শরীরটা গড়িয়ে সেই পিলারের কাছে নিয়ে গেলো শ্যামল, অনেক কষ্টে পিলারে ঠেস দিয়ে উঠে বসলো সে। তার পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা হাতদুটো পিলারের সেই ধারালো অংশের নাগাল পাচ্ছে এখন। এরপর ধীরে ধীরে হাতের বাঁধন দড়িরটা পিলারের ধারালো অংশের সাথে ঘষে ঘষে ছেঁড়ার চেষ্টা করে গেলো।
খুব আস্তে আর দেবে দেবে করলো যেনো দড়িটা ছিঁড়ে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই পায়ের শব্দ শুনে থমকে গেলো সে। সারাটা দিন কেউ এখানে আসেনি। আর যখন সিদ্ধান্ত নিলো পালাবে, তখনই কিনা লোকজন চলে এলো!
নিজেকে খুব অসহায় লাগলো শ্যামলের, খুব কান্না পেলে তার।
.
অধ্যায় ৭৬
ঘরে ঢুকেই বন্দীর দিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইলো নুরে ছফা।
সে ভাবতেই পারছে না, এই মেয়েটাই আসলে মুশকান জুবেরি! চেহারা পুরোপুরি পাল্টে ফেলেছে! তাকে যারা চেনে তারা যদি এখন দেখে, বিশ্বাসই করতে চাইবে না। আগের মুশকানের সাথে এখনকার চেহারার একটুও মিল নেই। সার্জন ডিপি মল্লিককে যে প্রচুর সার্জারি করতে হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ছফার ধারণাই ছিলো না, এভাবে সার্জারি করে চেহারা আমূল পাল্টে ফেলা সম্ভব।
কিন্তু অসম্ভব কাজটাই করেছে দয়াল প্রসাদ মল্লিক। মনে মনে সার্জনের প্রশংসা না করে পারলো না। বেচারা যদি জানতো কার চেহারাটা পাল্টে দেবার কাজ নিয়েছিলো!
মাস্টার আর গানের শিক্ষিকার ফোন নাম্বার পেলেও তার সব মনোযোগ ছিলো রমাকান্তকামারের উপরে, ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, যাকে হন্যে খুঁজছে সে একেবারে নাগালের মধ্যেই আছে!
“আপনার কথাই ঠিক,” পিএস বললো বেশ সন্তুষ্ট হয়ে। ঘরের একমাত্র ডাবল সোফাটায় বসে আছে সে, তার মুখে প্রসন্ন হাসি। আসলাম দাঁড়িয়ে আছে বন্দীর পাশেই। “এই মেয়েটাই মুশকান। প্রথমে কোনো কিছুই স্বীকার করছিলো না, তবে একটু আগে সব স্বীকার করে নিয়েছে।”
নুরে ছফা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে এগিয়ে গেলো বন্দীর দিকে।
“বার বার নিজেকে ডাক্তার আসকারের মেয়ে বলে দাবি করছিলো। শি ওয়াজ অ্যা হার্ড নাট টু ক্র্যাক!”
এ ব্যাপারে ছফার মনেও কোনো সন্দেহ নেই। তারপরই সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলো সে, “হ্যালো, রুখসান!”
অবিশ্বাসে ভুরু কুঁচকে ফেললো বন্দী। পিএস আশেক মাহমুদ আর আসলাম একে অন্যের দিকে তাকালো। তারাও যারপরনাই অবাক।
“ছফা, আপনি এসব-”
হাত তুলে পিএসকে থামিয়ে দিলো নুরে ছফা। তার দিকে ফিরে আশ্বস্ত করার ভঙ্গি করলো সে। বন্দীর দিকে ফিরলো আবার। “তোমার নাম তো রুখসানই…তাই না?”
“বুল শিট! আমি সুস্মিতা…সুস্মিতা সমাদ্দার!” বেশ চেঁচিয়েই বললো।
মুচকি হাসি ফুটে উঠলো ছফার ঠোঁটে। তবে সেই হাসিতে প্রশান্তিও আছে। “তাহলে তুমি রুখসান নও?”
