“ফাজলামি করেন আমার সাথে!?” অবিশ্বাসে বলে উঠলো আশেক মাহমুদ।
“ওকে ছেড়ে দেবো? পুরোপুরি কনফার্ম না হয়ে?”
“স্যার, দাঁতে দাঁত পিষে বললো ছফা। “আমি কনফার্ম হয়ে বলছি, এই মেয়ে মুশকান জুবেরি না। মুশকানের সাথে এইমাত্র আমার ফোনে কথা হয়েছে, এখনও লাইনে আছে সে।”
আশেক মাহমুদ কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলো ছফার দিকে। “ফাইন!” তারপর হাসিমুখে বলে উঠলো, “তাহলে ঐ মুশকানকে বলে দিন, সে ধরা দিলে আমরা একে মেরে ফেলবো!”
অবিশ্বাসে চেয়ে রইলো ছফা।
“ওই ডাইনিকে ধরা দিতে হবে আমাদের হাতে, নইলে এই মেয়েটার সাথে খুব খারাপ কিছু করা হবে।”
“স্যার, মুশকান ধরা দেবে না, বোঝার চেষ্টা করুন!” জোর দিয়ে বললো ছফা। “আমরা ভুল একজনকে ধরেছি। ওকে ছেড়ে না দিলে দুটো মানুষের জীবন-”
“দুটো কেন, চার-পাঁচটা মানুষ মরে যাক, আমার কী!” আশেক মাহমুদ কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলে উঠলো। আমি ওকে ছাড়ছি না।”
ছফা চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করলো। পিএস যে এরকম কথা বলবে একদমই বুঝতে পারেনি। “আপনি বোঝার চেষ্টা করুন, স্যার!”
“এই মেয়েকে ছেড়ে দেবার চিন্তা বাদ দিন। আপনি ঐ মুশকানকে ট্র্যাক করুন। এক্ষুণি!” হুকুমের স্বরে বললো আশেক মাহমুদ।
“আমার হাতে সময় নেই।”
“কে আপনাকে সময় বেঁধে দিয়েছে? ঐ মহিলা? ঐ ডাইনিটা?” রেগেমেগে বললো পিএস।
ছফা নিশূপ রইলো।
“আই সে, ট্র্যাক হার ডাউন!” প্রায় গর্জে উঠলো পিএস।
আক্ষেপে মাথা দোলালো সে, ডান হাত থেকে মোবাইলফোনটা বাঁ হাতে নিয়ে নিলো, তারপর ঝট করে কোমর থেকে তুলে নিলো পিস্তলটা, সোজা তা করলো আশেক মাহমুদ আর আসলামের দিকে। কয়েক পা পিছিয়ে গেলো দু-জনকে নিশানায় রাখার জন্য।
“সরি, স্যার। আমার কিছু করার নেই।”
“হাউ ডেয়ার ইউ আর!” দাঁতে দাঁত পিষে বললো আশেক মাহমুদ। রাগে রীতিমতো কাঁপছে।
আসলাম যেনো বিস্ফোরিত হবে, তেড়ে আসতে চাইলো সে।
“খবরদার!” পিস্তলটা তার দিকে তাক করে বললো ছফা। “একদম নড়বে না।”
.
