“আমি বিশ্বাস করি না!” চেঁচিয়ে উঠলো বন্দী। “ও খুবই সহজ-সরল একটা ছেলে, জীবনে প্রথম এ শহরে এসছে।”
পিএস গভীর করে দম নিলো, নিজের রাগ দমন করতে বেগ পাচ্ছে। সে। কিন্তু ছফা কিছু না বলে পিএস আর তার গানম্যানের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে।
“আমি অনেক চেষ্টা করেছি শ্যামলকে বাঁচাতে…পারলাম না,” অশ্রুপাত করতে করতে বললো। “আমাকে ক্ষমা করে দিস, শ্যামল।”
“মাগি, তুই নাটক বন্ধ করবি নাকি…” বলেই আসলাম তেড়ে গেলো বন্দীকে মারতে।
“আসলাম!” বাধা দিলো ছফা। পিএসের গানম্যানকে সরিয়ে দিয়ে বন্দীর সামনে এসে দাঁড়ালো সে। “ওই ছেলেকে এরা খুন করবে কেন? আশ্চর্য!” কিন্তু কথাটা নিজের কাছেই কেমন দুর্বল শোনালো।
“আপনি আসার আগে এই লোক আমাকে হুমকি দিয়েছিলো শ্যামলকে খুন করবে বলে!” কান্নার দমকে হাপাচ্ছে সুস্মিতা।
“ওকে খুন করার হুমকি কেন দেবে?”
“কারণ,” পিএসের দিকে তাকালো বন্দী। “এই লোক কী সব জানতে চাইছিলো আমার কাছে। যদি না বলি তাহলে শ্যামলকে খুন করার ভয় দেখিয়েছিলো তখন।”
ভুরু কুঁচকে গেলো ছফার, পিএসের দিকে তাকালো সে। কেমন বিব্রত বোধ করছে আশেক মাহমুদ।
তারপর আবার মেয়েটার দিকে ফিরলো। “কী জানতে চেয়েছিলো?”
“ওর কথা বিশ্বাস করবেন না,” রেগেমেগে বললো পিএস। “উল্টা পাল্টা বলে আপনাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে ডাইনিটা।”
পিএসের দিকে অবিশ্বাসে তাকালে বন্দী। রাগে ঘেন্নায় চিৎকার করে বলে উঠলো, “লায়ার!”
আসলাম আবারো তেড়ে আসতে চাইলো কিন্তু হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলো ছফা। স্থিরচোখে বন্দীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “উনি কী জানতে চেয়েছেন তোমার কাছে?”
“এই লোক কী সব বলছিলো আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, বিশ্বাস করুন,” সুস্মিতা সমাদ্দার বললো। “শেষে শ্যামলকে বাঁচানোর জন্য কিছু একটা বানিয়ে বলে দিয়েছি। এছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না আমার।”
পিএস কথাটা শুনে নিজের অভিব্যক্তি লুকাতে পারলো না, দাঁতে দাঁত পিষে চেয়ে রইলো কেবল।
“উনি কী জানতে চেয়েছেন, বলো?” তাড়া দিলো ডিবির ইনভেস্টিগেটর।
“এই লোকটা বার বার জানতে চাইছিলো, মানুষের শরীরের কোন্ অগ্যানটা খেলে…” বমির উদ্রেক করছে এমন অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো তার চোখেমুখে।
সুস্মিতা কথাটা শেষ না করলেও ছফার বুঝে নিতে কোনো সমস্যা হলো না। অবিশ্বাসে তাকালো পিএসের দিকে।
.