অনেক কষ্টে নিজের রাগ দমন করে দৃঢ়তার সাথে বললো বন্দী, “এই রুখসানটা আবার কে? আপনি কার কথা বলছেন?”
ভুরু কপালে উঠে গেলো ছফার। “কেন, ডাক্তার আসকার তো আমাকে এ কথাই বলেছেন…তুমি আসলে রুখসান!”
বন্দীর চোখ কুঁচকে গেলো।
আশেক মাহমুদ কিছু বুঝতে না পেরে আসলামের দিকে তাকালো। সে কাঁধ তুললো কেবল, মুখে কিছুই বললো না। ছফার এমন কর্মকাণ্ডে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে সেটা কারোর কাছেই পরিস্কার নয়।
“আমি সুস্মিতা সমাদ্দার! ওকে? ইউ বাঞ্চ অব ব্লাডি ফুস!” তিক্তমুখে বললো সে। “একজন এসে আমাকে দিয়ে জোর করিয়ে বলাতে চাইছে, আমি মুশকান…আরেকজন এসে বলছে, আমি রুখসান! হোয়াট দ্য হেল ইউ আর ট্রাইং টু ডু?”
মুচকি হাসলো ছফা। স্থিরচোখে চেয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। “তোমার মায়ের নাম কি, বলো তো?”
বিস্মিত হলো সুস্মিতা।
“আমি জানতে চাচ্ছি, তোমার মায়ের নাম কি?” এবার ধমকের সুরে করা হলো প্রশ্নটা।
গভীর করে দম নিয়ে নিলো বন্দী। “শুভমিতা সমাদ্দার।”
ভুরু কপালে তুলে অবাক হবার ভান করলো ছফা। “অবশ্য কলকাতা থেকে এরকমটাই শুনে এসেছি, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, তুমি বলবে তোমার মায়ের নাম মুশকান সোহেলি!”
ঘরে আলোড়ন তুললো কথাটা। একই সাথে সুস্মিতা, পিএস আর আসলাম অবাক হলো।
“মুশকান আমার মা!? ইউ পিপল গন ম্যাড!” অবিশ্বাসে বললো বন্দী।
মাথা দোলালো ছফা। “আমি না, পাগল তোমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ডাক্তার আসকার। ভদ্রলোক কখন কী বলেন নিজেও জানেন না বোধহয়।”
চোখ কুঁচকে তাকালো সুস্মিতা, কী বলবে ভেবে পেলো না। নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো সে।
“এসব কী হচ্ছে?” অধৈর্য হয়ে বলে উঠলো পিএস।
ছফা তাকালো তার দিকে। “সরি, স্যার। আমি আসলে একটা তথ্য যাচাই করছিলাম।”
আসলাম মাথা নেড়ে সায় দিলো। এতোক্ষণে সে বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা। ডাক্তার আসকার তার সামনেই এই গল্পটা করেছিলেন, যার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলো না তখন।
এদিকে সুস্মিতা কিছুই বুঝতে পারছে না, সে চেয়ে আছে ছফার দিকে। “কীসের তথ্য?” জানতে চাইলে পিএস।
“ডাক্তার আসকার আমাকে বলেছিলেন, যে মুশকানকে আমি খুঁজছি, সে আসলে রুখসান। আর রুখসানের মা হলো মুশকান।”
“কী বলছেন এসব?”
“বাদ দিন, স্যার। ওটা ছিলো ডাক্তার আসকারের আরেকটি ধোঁকা।”
“হুম, তা ঠিক আছে, কিন্তু এই মেয়েটা…ও-ই তো মুশকান?”
মাথা নেড়ে পিএসকে আশ্বস্ত করলো ছফা। “এ ব্যাপারে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই এখন। কলকাতা থেকে সব জেনে এসেছি।”
