“আমার সব কথা আগে শুনুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন।”
“বলো, কী বলবে।”
আশেক মাহমুদ আর আসলাম অসন্তুষ্ট হলেও কিছু বললো না।
চোখ বন্ধ করে ফেললো সুস্মিতা, গভীর করে শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলো : “বছরখানেকেরও বেশি হবে, হুট করেই লন্ডন থেকে কলকাতায় চলে আসি আমি, বাড়িতে এসে দেখি তিন তলায় এক মহিলা এসে উঠেছে। বাপাই বললো, তার এক বন্ধুর মেয়ে। তো, ব্যাপারটা আমার কাছে ভালো লাগেনি। আমি খুব প্রাইভেসি সচেতন, আর আমাদের বাড়িটা আসলে ডুপ্লেক্স, অনেক পরে ছাদের এক অংশে একটা রুম বানিয়েছিলো পারমিতা মাসি…আমার মায়ের বড় বোন।” একটু থেমে আবার বললো, “মাসি মারা। যাবার পর ওটা খালিই ছিলো, ওখানে পরিবারের বাইরে কাউকে থাকতে দেয়াটা আমার পছন্দ হয়নি। তবে বাপাইর কারণে আমি এ নিয়ে কিছু বলিনি।”
ছফা মনে করার চেষ্টা করলো। সুকুমারের কেসটা যে অফিসার তদন্ত করছে, সে বলেছিলো, তিন তলায় সুস্মিতার এক কাজিন থাকতো। সুস্মিতা পালিয়ে যাবার পর সেই মহিলাও বাড়ি ছাড়ে। তাহলে কি ওটাই মুশকান ছিলো? মেয়েটা সত্যি বলছে?
মাথা থেকে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেললো সে। “তোমার বাবা তখন কোথায় ছিলেন?”
ছফার দিকে তাকালে বন্দী। “বাপাই তো আজ এখানে কাল ওখানে…সেই ছোটোবেলা থেকেই এমনটা দেখে আসছি। মাঝেমধ্যে আসতো…ক-দিন থেকে আবার চলেও যেতো।”
কিছু বললো না ছফা।
“একই বাড়িতে থাকার কারণে ওই মহিলার সাথে রোজই দেখা হতো। ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠলো। আমার বাড়িতে যেহেতু বন্ধুবান্ধবের আড্ডা হতো, ওই মহিলার সাথে আমার কিছু বন্ধুর ভালোই সখ্যতা গড়ে ওঠে এক সময়। সুকুমারের সাথেও বেশ ভালো জানাশোনা ছিলো ওর।”
ছফা স্থিরচোখে চেয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। কেউ মিথ্যে কথা বললে সেটার ধরার মতো প্রশিক্ষণ তার আছে, সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে, মেয়েটার কথা কতোটুকু সত্যি।
“এক দিন হুট করেই, কাউকে কিছু না বলে ঐ মহিলা আমাদের বাড়ি থেকে চলে গেলো, তারপরই বাসায় এলো পুলিশ। জানালো, সুকুমারকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি তখনও বুঝতে পারিনি কিছু। আর সুকুমার যে ঐদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিলো সেটাও জানতাম না, তাই পুলিশকে বলেছি, ওইদিন ও আমাদের বাড়িতে আসেনি।”
“তারপর?”
গভীর করে শ্বাস নিয়ে নিলো সুস্মিতা। পুলিশ আসার কথা বাপাইকে বলার পরই ও আমাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে, দ্রুত লন্ডন থেকে চলে আসে কলকাতায়। বাপাই-ই আমাকে কনভিন্স করে, তদন্ত এগোতে থাকলে নাকি আমি ফেঁসে যাবো, কেননা সুকুমার আমার বন্ধু ছিলো। পুলিশকে যদি এখন মুশকানের কথা বলিও তারা এটা বিশ্বাস করবে না। ভাববে, নিজেকে বাঁচানোর জন্য এমন এক ভুতের অবতারণা করছি যার অস্তিত্বই নেই।”
“কেন, তোমার বাড়ির দারোয়ান সাক্ষি দিতে পারতো, তোমাদের বাসায় আরেকজন মহিলা থাকতো তিন তলায়?”
