চমকে পেছন ফিরে তাকাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেলো! এতোক্ষণ ধরে আত্মজৈবনিকমূলক একটি বই পড়ছিলো-কিন্তু এখনকার বাস্তবতাটা হরর গল্পের চেয়েও বেশি ভীতিকর!
.
অধ্যায় ৭৯
প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে, গুলশানের সেই গোপন আস্তানার এক ঘরে পড়ে ছিলো শ্যামল। চেষ্টা করছিলো হাতের বাঁধনটা ছিঁড়ে ফেলতে কিন্তু কারোর পায়ের শব্দ শুনে থেমে যায়। একটু পরই টের পায় সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যাবার শব্দ। হাফ ছেড়ে বাঁচে, আবারো মনোযোগ দেয় হাতের বাঁধনটা ছিঁড়ে ফেলার কাজে।
পনেরো-বিশ মিনিটের সাধনার পর দড়িটা ছিঁড়ে যায় অবশেষে। সঙ্গে সঙ্গে হাতের বাঁধনটা খুলে ফেলে। তারপর মুখের বাঁধন খুলতেই বুকভরে নিশ্বাস নিয়ে নেয়। দীর্ঘ সময় ধরে শুধু নাক দিয়ে নিশ্বাস নিতে নিতে হাপিয়ে উঠেছিলো, নিজেকে ধাতস্থ করতেই পায়ের বাঁধনটা খুলে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে যায়। পরক্ষণেই নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয়-এই বাড়ি থেকে যতোক্ষণ বের না হচ্ছে সে আসলে বন্দী!
সব সময় মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করবে-রমাকান্তকামারের এই কথাটা স্মরণ করে শ্যামল। কিন্তু ঢাকায় এসে যে পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেরকম কোনো কিছু তার গোটা জীবনে ঘটেনি। মানুষসহ সকল প্রাণীকেই সব কাজ প্রথম বারের মতো করতে হয়-মাস্টারের আরেকটি কথা তার মাথার ভেতরে উচ্চারিত হয় তখন।
গভীর করে দম নিয়ে নিঃশব্দে, পা টিপে টিপে ঘর থেকে বের হয়। শ্যামল। একটা সুবিধা আছে এই বিরাণ বাড়িতে-নীচতলার কোনো ঘরেরই দরজা-জানালা নেই, সবগুলোই চৌকাঠসহ খুলে নেয়া হয়েছে। তাকে রাখা হয়েছে একেবারে ভেতরের দিকে একটা ঘরে। সামনের দিকে যে ঘরটা আছে সেখানে আসতেই দরজার খোলা অংশ আর জানালার ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে বাইরের দৃশ্যটা দেখতে পায়। একটা বাতি থাকার কারণে ওখান থেকে মেইনগেটটা দেখতে পেয়েছিলো-গেটের সামনে এক লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চিনতে পারে সে। দুপুরে এই লোকই তার হাত-পা মুখ বেঁধেছিলো। তার মানে, কমপক্ষে আরো দু-জন লোক আছে।
যে ঘরে তাকে বন্দী করে রেখেছিলো সেখানে আবারও ফিরে আসে শ্যামল। বুঝতে পারে, এটাই বাড়ির পেছন দিক। বড় দুটো জানালা ছিলো যেখানে, সেটা একদমই ফাঁকা, সেই ফাঁকা জায়গা দিয়ে দেখতে পায় বাড়ির পেছন অংশের সীমানা প্রাচীরটি মাত্র চার-পাঁচ হাত দূরেই। জায়গাটা অন্ধকার আর ময়লা আবর্জনায় পূর্ণ। ঘর থেকে প্রাচীরের ওপাশে কী আছে দেখা যায় না। দেয়ালটা আট ফুটের মতো উঁচু। গ্রামের ছেলে সে, বড় বড় গাছ তর তর করে বেয়ে উঠতে পারে, আর এটা তো একটা দেয়াল!
