সুস্মিতা নামের বন্দী মেয়েটি মুশকান জুবেরি কিনা সেটা নিশ্চিত হবার জন্য এই তথ্যটা নাকি জানতে চেয়েছিলো আশেক মাহমুদ-ছফার কাছে এটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি। সুস্মিতা যে মুশকান সেটা প্রমাণ করার কিছু নেই। ছফা নিশ্চিত হয়েই কলকাতা থেকে এসেছে।
“আমাকে অনেক টর্চার করেছে এরা, শ্যামলকে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছে…অবশেষে বাধ্য হয়েই বানিয়ে টানিয়ে কিছু একটা বলে দিয়েছি।”
পিএসের মুখ কঠিন হয়ে গেলেও পরক্ষণেই অভিব্যক্তি পাল্টে হাসিমুখে বললো, “দেখলেন তো…আবার ভোল পাল্টে ফেলেছে!”
মাথা নেড়ে সায় না দিয়ে পারলো না ডিবির ইনভেস্টিগেটর। “তাহলে তুমি বলতে চাইছো, তুমি মুশকান জুবেরি নও?”
“অবশ্যই না! আমি সুস্মিতা সমাদ্দার। ডাক্তার আসকার আমার বাবা!”
আক্ষেপে মাথা দোলালো নুরে ছফা। পিএস আশেক মাহমুদ আর তার গানম্যান আসলাম মুচকি হাসছে।
“তাহলে প্লাস্টিক সার্জন ডিপি মল্লিক আর সুকুমার রঞ্জনকে হত্যা করেছে কে?” প্রশ্নটা না করে পারলো না।
গভীর করে দম নিয়ে নিলো সুস্মিতা।
“আমি সব জানি। সুকুমার রঞ্জনের নিখোঁজ কেসে কলকাতার পুলিশ সল্টলেকের বাড়িতে গিয়েছিলো তোমাকে ইন্টেরোগেট করার জন্য। কিন্তু তারা দ্বিতীয়বার সেখানে যাবার আগেই তুমি পালিয়ে যাও।”
সুস্মিতা বিস্মিত হলো, নিজের অভিব্যক্তি লুকাতে পারলো না পুরোপুরি।
“অবশ্য ডিপি মল্লিককে যে তুমিই হত্যা করেছে সেটা এখনও তারা জানে না।” একটু থেমে বন্দীর চোখে চোখ রেখে জোর দিয়ে বললো সে, “কিন্তু আমি জেনে গেছি।”
কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বললো না। ঘরে নেমে এলো নীরবতা।
“এসবের কী ব্যাখ্যা আছে তোমার কাছে?”
গভীর করে শ্বাস নিয়ে নিলো সুস্মিতা। “আমি না…মুশকান জুবেরি! ও খুন করেছে সুকুমারকে!”
নুরে ছফা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলো। একই অবস্থা পিএস আর আসলামেরও।
“সব দোষ বাপাইর!” দাঁতে দাঁত পিষে বললো বন্দী। “ওর জন্যই আজকে আমার এই অবস্থা।”
“কে? কার কথা বলছো?” বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো ছফা।
“আমার বাবা…ডক্টর আসকার।”
মাথা দোলালো আক্ষেপে। “আমার তো মনে হয় ডাক্তারের প্রতি তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। উনিই তোমাকে কলকাতায় আশ্রয় দিয়েছেন…এতো কিছু করেছেন!”
ভুরু কুঁচকে তাকালো সুস্মিতা। “আমাকে আশ্রয় দিয়েছে? হোয়াট দ্য হেল ইউ আর টকিং! এই জেনে এসছেন কলকাতা থেকে?” রাগেক্ষোভে মাথা দোলালো সে। “ওটা আমার মায়ের বাড়ি…সব্বাই জানে!”
বাঁকা হাসি দিলো ছফা। “তাহলে মুশকান জুবেরি অন্য একজন? আর তুমি তাকে চেনো?”
