম সংঘটিত হচ্ছে এখানে। এক মেয়েকে নাকি আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে-এক্ষুণি তাকে উদ্ধার করতে হবে।
সাধারণত গুলশান এলাকায় এরকম ক্রাইম হয় না। অভিজাত এলাকার অভিজাত মানুষগুলোর ক্রাইমের ধরণও হয়ে থাকে বেশ আলাদা। তার চেয়েও বড় কথা, এখানকার প্রায় সব অপরাধীই ভিআইপি! যাকেই ধরা হোক না কেন, তার সাথে কোনো না কোনো ক্ষমতাবানের সম্পর্ক আবিষ্কৃত হয়। কাউকে ধরে শান্তি নেই। ফোনের পর ফোন আসবে, অনুরোধ করবে আসামি ছেড়ে দেয়ার জন্য। এমন কি পুলিশকে হুমকি-ধমকিও দিয়ে বসে অনেকে।
কিন্তু এখন যে বাড়িটার সামনে চলে এসেছে সেখানকার দারোয়ান যা বলছে সেটাকে তার কাছে মনে হচ্ছে ধাপ্পাবাজি।
প্রাইমিনিস্টারের পিএসের বাড়ি!
রাগে তার গা কাঁপছে। ইচ্ছে করছে বদমাশ দারোয়ানকে কষে একটা চড় মারতে। গেটটা সামান্য ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে সে। লোকটার সাহস দেখে অবাক হচ্ছে। তাদেরকে এ বাড়িতে ঢুকতে বাধা তো দিচ্ছেই, সেই সাথে বলছে, অপেক্ষা করতে, স্বয়ং পিএস নাকি ফোন দেবে একটু পর।
মিজানের ইচ্ছে করছে দারোয়ানকে কিলঘুষি মেরে পুলিশ নিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়তে, কিন্তু জায়গাটা গুলশান, এখানে কার সাথে যে কোন মন্ত্রী এমপির কানেকশান আছে বোঝা মুশকিল। তাই ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে সে। তবে আরেকটু দেখবে, তারপর যা করার করবে।
এমন সময় তার মোবাইলফোনটা বেজে উঠলো। ওসিসাহেব ফোন দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে কলটা রিসিভ করলো এসআই। “স্যার?”