জানালার ফাঁকা অংশ দিয়ে ঘরের বাইরে চলে যায়, দু-হাত মাথার। উপরে তুলে দেয়ালের উপরের প্রান্তটা ধরতে পারে কোনোমতে। এটাই যথেষ্ট ছিলো তার জন্য। দেয়ালটা শক্ত করে ধরে, পুরো শরীরটা উপরে তুলে দিতেই ডান পা-টা উঁচু করে দেয়ালের উপরে রাখে, এরপর খুব অনায়াসেই উঠে আসে দেয়ালের উপরে। সেখান থেকে নীচের অন্ধকারে ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারে, দুটো বাড়ির সীমানা প্রাচীরের মাঝখানে পাঁচ-ছয় ফুটের মতো যে খালি জায়গাটা আছে সেটা একটা ড্রেন। জায়গায় জায়গায় কংক্রিটের স্ল্যাব বসানো থাকলেও অনেক জায়গাই উন্মুক্ত।
শ্যামল আস্তে করে দেয়ালের প্রান্ত ধরে শরীরটা নামিয়ে দেয়, তার পা নীচের স্ল্যাবটা ছুঁই ছুঁই করতেই হাতদুটো ছেড়ে দিয়ে প্রায় বিনা শব্দে নেমে আসে। স্ল্যাবের উপর নেমেই দু-দিকে তাকায়। ড্রেনটা কিছু দূর গিয়ে বাঁয়ে নব্বই ডিগ্রি বাঁক নিয়ে সোজা চলে গেছে ছোট্ট একটি টিনের দরজার দিকে, খাটো সেই দরজার উপর দিয়ে রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে। শ্যামল ওই দরজাটাই বেছে নেয় পালানোর জন্য।
কয়েক মিনিট পরই নীচু গেটটা খুলে ড্রেন থেকে ফুটপাতে উঠে আসে, বুঝতে পারে না কোন্ রাস্তা দিয়ে গেলে কোথায় যাওয়া যায়, কিন্তু এটা বুঝতে পারে, সে এখন পুরোপুরি মুক্ত। বুকভরে নিশ্বাস নিয়ে রাস্তার ডান দিক দিয়ে দ্রুত গতিতে হাঁটতে থাকে। রাস্তাটা বেশ সুনশান, দু-পাশের সারি সারি বাড়িগুলো আলোকিত। মাঝেমধ্যে রাস্তা দিয়ে কিছু প্রাইভেট কার আসা যাওয়া করছিলো। রাস্তার বাম দিকে জ্বলজ্বলে একটি নিয়ন সাইন দেখতে পায় সে : তান্দুরি হাউজ। তার পাশের বাড়িটার হোল্ডিং আর রোড নাম্বার মুখস্ত করে নিয়ে হাটার গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। তার পকেটে কিছু টাকা আছে, আর সেটাই যথেষ্ট একটা ফোন কল করতে।
৮০. হাসিবের হত্যাকারী
অধ্যায় ৮০
নুরে ছফা বিস্ময়ে চেয়ে আছে পিএসের দিকে। তার ধারণা ছিলো, ভদ্রলোক নিজের বড় বোনের ছেলে হাসিবের হত্যাকারীকে ধরতে চায়, মৃত্যুপথযাত্রি বোনকে শেষ একটি সুসংবাদ দিতে চায়-তার ছেলের হত্যাকারী ধরা পড়েছে।
কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে, ব্যক্তিগত আবেগও হেরে যায় মানুষের লোভ আর স্বার্থের কাছে! যৌবন দীর্ঘায়িত করা কিংবা আয়ুবৃদ্ধির আকাঙ্খার মতো লালসা দ্বিতীয়টি আছে কিনা ছফা জানে না। কেএস খানের সতর্ক বাণীটার কথা আরেকবার মনে পড়ে গেলো তার। অভিজ্ঞ ইনভিস্টিগেটর যেনো দিব্যদৃষ্টিতে সব কিছু আগেভাগে দেখতে পেয়েছিলো।
আক্ষেপে মাথা দোলালো। মুশকান জুবেরি পালিয়ে যাবার পর, বিগত তিন বছরে হাতে গোণা কয়েক বার ফোন করেছিলো প্রধানমন্ত্রীর পিএস, এছাড়া খুব একটা তাড়া দেয়নি। কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রি বোনের কাছ থেকে মুশকানের যৌবন দীর্ঘায়িত করার রহস্যের কথা জানতে পেরে কেন উঠে পড়ে লাগলো-এবার সেটা পরিস্কার হয়ে উঠেছে তার কাছে।
