ওপাশ থেকে নীরবতা নেমে আসে।
“আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর, আমার সামনে যে বইসা আছে সে-ই মুশকান জুবেরি।”
ছফা হতভম্ব হয়ে গেছিলো।
“ভুল মানুষরে ট্র্যাক করছেন আপনে, এই ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নাই এখন।”
“মাই গড!” অস্ফুটস্বরে বলে উঠেছিলো ছফা। “…আপনার কাছে কেন এসেছে?…কী চায় সে?”
“যারে ধরছেন তারে যে আপনে ছাইড়া দেন। আর যদি না দেন…” গলা ধরে আসে কেএস খানের। “আমারে আর আইনস্টাইরে…বুঝবারই
তো পারছেন, তার কাছে একটা পিস্তলও আছে!”
“ওহ্!” জোরেই বলেছিলো ছফা, তারপরই জানতে চায়, “আইনস্টাইন কোথায় এখন, স্যার?”
“ওরে অজ্ঞান কইরা ফালাইছে।”
“ছফাকে বলুন, এই ফোন কলটা যেনো কেটে না দেয়, কেএস খানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে মুশকান। “কল কেটে দিলেই আপনাদের দুজনকে আমি শেষ করে দেবো।”
মি, খান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আতঙ্কভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিলো মুশকানের দিকে।
“ফোনটা ওকে দিন, স্যার,” ছফা বলেছিলো। আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।”
“ছফা আপনের সাথে কথা বলতে চাইতাছে।”
মুচকি হেসে মুশকান ফোনটা হাতে নিয়ে বেশ শান্ত কণ্ঠেই বলে, “হ্যালো, নুরে ছফা!”
.
অধ্যায় ৮২
ছফার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে ফোনের ওপাশে আছে মুশকান জুবেরি যাকে সে হন্যে হয়ে খুঁজছে বিগত তিন বছর ধরে। তার চেয়েও বড় কথা, কলকাতায় গিয়ে মাত্রই সে আবিষ্কার করেছে, এই মহিলা নিজের চেহারা পাল্টে, সুস্মিতা সমাদ্দার সেজে সুন্দরপুরের নতুন স্কুলে গানের শিক্ষকতা করছে! সেই সুস্মিতা সমাদ্দার এখন তাদের হাতেই বন্দী!
ছফার মনে হচ্ছে, তিল তিল করে বানানো বিশাল বড় একটি ভবন গুঁড়িয়ে পড়ছে চোখের নিমেষে-তাসের ঘরের মতো! নিজেকে পরাবাস্তব জগতে আবিষ্কার করলো সে। যে অসম্ভব গল্পের সন্ধান পেয়েছিলো সেটা যেনো মুখ থুবড়ে পড়েছে।
“আমাকে ভেবে তুমি সুস্মিতাকে আটকে রেখেছো!” ফোনের ওপাশ থেকে কথাটা বলেই হেসে ফেললো মুশকান।
ছফার চোখেমুখে একইসাথে বিস্ময় আর বিব্রত হবার অভিব্যক্তি। কয়েক মুহূর্তের জন্য হতবুদ্ধিকর হয়ে পড়লো সে। বন্দীর দিকে তাকালো। সুস্মিতা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে, বোঝার চেষ্টা করছে কিছু। আর আশেক মাহমুদ, আসলাম কৌতূহল নিয়ে চেয়ে আছে তার দিকে।
“আমি জানি তুমি এখন ওর সামনেই আছো…ওকে ছেড়ে দাও!” শান্ত কণ্ঠে কর্তৃত্বের সুরে বললো মুশকান। “মি, খান আর বাচ্চা ছেলেটা প্রাণে বেঁচে যাবে।”
নুরে ছফা কী বলবে ভেবে পেলো না।
“এই কলটা কেটে গেলে ধরে নেবো তুমি চালাকি করছো, পুলিশকে ইনফর্ম করার চেষ্টা করছো, একটু থেমে কণ্ঠটা আরো গম্ভীর করে বললো, “এটা কোরো না, করলে আমি বাধ্য হবো ওদেরকে শেষ করে দিতে।”
“ওদের কিছু করবে না, খবরদার!” দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো ছফা।
এ কথা শুনে ঘরের সবাই বিস্ফারিত চোখে তাকালো তার দিকে।
“সেরকম কিছু করার ইচ্ছেও নেই আমার, কিন্তু চালাকি করলে সেটা করতে বাধ্য হবো আমি।” ফোনের ওপাশ থেকে বললো মুশকান।
পিএস ইঙ্গিতে জানতে চাইলো কার সাথে কথা বলছে ছফা। এক হাত তুলে তাকে আশ্বস্ত করে বললো, “আমাকে একটু সময় দিতে হবে।”
“কীসের জন্যে?”