গভীর করে নিশ্বাস নিলো সুস্মিতা। “হ্যাঁ, আমি ওকে চিনি।”
বন্দীর কাছ থেকে আরো কিছু শুনতে চায় ছফা। দেখতে চায়, মুশকান জুবেরির নতুন কৌশলটা কী রকম।
“আপনি যাকে খুঁজে বের করেছেন সে মুশকান জুবেরি? আমি না! ও-ই যত নষ্টের মূল। রুটস অব ইভিল!” চোখমুখ বিকৃত করে বললো।
সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো ছফা। “কী বলতে চাইছো, তুমি?!”
আবারো গভীর করে দম নিয়ে নিলো বন্দী। “বাপাই ওই মহিলাকে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েই যতো বিপদ ডেকে এনেছে।”
নুরে ছফার মনে হলো আবারো একটা গোলকধাঁধায় ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাকে। ঘন সাদা ধোঁয়াময় এক অন্ধকার!
“ও চালাকি করছে,” আস্তে করে বললো পিএস। “ওর কথা বিশ্বাস করবেন না।”
ছফা মাথা নেড়ে সায় দিলেও জানতে চাইলে বন্দীর কাছে, “তাহলে প্লাস্টিক সার্জনকেও তুমি চিনতে? সুকুমার রঞ্জনকেও?”
“সার্জনকে আমি চিনি না, কিন্তু সুকুমারকে চিনতাম…ও আমার ফ্রেন্ড ছিলো।”
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো ছফা।
“কিন্তু মুশকান ওকে কী করেছে জানি না। মহিলা আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পরই পুলিশ আসে, ওরা সুকুমারের নিখোঁজ হবার জন্য আমাকেই সন্দেহ করতে শুরু করে।”
“তুমি তাহলে জানো না মুশকান জুবেরি ওকে কী করেছে?” ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলো ছফা।
“প্রথম দিকে কিছুই জানতাম না। বাড়িতে পুলিশ আসার পর বাপাইর কাছে জানতে চেয়েছিলাম…বাপাইও কিছু জানে না এ ব্যাপারে। তবে মুশকান পালিয়ে গেলে বুঝতে পারি কাজটা ও-ই করেছে। আমার কাছে সবটাই পরিস্কার হয়ে ওঠে তখন।”
“এই ডাইনি সব নাটক করছে, ছফা!” রেগেমেগে উঠে দাঁড়ালো পিএস। “ওর কোনো কথা বিশ্বাস করবেন না। একেক সময় একেক কথা বলে বিভ্রান্ত করছে।”
ছফার কাছে অবশ্য তা মনে হচ্ছে না, তবে সে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চায়।
“সুকুমারের সাথে ঐ মহিলার ঠিক কী নিয়ে ঝামেলা হয়েছিলো আমি কিছু জানি না। বিশ্বাস করুন। প্রায় কেঁদেই ফেললো সে। “আমি যে সত্যি বলেছি, সেটা এক সময় না এক সময় ঠিকই বুঝতে পারবেন আপনারা। আর যখন বুঝতে পারবেন, খুবই পস্তাবেন!” বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো কথাগুলো। “আপনারা ভুল মানুষকে ধরে এনে কী সব উল্টাপাল্টা কথা জানতে চাইছেন!”
ছফা ভুরু কুঁচকে চেয়ে রইলো বন্দীর দিকে। এই মেয়ে দাবি করছে, প্লাস্টিক সার্জন আর সুকুমারের গুমের ব্যাপারে সে কিছু জানে না। তারপরই ছফার মনে হলো, সে এই মেয়ের সব কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। কিন্তু মেয়েটার কথায় কিছু ফাঁক আছে। নড়েচড়ে বসলো সে।
“তোমার কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে কলকাতায় ডাক্তার আসকারের শ্বশুড় বাড়ির দারোয়ান দু-জন মেয়ের কথা কেন বলেনি?” ছফা স্থিরচোখে তাকিয়ে রইলো বন্দীর দিকে।
