“ঐ ডাইনিটাকে পাবার একটাই উপায় আছে,” আশেক মাহমুদ। সুস্মিতার দিকে ইঙ্গিত করলো। “এই মেয়েটাকে আমাদের কজায় রাখা। মুশকান নিজের দুর্বলতা দেখিয়ে দিয়েছে, এটা কি আপনি বুঝতে পারছেন না?”
“বুঝতে পেরেছি,” সুস্মিতার বাঁধন খুলতে খুলতেই বললো ছফা। “কিন্তু কেএস খান আর ঐ বাচ্চা ছেলেটার জীবন…” কথা শেষ করলো না সে।
পিএস হতাশ হলো এ কথা শুনে। “এই মেয়েকে ছেড়ে দিলেই যে ঐ ডাইনি ওদেরকে হত্যা করবে না তার কি গ্যারান্টি আছে?”
কথাটা শুনে থমকে গেলো ছফা, পিএসের দিকে স্থিরচোখে তাকালো সে।
“কোনো গ্যারান্টি নেই,” বেশ জোর দিয়ে বললো আশেক মাহমুদ। “কাজ বাগিয়ে নেবার পর ঐ মহিলা তার কথা রাখবে না, ছফা। বোঝার চেষ্টা করুন।”
কথাটা একটু বিবেচনা করে দেখলো সে। পিএস যে খুব ভুল বলছে তা নয়। কাজশেষে মুশকান তার কথা না রাখলে কী করার থাকবে?
কিন্তু মাথা থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আবারো সুস্মিতার হাতের বাঁধন খোলার দিকে মনোযোগ দিলো। মুশকানের দাবি মেটালে সে খুনখারাবি করতে যাবে না-এরকম বিশ্বাস তার আছে। সুতরাং এ মুহূর্তে এসব ভেবে সময় নষ্ট করার মানে দু দুটো মানুষের জীবন…
হঠাৎ চোখের কোণ দিয়ে কিছু একটা ধেয়ে আসতে দেখতে পেয়ে চমকে তাকালো ছফা, কিন্তু ততোক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে!
.
অধ্যায় ৮৫
প্রবল উত্তেজনায় কানে ফোন চেপে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখেছে মুশকান।
এতোক্ষণ ছফার সাথে পিএসের কথোপকথনের সবটাই শুনেছে সে, বুঝতে পেরেছে ঘরে আরেকজন আছে-খুবই ষণ্ডা প্রকৃতির একজন মানুষ। আর সেই মানুষটাই সম্ভবত নুরে ছফার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে একটু আগে। ধস্তাধস্তির শব্দ আর সুস্মিতার চিৎকার স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে। তার প্ল্যানটা যে ভণ্ডুল হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছে। ঘুনাক্ষরেও ধারণা করতে পারেনি, ছফা ছাড়া আরো কিছু মানুষ থাকবে-যারা ছফার চেয়েও বেশি ক্ষমতা রাখে!
মুশকানের কপালে ভাঁজ পড়ে গেলো। ডাক্তার তাকে জানিয়েছে, সুস্মিতাকে অপহরণ করার পেছনে প্রধানমন্ত্রীর পিএস জড়িত। নিজের বোনের ছেলের সাথে যা ঘটেছে তার প্রতিশোধ নিতে চাইছে লোকটা।
মুশকান জানে, সুস্মিতাকে মুক্ত করার জন্য কেএস খানকে জিম্মি করাটা একেবারেই যথার্থ ছিলো-ভুল একজন মানুষকে আটকে রেখে ছফা এ দু জন নিরীহ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দেবে না। তার ধারণাই ঠিক, কথামতোই কাজ করেছিলো ছফা, কিন্তু পিএস তাতে বাগড়া দিয়ে বসে, তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, এটা করা একদমই ঠিক হবে না।
“একদম নড়বি না কুত্তারবাচ্চা! গুলি করে মাথা উড়িয়ে দেবো।”
ছফার উপরে যে লোক হামলে পড়েছে তার কণ্ঠটা শুনতে পেয়ে প্রচণ্ড হতাশ হলো মুশকান। ছফা পারেনি! পরাস্ত হয়ে গেছে ষণ্ডাটার কাছে। একটা গোঙানি শোনা গেলো ফোনের ওপাশ থেকে। সম্ভবত ছফারই হবে সেটা।
“ঐ খানকি, একদম নড়বি না!”
