“একদম আওয়াজ করবেন না,” শান্তকণ্ঠে বলেছিলো মিসেস জুবেরি। “আপনার সাথে আমার জরুরী কথা আছে।”
“আইনস্টাইরে কী করছেন?” ঢোঁক গিলে প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠে জানতে চেয়েছিলো কেএস খান।
ভুরু কুঁচকে ফেলেছিলো মহিলা। “কার কথা বলছেন?!”
ভুলটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠেছিলো, “ঐ পোলাটা…দরজা খুইলা দিছে যে।”
“ওহ্,” মুশকান জুবেরি বুঝতে পেরে বলেছিলো। “ওর নাম আইনস্টাইন?”
আবারো ঢোঁক গিলে মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিলো মি. খান। “হ…আমি দিছি…নামটা।”
“সুন্দর নাম!” প্রশংসার সুরে বলে ওঠে মুশকান। তারপর দেয়ালে টাঙানো আইনস্টাইনের জিভ বের করে রাখা কৌতুককর ছবিটার দিকে তাকায়।
খোদাদাদ শাহবাজ খান বুঝতে পারছিলো না, নুরে ছফা তাহলে কোন্ মুশকানকে খুঁজে পেয়েছে কলকাতায় গিয়ে? আর সুন্দরপুরেই বা গেলো কাকে ধরতে? ছফা তাকে জানিয়েছে, এই মহিলা কলকাতায় গিয়ে এক প্লাস্টিক সার্জনকে দিয়ে নিজের চেহারাটাই বদলে ফেলেছে! শুধু তা-ই নয়, সেই সঙ্গে নতুন পরিচয় আর সুস্মিতা সমাদ্দার নাম নিয়ে ফিরে গেছে সুন্দরপুরে! ছফার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তার সামনে এখন যে আছে সে কে?
এই মহিলাকে মুশকান হিসেবে মেনে নিতে কোনো দ্বিধা নেই তার। কদিন আগেই মহিলার ছবি তাকে দেখিয়েছিলো ছফা। ঐ ছবির সাথে এই মহিলার চেহারা একদম…
“ওকে নিয়ে ভাববেন না।”
মুশকানের কথায় কেএস খানের চিন্তায় ছেদ পড়ে। “কার কথা কইতাছেন?”
“আইনস্টাইন। ওকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। ও এখন ঘুমাচ্ছে,” কথাটা বলে হাতঘড়িতে সময় দেখে নেয়। “আধঘণ্টা পর ওর জ্ঞান ফিরে আসবে।”
“ওরে আপনে কী করছেন?” আতঙ্কের সাথে জানতে চায় সাবেক ইনভেস্টিগেটর।
স্মিত হাসে মুশকান। “ও ঘুমিয়ে আছে, পাশের ঘরে বিছানায় রেখে এসেছি।”
“ঘুমায়া আছে!” আতঙ্কের সাথে বলেছিলো সে।
“ভয়ের কিছু নেই। এক ধরণের হার্ব ব্যবহার করেছি, তা-ও সামান্য পরিমাণের… ক্লোরোফর্ম ইউজ করিনি। ওর কোনো ক্ষতিই হবে না।”
কী ঔষধি গাছের নির্যাস ব্যবহার করেছে সেটা জানতে চায়নি সাবেক ডিবি অফিসার, তবে একটা দৃশ্য কল্পনা করতে পেরেছিলো সে : ছোট্ট আইনস্টাইন দরজা খুলে দেখতে পেলো অপরিচিত এক মহিলা। সে কে, কী চাই জিজ্ঞেস করেছিলো সম্ভবত। কিন্তু মুশকান জুবেরি সে প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলো কিনা কে জানে, ঝট করে ছেলেটার মুখ চেপে ধরেছিলো ভেষজ ওষুধ মাখানো রুমাল দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে আইনস্টাইন অচেতন হয়ে ঢলে পড়ে, তাকে কোলে তুলে নিঃশব্দে পাশের ঘরের বিছানায় রেখে পিস্তলটা হাতে নিয়ে চলে আসে তার শিয়রে-সে তখন বইয়ের জগতে ডুবে ছিলো। যখন টের পেলো, ততোক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
“আমার কাছে কী চান আপনে?” মাথা থেকে এসব চিন্তা বাদ দিয়ে আসল প্রসঙ্গে চলে এসেছিলো কেএস খান।
কথাটা শুনে মুচকি হেসেছিলো মুশকান। “খুব সামান্য একটা জিনিস।” তারপর একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে। “নুরে ছফাকে ফোন দিন।”
কেএস খান ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিলো কথাটা শুনে। “ওরে ফোন দিয়া কী বলবো?”
