আরেকটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আসকারের ভেতর থেকে। মুশকানকে তিনি যেমন সাহায্য করেন সব সময়, সে-ও তার যেকোনো বিপদে পাশে এসে দাঁড়ায়। কলকাতায় সুস্মিতা যে দুর্ঘটনাটা ঘটিয়েছিলো, সেটাও মুশকানই সামাল দিয়েছে ঠাণ্ডা মাথায়। তাই সব কিছুর জন্য নুরে ছফা আর প্রধানমন্ত্রীর পিএস আশেক মাহমুদকেই দায়ী করছেন তিনি-মুশকানকে নয়।
এই লোকটা ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে সে। ঐ পিএস নাকি তার বোনের ছেলে হাসিবের নিখোঁজের জন্য মুশকানকে দায়ী মনে করে। ডিবি অফিসার ছফাও তাকে বলেছে, এই লোকের বড় বোন সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকায় মুশকানের প্রতিবেশী ছিলো।
ভাবা যায়, কতোটা কাকতালীয় ঘটনা!
মুশকানের সাথে কিছুক্ষণ আগে কথা হয়েছে তার, ঐ ভদ্রমহিলাকে চিনতে পেরেছে সে। শুধু প্রতিবেশীই নয়, তারা বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলো।
সেই মহিলা, হাসিবের মা এখন ক্যান্সারে আক্রান্ত। মরণাপন্ন বোনের শেষ ইচ্ছা, তার সন্তানকে যে গুম করেছে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে দেখবে-সেজন্যেই পিএস তার ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে যাচ্ছে।
মুশকান তাকে আশ্বস্ত করেছে, সুস্মিতাকে যে করেই হোক মুক্ত করবে সে। কিন্তু তার কথায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না তিনি। বিরাট ক্ষমতাবান একজনের সাথে কী করে পেরে উঠবে মুশকান, তার মাথায় ঢুকছে না। ওর কাছে এমন কিছু নেই যে, পিএসকে বাধ্য করতে পারবে সুস্মিতাকে ছেড়ে দিতে।
নিজের ডেস্কের চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ ভেবে গেলেন তিনি। সত্যি বলতে, তার মাথা কাজ করছে না আর। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ খুললেন। রাত গাঢ় হচ্ছে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু মুশকানের কাছ থেকে কোনো ফোন আসেনি এখনও। মনে হচ্ছে না খুব শিগগির কোনো সুখবর পাবেন। মুশকানকে কোনোভাবে যদি সাহায্য করা যেতো!
আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ডেস্কের দিকে তাকালেন ডাক্তার। অনেকগুলো ফাইল পড়ে আছে সেখানে দীর্ঘদিন থেকেই, একটাও ছুঁয়ে দেখেননি। তবে এই ফাইলগুলো জরুরী কিছুও নয় যে, পড়ে থাকলে হাসপাতালের কাজকর্মে কোনো ব্যাঘাত হবে। প্রায় তিন বছর ধরে হাসপাতালে অনিয়মিত তিনি, সেজন্যে এই প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ, পরিবর্ধন, নতুন নিয়োগ, নতুন বিভাগ চালু করা, আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা-এরকম অসংখ্য প্রপোজালের ফাইল পড়ে আছে দীর্ঘদিন থেকেই। আরো কতোদিন পড়ে থাকবে কে জানে!
আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে যে-ই না চোখ সরাবেন, তখনই একটা ফাইলের দিকে চোখ গেলো তার।
হসপিস!?
সঙ্গে সঙ্গে একটা ভাবনা খেলে গেলো তার মাথায়।
.
অধ্যায় ৮৪
লোকটা কি পাগল হয়ে গেলো?
