“এক ঘণ্টা…ঠিক আছে?”
কলটা কেটে গেলে মুশকান চেয়ে দেখলো কেএস খান সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
“কী হইছে?” সাবেক ইনভেস্টিগেটর কৌতূহল দমন করতে না পেরে জানতে চাইলো।
প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পাশের ঘরের দিকে তাকালো মুশকান। “ওখানে চলে যান। কোনো রকম শব্দ করবেন না।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো কেএস খান, আস্তে করে উঠে পাশের ঘরে চলে গেলো।
তার সিদ্ধান্ত যাই হোক, এখানে থাকার কোনো মানেই হয় না। সবার আগে এখান থেকে বেরুতে হবে।
পিস্তল আর কেএস খানের মোবাইলফোনটা পার্সে ভরে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো মুশকান।
সাবেক ডিবি অফিসারের বাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটতে শুরু করলো সে-কেন, কী উদ্দেশে কিছুই জানে না। কেএস খানকে নিয়ে তার কোনো দুর্ভাবনা নেই। ঐ লোক তাকে অনুসরন করার চেষ্টা করবে না। বাচ্চা ছেলেটার জ্ঞান ফিরলো কি ফিরলো না সেটা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকবে। হয়তো স্থানীয় কোনো ডাক্তারও ডাকতে পারে।
মি. খানের ফোনটা ট্র্যাক করে তার অবস্থান চিহ্নিত করার চেষ্টা করতে পারে ঐ পিএস, তাই সতর্কতার অংশ হিসেবে ফোনটা বের করে অফ করে দিলো সে।
সুস্মিতাকে মুক্ত করার একমাত্র সুযোগটি যে এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে, উল্টো সে নিজেই ফাঁদে পড়ে যাবে, ভাবেনি।
মাসখানেক আগে, এক জাতীয় দৈনিকে আমাদের শার্লক হোমস নামে সাবেক ডিবি অফিসারের উপরে বেশ তথ্যবহুল একটি ফিচার পড়েছিলো। সেখান থেকেই জানতে পারে, লোকটা থাকে পুরনো ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের পৈতৃক বাড়িতে। অল্প বয়সী এক ছেলে ছাড়া নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে। তিন বছর আগেই সে জেনেছিলো, সাবেক এই ডিবি অফিসার ছফার খুবই ঘনিষ্ঠজন। এর পরামর্শ নিয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে। ছফা যখন সুন্দরপুরে, তখন আসকারকে এই লোকই জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলো। সে যখন ছফাকে কাবু করে ফেলে তখন এই লোকই ফোন দিয়েছিলো। তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠটা শুনেছিলো তখন।
নুরে ছফার আর কোনো দুর্বলতা আছে কিনা, সে জানে না। থাকলেও সেটা বের করে সদ্ব্যবহার করাটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হতো। কিন্তু তার দরকার ছিলো দ্রুততম সময়ে কিছু একটা করার-এসব কারণে সময় নষ্ট না করেই মুশকান তার নিরাপদ আশ্রয় থেকে সোজা চলে এসেছিলো ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করতেই তারা কেএস খানের বাড়িটা দেখিয়ে দেয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুশকান দেখতে পেলো, সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলটা পেরিয়ে বাহাদুরশাহ পার্কের কাছে চলে এসেছে। কোথায় যাবে কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। জীবনে খুব কম সময়ই এমন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছে। হাত ঘড়িতে সময় দেখলো। এরইমধ্যে দশ মিনিট ফুরিয়ে গেছে। বাকি সময়টাতে কিছু করতে পারবে না। সুস্মিতাকে রক্ষা করার একটা মাত্রই উপায়ই আছে তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার। কিন্তু সেটা সে করতে পারে না। করলেও, সুস্মিতা যে মুক্তি পাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তার চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে ফোনটা বেজে উঠলো। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কলার আইডি দেখে কয়েক মুহূর্ত ভেবে পেলো না কী করবে-কী বলবে আসকারকে এখন!
“হ্যালো?” বেশ কয়েকবার রিং হবার পর অনেকটা বাধ্য হয়েই কলটা রিসিভ করলো সে। নইলে আসকার আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে।
উদ্বিগ্ন ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইলেন সুস্মিতার কী অবস্থা এখন। তার মুক্তির ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়েছে কিনা। অনেকক্ষণ ধরে মুশকান তাকে ফোন করেনি বলে খারাপ কিছুর
আশঙ্কা করছেন তিনি।
নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো মুশকান। দুঃসংবাদটা শোনানোর কোনো ইচ্ছে তার নেই, কিন্তু না বলেও পারছে না। এতে ধকলও হয়তো সামলাতে পারবে না বেচারি। তাই তাকে আরেকটু অপেক্ষা করতে বললো। খুব বেশি চিন্তা যেনো না করে।
এ কথা শোনার পর ফোনের ওপাশে কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো, তারপর আস্তে করে ডাক্তার জানালেন, তিনি একটা তথ্য জানতে পেরেছেন, বুঝতে পারছেন না এ মুহূর্তে এটা তেমন কোনো কাজে লাগবে কিনা।
মুশকান খুব একটা আগ্রহী না হলেও জানতে চাইলো। এরপর আসকার ইবনে সায়িদ এক নাগারে বলে গেলেন, হাসপাতালের হসপিস সার্ভিস সম্প্রসারণের জন্য যে প্রজেক্ট ফাইলটা ছিলো সেটা দেখে তার একটা বিষয় মনে পড়ে যায় একটু আগে, তারপর খোঁজ নিয়ে যা জানতে পেরেছেন তাতে বেশ অবাক হয়েছেন তিনি। তার কাছে মনে হয়েছে, এই তথ্যটা হয়তো কোনোভাবে তার সাহায্যে আসতে পারে।
তথ্যটা পাবার পর মুশকান কয়েক মুহূর্ত মূর্তির মতো জমে রইলো। তার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে এটা। একটু আগেও রীতিমতো চোখে অন্ধকার দেখছিলো সে। সিদ্ধান্তহীনতার চরম সঙ্কটে ভুগছিলো।
গভীর করে নিশ্বাস নিয়ে নিলো এবার। এখন তাকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে হবে। কোনো ভুলই করা যাবে না। চিন্তাভাবনা গুছিয়ে নিয়ে দ্রুত একটা পরিকল্পনা করে ফেললো সে। শান্ত কণ্ঠে আসকারকে বলে দিলো, কী করতে হবে। তার হাতে যেটুকু সময় আছে, এ কাজের জন্য যথেষ্ট।
ডাক্তারের সাথে কথা শেষ করার পর গুলশানে গন্তব্য ঠিক করে নিয়ে একটা উবার ডাকলো। ড্রাইভারকে ফোন করে বলে দিলো বাহাদুরশাহ পার্কের কথা। জায়গাটা চিনতে বেগ পেলো ড্রাইভার। মুশকান অবশ্য খুব একটা অবাক হলো না এতে। পুরনো নাম ভিক্টোরিয়া পার্ক বললে অবশ্য চিনতে পারলো ড্রাইভার। তাকে জানালো, সে এখন খুব কাছেই আছে-সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই চলে আসবে।