“এই যে, আমি এখন আপনার এখানে আছি।”
মি. খান বিশ্বাস করতে পারছিলো না, সামান্য এই কাজের জন্য মুশকান জুবেরি তার ডেরায় ‘হানা দিয়েছে। “খালি এইটাই বলবো?” অবিশ্বাসে বলেছিলো সে।
“উমম…” একটু ভেবে নেয় মুশকান। “ছফাকে বলুন, যে মেয়েটাকে তারা আটকে রেখেছে ওকে ছেড়ে দিতে।”
“আমি কইলেই কি সে ছাইড়া দিবো?” সাহস করেই কথাটা বলেছিলো কেএস খান।
“না, তা কেন করবে। মনে হয় না এতো সহজে ছেড়ে দেবে।”
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মি, খান।
“ওকে বলবেন, ঐ মেয়েটাকে না ছাড়লে আমি আপনাকে আর আইনস্টাইনকে মেরে ফেলবো।”
কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য খোদাদাদ শাহবাজ খানের হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছিলো।
“ভয় পাবেন না,” আশ্বস্ত করে বলেছিলো মুশকান। “এটা ছফাকে কনভিন্স করার জন্য বলবেন, আমি আপনাদের কিছু করবো না। নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।”
কথাটা অন্য কেউ বললে হয়তো বিশ্বাস করতো, কিন্তু মানুষটা যখন মুশকান জুবেরি তখন বিশ্বাস করা কঠিন।
আমার বয়স কি তার টার্গেট হওনের উপযুক্ত? এই ভাবনাটা মাথায় ঘুরপাক খেয়েছিলো তার। আর আইনস্টাইন?
সম্ভবত ছফা বলেছিলো, মহিলা যুবক-তরুণদেরকে টার্গেট করে। তাছাড়া, সে হলো সার্বক্ষণিক অসুস্থ একজন মানুষ, সেদিক থেকে দেখলে আইনস্টাইন আর সে, দু-জনেই এই মহিলার শিকার হবার জন্য উপযুক্ত নয়।
“ফোন করুন…আমার হাতে সময় খুব বেশি নেই।”
কেএস খান আর দেরি করেনি, সেলফোনটা হাতে নিয়ে ছফাকে কল দেয়। যেমনটা আন্দাজ করেছিলো, তার কাছ থেকে কথাটা শুনে থ বনে গেছে ছফা। কয়েক মুহূর্ত কিছুই বলতে পারেনি।
কিন্তু মি, খান যদি এ সময় মুশকানের দিকে তাকাতে তালে দেখতে পেতো, তাদের কথাবার্তা শুনে তার চেয়ে কম অবাক হয়নি ঐ মহিলা।
“আপনি কী বলছেন, স্যার!” অবশেষে নুরে ছফা বলেছিলো তাকে।
“সত্যিই বলতাছি, ছফা,” আশ্বস্ত করে বলেছিলো। “মুশকান জুবেরি এখন আমার সামনে বইসা আছে।”
“আ-আপনি তাকে চিনলেন কিভাবে?” হতবহ্বল ছফা জানতে চাইলো।
গাল চুলকে নিয়েছিলো সাবেক ইনভেস্টিগেটর। “কয়দিন আগে আপনে তার একটা ছবি দেখাইছিলেন আমারে…ভুইলা গেছেন?”