একই কণ্ঠ এবার হুমকির সুরে বললো। অবশ্যই সুস্মিতাকে!
“হ্যালো…মুশকান জুবেরি!”
অন্য একটা কণ্ঠ বলে উঠলো ফোনে, চমকে উঠলো সে। বুঝতে পারলো, এটা পিএসের কণ্ঠই হবে।
“তোর পাঁচ মিনিট তো মনে হয় শেষ হয়ে গেছে, তাই না?”
মুশকান কোনো জবাব দিলো না। “এখন চাইলে, তুই ওদের মেরে ফেলতে পারিস।”
“না!” ফোনের ওপাশ থেকে নুরে ছফার আর্তনাদ শোনা গেলো।
“এবার তোকে আমি একটা প্রস্তাব দিচ্ছি…মন দিয়ে শোন,” একই কণ্ঠটা বললো। “তুই যদি আমার কাছে ধরা না দিস, তাহলে এই মেয়েটাকে কী করবো জানিস?” একটু থেমে আবার বললো। “তিন তিনটা বাঘের কাছে একটা হরিণ ছেড়ে দিলে যা হয় আর কি!”
গভীর করে নিশ্বাস নিয়ে নিলো মুশকান। “ওর কিছু হলে অনেক পস্তাতে হবে…সবাইকে!” মুখ খুললো অবশেষে।
হা-হা-হা করে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়লো ওপাশে যে আছে। “তুই কিছুই করতে পারবি না। ধরা তোকে পড়তেই হবে। ভালো হয়, নিজে এসে ধরা দিলে, তাহলে অন্তত এই নিরীহ মেয়েটা বেঁচে যাবে।”
গভীর করে নিশ্বাস নিয়ে নিলো মুশকান। টলে যাওয়া চিন্তাভাবনা সুস্থির করা দরকার।
“একটা ব্যাপারে আমি গ্যারান্টি দিতে পারি-তুই ধরা দিলে এই মেয়েকে কিছুই করবো না।” একটু থেমে আবার বললো, “তোর মতো মানুষখেকো নই আমি, আমাকে বিশ্বাস করতে পারিস।”
চকিতে সাবেক ইনভেস্টিগেটর কেএস খানের দিকে তাকালো সে। এই লোককে নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়। দেখেই বোঝা যায়, কোনো রকম ঝামেলা করার চেষ্টা করবে না। প্রখর বুদ্ধিই তার একমাত্র শক্তি। এখন পর্যন্ত কোনো কথা না বলে চুপচাপ তাকে দেখে যাচ্ছে। শুধু তার চোখদুটোতে রাজ্যের যতো কৌতূহল।
এভাবে বোকার মতো নিজেকে সমর্পণ করার কথা সে ভাবতেও পারে না, আবার সুস্মিতার কিছু হোক সেটাও চাইছে না–কঠিন এক সঙ্কটে পড়ে গেলো মুশকান।
“আমি জানি, তুই কোথায় আছিস,” বললো কণ্ঠটা। “তাই তোকে আমি এক ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। এর এক মিনিটও বেশি না।”
মুশকান আবারো তাকালো কেএস খানের দিকে। ভদ্রলোকের কপালে ভাঁজ পড়ে গেছে। বোঝার চেষ্টা করছে পরিস্থিতিটা কি।
“গুলশানে এসে এই নাম্বারে ফোন দিবি…এক ঘণ্টার মধ্যে। যদি না আসিস, এই মেয়েটার এমন হাল করবো…” শেষ কথাটা দাঁতে দাঁত পিষে বললো।
নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলো মুশকান, হ্যাঁ-না কিছুই বললো না।