পিএস আশেক মাহমুদের বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে নুরে ছফার মতো ডিবির একজন ইনভেস্টিগেটর তার দিকে পিস্তল তাক করতে পারে। এই আত্মঘাতী কাজটা তাকে এবং তার সেই সিনিয়র কলিগ, কাউকেই রক্ষা করতে পারবে না, এটা বোঝার মতো বুদ্ধি লোপ পেয়ে গেছে।
আসলামও অবিশ্বাসে তাকিয়ে আছে ছফার দিকে, রাগে ফেটে পড়বে যেনো।
হাত-পা বেঁধে চেয়ারে বসিয়ে রাখা সুস্মিতা বিস্ফারিত চোখে একবার ছফার দিকে তো আরেকবার পিএস আর আসলামের দিকে তাকাচ্ছে। ঘটনা কোন্ দিকে মোড় নিচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
“পিস্তলটা নামান, ছফা, চোয়াল শক্ত করে বললো আশেক মাহমুদ।
“সরি, স্যার,” জবাব দিলো সে। “আমার হাতে সময় নেই। ভুল একজন মানুষের জন্য আমি দু দুটো প্রাণ শেষ হতে দিতে পারি না।” সুস্মিতার দিকে ইঙ্গিত করে বললো, “আমি এখন পুরোপুরি নিশ্চিত, ও মুশকান না!”
গভীর করে দম নিয়ে নিলো পিএস। “আপনি এখান থেকে এই মেয়েটাকে নিয়ে বের হতে পারবেন না। খামোখা কেন এসব করছেন!”
আসলামের দিকে তাকালো ছফা। পিস্তলটা এখন তার দিকেই তাক্ করা। কাঁধ তুললো সে। “দু-জন মানুষকে বাঁচানোর জন্য আমাকে এটা করতেই হবে। কেউ বাঁধা দিলে আমার কিছু করার থাকবে না।”
বাঁকা হাসি দিলো পিএস। “আপনি কি আমাকেও গুলি করবেন?”
ছফা এ কথার কোনো জবাব দিলো না। হঠাৎ তার মনে হলো পাঁচ মিনিট সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এততক্ষণ খেয়ালই ছিলো না, ফোনে মুশকান জুবেরি আছে। সঙ্গে সঙ্গে বামহাতে থাকা ফোনটা কানে চেপে ধরলো। “হ্যালো?”
“হ্যা…বলো?” ওপাশ থেকে জবাব দিলো মুশকান।
হাফ ছেড়ে বাঁচলো সে। “আমাকে আরেকটু সময় দিতে হবে, প্লিজ!”
দীর্ঘশ্বাস ফেললো মুশকান। “ঠিক আছে…তবে কলটা কেটে দিও না। আর একটু সতর্ক থেকো।”
ছফা কিছু না বলে ফোনটা আবার নামিয়ে রাখলো। আসলামের দিকে তাকালো সে। সুস্মিতাকে ইঙ্গিত করে বললো, “ওর হাতে-পায়ের বাঁধন খুলে দাও।”
গানম্যান অবিশ্বাসে চোখ কুঁচকে ফেললো। “তুই আমাকে অর্ডার দেবার কে?” রেগেমেগে বললো সে।
ছফা কিছু বলতে গিয়েও বললো না। সে নিজেই এগিয়ে গেলো সুস্মিতার কাছে। মেয়েটার কোলে ফোনটা রেখে আসলামের দিকে পিস্তল তা করেই এক হাতে বন্দীর বাঁধন খুলতে শুরু করলো।
“আপনি বিরাট বড় ভুল করছেন, ছফা।” শান্ত কণ্ঠে বললো পিএস। “এখনও সময় আছে, এসব বাদ দিন। আমি বুঝতে পারছি, আপনি ঐ লোকটাকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া, কিন্তু এভাবে ঐ ডাইনির দাবি মেটানো ঠিক হবে না।”
ছফা কথাগুলো কানেই তুললো না। সে সুস্মিতার বাঁধন খুলতেই মনোযোগি। এক হাতে কাজটা করতে বেশ বেগ পাচ্ছে সে।
