ফোনের ওপাশে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেলো। “ডাক্তার আসকারের সন্দেহ, যে লোক তাকে বিদেশে যেতে বাধা দিয়েছে সে-ই তার মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে।”
আশেক মাহমুদ নিজের ক্রোধ সংবরন করে নিলো দ্রুত। এরকম পরিস্থিতি যে হবে ধারণাও করতে পারেনি। তবে সমস্যা মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদতে নিজেদেরই লোক, তারা সবাই একে অন্যকে চেনে। এমন নয় যে, সরকারের এক মন্ত্রী কোনো কিছু করলো আর বাকিরা সেটা জানতে পারলো না-এটা আসলে ওপেন সিক্রেট ক্লাব। প্রায় সবাই সবার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কমবেশি ওয়াকিবহাল থাকে। সুতরাং তার কাছে মুখোশ পরে থাকার কোনো দরকার নেই।
“শুনুন, আশফাঁকসাহেব,” শান্তকণ্ঠে বললো পিএস। “আগেই বলেছি, দেখা করে আপনাকে সব খুলে বলবো। এটা একেবারেই ব্যক্তিগত একটি ব্যাপার। তবে আপনাকে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, ডাক্তার আসকার যাকে নিজের মেয়ে বলে দাবি করছে, আদতে সে তার মেয়ে তো দূরের কথা, কোনো রিলেটিভও নয়।”
“বলেন কি!” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আৎকে উঠলো। “তাহলে ডাক্তার কেন এটা বলছেন?”
“কারণ সে একজন অপরাধীকে বাঁচাতে চাইছে।”
“কীসের অপরাধী? কার কথা বলছেন আপনি?”
এবার পিএস দীর্ঘশ্বাস ফেললো। “বললাম তো, আমি আপনাকে খুলে বলবো…খুব জলদি।” একটু থেমে আবার বললো, “আপনি শুধু আপাতত কয়েকটা দিন ঐ ডাক্তারকে অ্যাভয়েড করুন। বুঝতে পেরেছেন?”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “কিন্তু উনি যদি কেসটেস করে বসেন?”।
মাথা দোলালো আশেক মাহমুদ, যদিও ফোনের ওপাশে যে আছে সে এটা দেখতে পাচ্ছে না। “ট্রাস্ট মি, ডাক্তার এটা করবে না…ভুলেও না!”
ফোনের ওপাশ থেকে আবারো নেমে এলো নীরবতা। “ঐ নিরীহ ছেলেটা…” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশফাঁক মিম্রয়মান কণ্ঠে বললো, “…আমি চাই না কোনো রকম কোলাটেরাল ড্যামেজ হয়, বুঝতে পেরেছেন তো?”
আশেক মাহমুদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। “ডোন্ট ওরি।” কলটা ওপাশ থেকে কেটে দেয়া হলে উদাস হয়ে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। তারপর সম্বিত ফিরে পেতেই ফোনটা পকেটে রেখে আবারো ফিরে গেলো ঘরে।
.
অধ্যায় ৭৫
কততক্ষণ ধরে যে অন্ধকার ঘরে পড়ে আছে শ্যামল জানে না। সেই দুপুর থেকে তার হাত-মুখ-পা বেঁধে নীচতলার পরিত্যক্ত একটি ঘরে ফেলে রেখে গেছে লোকগুলো, তারপর আর খোঁজ করতে আসেনি। প্রথম কয়েক ঘণ্টা তীব্র আতঙ্কে অসাড় হয়ে পড়ে ছিলো সে। গ্রামের সহজ সরল ছেলে, জীবনে প্রথম বার ঢাকায় এসেই কিনা এমন পরিস্থিতির শিকার হলো!
প্রচণ্ড খিদে আর পানির পিপাসায় জিভ শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি মৃত্যুভয়ে তটস্থ সে। তার মনে হচ্ছে না এ বাড়ি থেকে পৈতৃক প্রাণটা নিয়ে বের হতে পারবে, ফিরে যেতে পারবে না সুন্দপুরে।
দুপুরে যখন এখানে, এই পরিত্যক্ত ফ্ল্যাটের বড় একটা ঘরের এককোণে তাকে ফেলে গেলো তখন সে ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলো। মশার কামড়ে জ্ঞান ফিরে এলে দেখতে পায় কিছুটা আলো তখনও আছে। এরপর নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।
এখন, এই কয়েক ঘণ্টা পর গাঢ় অন্ধকারে চোখ মেলে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
রাত?
অবশ্যই। কিন্তু কয়টা বাজে তার কোনো ধারণাই নেই। এ কয় ঘণ্টায় তার মানসিক অবস্থার উত্থান-পতন দুটোই ঘটেছে। প্রাথমিক ভীতিটা তাকে একেবারে শেষ করে দিয়েছিলো। কিন্তু দীর্ঘ সময়ে সেই ভীতি অনেকটাই কেটে গেছে, এখন পালানোর চিন্তা করার মতো সাহসও দেখাচ্ছে সে! অন্তত বিষয়টা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে বিগত এক ঘণ্টা ধরে।
শ্যামল খেয়াল করেছে, তাকে একবারের জন্যেও কেউ দেখতে আসেনি। সম্ভবত সুস্মিতাদিকে নিয়েই লোকগুলো ব্যস্ত।
দিদিকে ওরা কী করছে? চিন্তাটা মাথায় আসতেই কান্না পেলো তার। নিশ্চয় খারাপ কিছু করছে। এই দিদি শ্যামলকে খুব স্নেহ করে, তার খারাপ কিছু হোক সে চায় না। কিন্তু যারা তাদেরকে তুলে নিয়ে এসেছে এই বিরাণ বাড়িতে তারা যে দিদির সাথে খারাপ কিছু করবে সেটা আন্দাজ করতে পারছে।
শ্যামল কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে নিলো। দিদিকে রক্ষা করতে হলে তাকেই করতে হবে। ছোটোবেলায় পড়া রবিঠাকুরের বীর পুরুষ কবিতাটার কথা মনে পড়ে গেলো। সেই ছোট্ট খোকা যদি মাকে রক্ষা করতে পারে কতোগুলো ডাকাতের হাত থেকে, তাহলে সে-ও পারবে। তবে এ কাজ সে ঐ খারাপ লোকগুলোর সাথে মারামারি করে পারবে না। এই জীবনে ঐ একটা কাজ তার পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। সে হলো রমাকান্ত মাস্টারের হাতে মানুষ হওয়া ছেলে, ছোটোবেলা থেকেই মাস্টার তাকে শিক্ষা দেবার পাশাপাশি ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। অন্যান্য ছেলেদের মতো মারামারি করার অভিজ্ঞতা তার নেই। এ জীবনে কারো সাথে ঝগড়াও করেনি কখনও। খুবই নরম স্বভাবের মানুষ সে।
সুতরাং একটাই উপায় আছে-তাকে এখান থেকে পালাতে হবে।
টের পেলো পায়ে মশা কামড়াচ্ছে। মশাদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য বাঁধা পা দুটো নড়াচড়া করার চেষ্টা করছে একটু পর পর। এভাবে করতে গিয়ে ধারালো কিছুতে পা লেগে গেলো। টের পেলো ওটা এই ঘরের একটি পিলার। তার পা-টা সেই পিলারের খুব কাছেই, পিলারের নীচের দিকের অনেকটা অংশে প্লাস্টার খসে আছে, ফলে সেখানে পা লেগে ছিলে গেছে খানিকটা।