অধ্যায় ৮৩
ডাক্তার আসকার অরিয়েন্ট হাসপাতালের নিজের অফিস রুমে বসে আছেন। তার শরীর আগের চেয়ে ভালো তা বলা যাবে না। যদিও মনে হচ্ছে, রাত শেষ হবার আগেই তার নাজুক হৃদপিণ্ড এতো বেশি মানসিক চাপ সহ্য করতে পারবে না। সুস্মিতা নিরাপদে আছে-এটা না জানা পর্যন্ত বুকের এই ব্যথার উপশম হবে না।
সুস্মিতা এখন ক্ষমতাবান একজন মানুষের হাতে বন্দী। না জানি কতোটা অত্যাচার আর নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা! সন্তানকে এই বিপদে ফেলে দেয়ার জন্য তিনি নিজেই দায়ি! মেয়েটার কিছু হয়ে গেলে নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারবেন না।
ছফার আগমণ টের পেয়ে নিজের সেলফোনটা ভেঙে কমোডে ফ্ল্যাশ করে দেন, আর সিমটা খুলে লুকিয়ে রাখেন কার্পেটের নীচে। ফলে, মেয়েটাকে জানাতেই পারেননি তিনি সুস্থ আছেন। সত্যি বলতে, সুস্মিতা যে তার খোঁজ করে, তাকে না পেয়ে ওয়াহাবকে ফোন দিতে পারে-এটা মাথায়ই ছিলো না। অসুস্থতার ভাণ করতে গিয়ে ওয়াহাবকে তিনি সত্যিটা জানাননি। ছেলেটাকে সেজন্যে দোষ দেয়া যাচ্ছে না। সে যা দেখেছে তা-ই বলেছে সুস্মিতাকে।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আসকার। শুভমিতা আর তার লাভচাইল্ড এই মেয়ে। তার জন্যই শুভমিতার সাথে বন্ধনটা পাকাপাকি করতে হয়েছিলো। কতোই না আদরের, কতোই না যত্নে বড় করেছেন। আর আজ, সমস্ত ক্ষমতা ব্যবহার করেও কিছুই করতে পারছেন না। ঘুণাক্ষরেও যদি জানতেন, মুশকানকে সাহায্য করতে গেলে নিজের সন্তানের উপর এতো বড় বিপদ নেমে আসবে তাহলে কি তিনি কখনও কলকাতায় মুশকানকে আশ্রয় দিতেন?
আরেকটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার ভেতর থেকে। মুশকানের সাথে তার বন্ধুত্ব সুদীর্ঘ কাল ধরে। এই দীর্ঘ সময়ে যখনই দরকার পড়েছে, তারা একে অন্যেকে সাহায্য করেছে। তাদের বন্ধুত্বের এই শক্ত বন্ধন কখনও নড়বড়ে হয়নি, বরং দিনকে দিন সেটা পোক্ত হচ্ছে!
তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা শুভমিতার আগমণ মুশকানের কল্যাণেই। লন্ডনে আসার পর শুভমিতার সাথে মুশকানের বন্ধুত্ব হয় খুব দ্রুত। তারা দুজনেই ছিলো রবীন্দ্র সঙ্গীতের ভক্ত। ভালো গাইতেও পারতো। মুশকানই একদিন তার সঙ্গে শুভমিতার পরিচয় করিয়ে দেয়। প্রথম দেখাতেই আসকারের মনে হয়েছিলো, সত্যিকারের ভালোবাসার সন্ধান পেয়ে গেছেন। মুশকানকে যখন কথাটা জানালেন, সে তো হেসে খুন। এতো দ্রুত? এতে স্বল্প সময়ে? লজ্জা পেয়েছিলেন আসকার। তবে গল্প-সিনেমার মতোই তাদের সম্পর্কটা প্রেমের দিকে গড়ায়, আর এক্ষেত্রে মুশকানের অবদানই ছিলো বেশি।
অতীত থেকে বাস্তবে ফিরে আসতে চাইলেন ডাক্তার। তিন বছর আগে, ঐ কেএস খানের কথার ছলচাতুরিতে পড়ে নার্ভাস ব্রেক ডাউনের শিকার হয়ে যদি মুশকানের আন্দিজের ঘটনার কথাটা না বলতেন, তাহলে এতো কিছু হতো কিনা কে জানে! যদিও তার এই ভুলের মাশুল তিনি শুধরেছেন কয়েক দিন আগে ছফাকে আরেকটি নতুন উপাখ্যান শুনিয়ে। অবশ্য এই উপাখ্যানটির জন্ম হয়েছিলো আরো অনেক আগে, যখন আমেরিকা থেকে অরিয়েন্ট হাসপাতালে এক ডাক্তার এসে মুশকানের সম্পর্কে গা শিউরে ওঠা কথা বলতে থাকে। তখনই জন্ম নেয় রুখসান আর মুশকানের গল্পটার। এটা মুশকানেরই আইডিয়া ছিলো। তাকে বলেছিলো, ঐ ডাক্তারকে যেনো এই গল্পটা বলা হয়। বলাই বাহুল্য, বেশ ভালোভাবেই ওটা কাজে দিয়েছিলো। গল্পটা বিশ্বাস করেছিলো ভদ্রলোক। কিন্তু ছফা সম্ভবত বিশ্বাস করেনি। সবটা শোনার পর সে-ও কিছুক্ষণ ধন্দে পড়ে গেছিলো, তারপরই সমস্ত সন্দেহ কাটিয়ে ওঠে।