মাথা দোলালো সুস্মিতা। “ঐ মহিলা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার পর পর পুরনো দারোয়ানকে চাকরি থেকে বিদায় করে দেয় বাপাই। নতুন দারোয়ান ঐ মহিলার ব্যাপারে কিছুই জানতো না।”
ছফা বুঝতে পারলো, মুশকানকে বাঁচানোর জন্য ডাক্তার আসকার এসব করেছেন-অবশ্যই ঐ মহিলার নির্দেশমতো। মেয়েটার কথা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হচ্ছে এখন। এখনকার দারোয়ানও ইন্সপেক্টর অতনুর কাছে স্বীকার করেছিলো, সে এমন কি সুস্মিতাকে দেখেওনি। তার কথা শোনেনি। মুশকান তো দূরের কথা! ইন্সপেক্টর অতনু যা কিছু জেনেছে পুরনো দারোয়ানের কাছ থেকেই জেনেছে।
“এ দেশে ঢোকার পর তুমি কি সরাসরি সুন্দরপুরেই চলে গেছিলে?”
“না। আমি ঢাকায় থেকেছি কয়েক মাস…হাপিয়ে উঠেছিলাম এখানে। এ শহরে বাপাই ছাড়া আমার কোনো পরিচিত মানুষজন ছিলো না, শহরটাও আমার একদম ভালো লাগতো না। তাছাড়া, বাপাইও বাইরে যাবে বলে আমাকে একা রাখতে চায়নি এখানে। ও ঠিক বুঝতে পারছিলো না কী করবে। এরকম সময়ে একদিন আমাকে নিয়ে সুন্দরপুরে গেলো স্কুলটা দেখতে, জায়গাটা ভীষণ ভালো লেগে গেলো আমার। তখনই বাপাই বলেছিলো, চাইলে এখানে গানের টিচার হিসেবে জয়েন করতে পারি আমি। অফারটা পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাই।”
ছফার লাই-ডিটেক্টিং প্রশিক্ষণ কাজে দিলো না। ধন্দে পড়ে গেলো সে। মেয়েটা সত্যি বলছে নাকি মিথ্যে সিদ্ধান্তে আসতে পারলো না। কিছু বলতে যাবে, অমনি তার ফোনটা বেজে উঠলো। বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে বের করলো সেটা, কলার আইডি দেখে কিছুটা অবাকই হলো। এই অসময়ে কেএস খান তাকে ফোন দিয়েছে! একান্ত অনিচ্ছায় কলটা রিসিভ করলো।
“হ্যালো, স্যার?”
পিএস, আসলামসহ সুস্মিতাও আগ্রহভরে তাকিয়ে থাকলে তার দিকে।
একটু ইতস্তত করে ছফা বললো, “জি, স্যার।” ওপাশের কথা শুনে গেলো সে। খুব দ্রুত তার অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো, রীতিমতো চমকে উঠলো যেনো। “কি?!”
.
অধ্যায় ৮১
মুশকান জুবেরিকে শিয়রে দেখতে পেয়ে কেএস খান তার জীবনে সবচাইতে বড় ভয়টা পেয়েছিলো। ভুত দেখলেও হয়তো এতোটা ভড়কে যেতো না সাবেক এই ইনভেস্টিগেটর। যে মহিলা মানুষ খেয়ে ফেলে তার সঙ্গে কি ভুতের তুলনা চলে? ভুত কখনও মানুষ খেয়েছে বলে জানা নেই তার!
মহিলাকে দেখে মি. খানের ভয়ে জমে যাবার আরো কারণ ছিলো-মানুষখেকো মুশকান জুবেরির হাতে পিস্তলও আছে!