“সিদ্ধান্ত নিতে।”
“তুমি নিজে কি যথেষ্ট নও? সুস্মিতা কি তোমার কাছে বন্দী নয়?”
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ছফার ভেতর থেকে। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
“চালাকি কোরো না। আমি জানি ও তোমার কাছেই আছে। এক্ষুণি সুস্মিতাকে ফোনটা দাও, আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই…এক মিনিট।”
ছফা সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না।
“আমার হাতে সময় খুব কম!” ফোনের ওপাশ থেকে তাড়া দিলো মুশকান।
মন্ত্ৰতাড়িতের মতো সুস্মিতার কাছে গিয়ে ওর কানে ফোনটা চেপে ধরে দাঁতে দাঁতে পিষে বললো ছফা, “কথা বলো।”
“কী করছেন?” পিএস আৎকে উঠলো। আসলাম অবিশ্বাসে তাকিয়ে আছে, কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
“প্লিজ,” হাত তুলে পিএসকে থামিয়ে দিলো ছফা, মুখে আঙুল তুলে চুপ থাকার ইশারা করলো।
“হ্যালো? কে বলছেন?” সুস্মিতা বলে উঠলো। তারপর ফোনের ওপাশে যে আছে তার কথা শুনে গেলো চুপচাপ। মেয়েটার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো সামান্য। “হুম…” বললো সে। “ঠিকাছে।” কথাটা বলেই ফোন থেকে কানটা সরিয়ে নিলো।
ওদের কথা শেষ হয়ে গেছে বুঝতে পেরে ফোনটা আবার নিজের কানে ঠেকালো ছফা।
“আরেক জনের কণ্ঠ শুনলাম…ওকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব তোমার। এই কলটা না কেটেই তুমি সুস্মিতাকে মুক্তি দেবে। পাঁচ মিনিট সময় দিলাম তোমাকে।”
“আমাকে কথা বলতে হবে, এতো কম সময়ে হবে না,” রেগেমেগে বলে উঠলো নুরে ছফা।
“এক মুহূর্তও নষ্ট কোরো না। মনে রেখো, পাঁচ মিনিট।”
ছফা ফোনটা নামিয়ে পিএসের দিকে তাকালো। “এই মেয়ে মুশকান জুবেরি না, স্যার।”
“কি?!” বিস্ময়ে বলে উঠলো আশেক মাহমুদ।
“আমরা ভুল মানুষকে ধরেছি।”
হতভম্ব হয়ে তাকালো পিএস। “কিন্তু আপনি তো কলকাতা থেকে সব জেনে এসেছেন!”
গভীর করে দম নিয়ে নিলো ছফা। তার পুরো তদন্তটা যে এভাবে হাস্যকর হয়ে উঠবে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। “আমার হিসেবে একটু ভুল হয়ে গেছে…মনে হচ্ছে।”
সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো পিএস। “কী বলছেন এসব!”
আসলামও সন্দেহভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।
“ওকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে মুক্তি না দিলে আমার এক সিনিয়র রিটায়ার্ড অফিসার কেএস খান আর তার কাছে থাকা এক বাচ্চা ছেলেকে মুশকান মেরে ফেলবে! ও ওদেরকে জিম্মি করে রেখেছে।”