অধ্যায় ৭৮
রাতের খাবার খেয়ে আবার বই নিয়ে বসেছে কেএস খান। এই বইটা চুম্বকের মতো টেনে রেখেছে তাকে। প্রায় শত বর্ষের পুরনো একটি ক্লাসিক। এক বন্ধু কানাডা থেকে পাঠিয়েছে গত সপ্তাহে-সেভেন পিলার্স অব উইজডম। লরেন্স অব অ্যারাবিয়াখ্যাত স্যার টিই লরেন্সের আত্মজৈবনিক এই বইটি আকারে যেমন বিশাল তেমনি সুখপাঠ্য। চোখের সামনে এরকম বই মেলে রাখতে পারলে অন্য রকম ভালো লাগে তার। কিন্তু পাশের ঘর থেকে মটু পাতলু নামের নিম্নমানের একটি হিন্দি কার্টুনের শব্দ বার বার বিরক্ত করছে তাকে। আইনস্টাইনের নতুন নেশার নাম এই মটু পাতলু। পারে তো সারা দিনই টিভিতে এই কার্টুন দেখে সে। টিভির শব্দের পাশাপাশি আইনস্টাইনের বালখিল্য হাসির শব্দও শোনা যাচ্ছে একটু পর পর। ছেলেটার এই শিশুতোষ বিনোদনে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে চায় না সে, কিন্তু বার বার তার পড়ায় মনোযোগ নষ্ট করছে এটা।
“আইনস্টাইন?” জোরে ডাক দিলো। “সাউন্ডটা একটু কমা!”
কাজ হলো এতে। টিভির ভলিউম কমিয়ে দিলো ছেলেটি।
সন্তুষ্ট হয়ে খোদাদাদ শাহবাজ খান আবারও মনোযোগ দিলো বইয়ের পৃষ্ঠায়। লরেন্সের রোমাঞ্চকর কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ডুবে গেলো সে। এই বই থেকেই বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র লরেন্স অব অ্যারাবিয়া নির্মাণ করা হয়েছিলো, স্কুল পালিয়ে সেই ছবি মধুমিতা সিনেমা হলে গিয়ে দেখার স্মৃতিটা মনে পড়ে গেলো তার। পিটার ওটুলের অসাধারণ অভিনয়, বেদুইন শেখের চরিত্রে ওমর শরীফের অদ্ভুত অ্যাকসেন্টে বলা ইংরেজি, মরুভূমির চমৎকার দৃশ্য, মরুঝড়, মরিচীকা, বেদুইনদের সাথে যুদ্ধ-ডেভি লিনের বিশাল ক্যানভাসের মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রটিকে পরিণত করেছে অল টাইম ক্লাসিকে।
এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠলে একই সাথে বিরক্ত এবং অবাক হলো কেএস খান। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত দশটার পর কে এলো?
আইনস্টাইনকে কিছু বলতে হলো না বলে খুশিই হলো। দরজা খোলার শব্দ শুনে বুঝতে পারলো, ছেলেটা তার প্রিয় কার্টুন রেখে দেখতে গেছে এই অসময়ে কে এসেছে।
ভাড়াটেদের কেউ হতে পারে। এরা পান থেকে চুন খসলেই সোজা তার কাছে চলে আসে। কারোর দরজার নব লুজ হয়ে গেছে তো, কারোর বাথরুমের ট্যাপ কাজ করছে না। কেউ এসে বলবে, ফ্ল্যাশটা নষ্ট, কেউ জানাবে এ মাসে ভাড়া দিতে একটু দেরি হবে, কী একটা সমস্যা হওয়াতে হাত খালি হয়ে গেছে। মালিক হিসেবে সে যথেষ্ট উদার, অন্য সব বাড়িওয়ালাদের মতো আচরণ করে না। আইনস্টাইনও যথেষ্ট সজাগ থাকে সব সময়, আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ভাড়াটেরা-রাত-বিরাতে এসে হাজির হয় সমস্যার কথা নিয়ে। যেনো এক্ষুণি সমস্যার সমাধান করে দিতে হবে!
তিক্ততায় মুখ বিকৃত হয়ে গেলো আনমনেই। বইটা বুকের উপর রেখে শোনার চেষ্টা করলো অসময়ে কে এলো, কী অভিযোগ নিয়ে এলো। কিন্তু কোনো কিছুই তার কানে গেলো না, শুধুমাত্র পাশের ঘর থেকে মটু পাতলু’র মৃদু শব্দটা ছাড়া। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর যে-ই না আইনস্টাইনকে ডাকতে যাবে, তখনই তার মনে হলো শিয়রের কাছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে!
