২.
আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা কত? আমি জানি সংখ্যাটি শুনলে সবাই চমকে উঠবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা আর বিশ্বব্যাংকের ২০১১ সালের জরিপ অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে প্রতিবন্ধী মানুষ হচ্ছে শতকরা ১৫ জন। (সত্তরের দশকেও সংখ্যাটি ছিল শতকরা ১০ জন)। সারা পৃথিবীতে যে হিসাব বাংলাদেশ তার বাইরে থাকবে সেটা হতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কী যে দেশ একটু দরিদ্র সেই দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা বেশি। কাজেই আমরা যদি বাংলাদেশের জন্যও এই ১৫ শতাংশ সংখ্যাটি ধরে নিই তাহলে এখানে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি চল্লিশ লাখ। সংখ্যাটি কত বড় অনুমান করার জন্য বলা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় যদি এই সংখ্যক মানুষকে প্রতিবন্ধী হতে হয় তাহলে সেই দেশের প্রত্যেকটা মানুষকে প্রতিবন্ধী মানুষ হতে হবে।
আমি যখন প্রথমবার এই সংখ্যাটি নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি তখন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। আমাদের দেশে আদিবাসীদের সংখ্যা ২০ লাখের কাছাকাছি, আমরা এই মানুষগুলোর অধিকারের জন্য সব সময় সোচ্চার থাকি। সরকার যখন ঘোষণা দিল এই দেশে আদিবাসী নেই আমরা তখন তীব্র ভাষায় সরকারের সমালোচনা করেছিলাম। এই দেশের প্রায় নব্বই ভাগই এখন মুসলমান, বাকি অল্প যে কজন ভিন্ন ধর্মের মানুষ আছে তাদের নিয়ে যেন এ দেশে একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি থাকে আমরা সব সময়েই সেটা লক্ষ্য রাখার চেষ্টা করি। অথচ সংখ্যায় তাদের থেকে অনেক বেশি হচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষ, কিন্তু তারা কী পূর্ণাঙ্গ মানুষের মর্যাদা নিয়ে এ দেশে আছে নাকি একটা ঘরের ভেতর সবার চোখের আড়ালে এক ধরনের গভীর হতাশায় ডুবে আছে সেটা নিয়ে আমরা কখনও মুখ ফুটে কথা বলি না। এর চাইতে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?
প্রতিবন্ধী মানুষ নিয়ে আমাদের ভেতরে এখনও কোন সচেতনতা নেই। বরং উল্টোটা আছে, তাদের সম্পর্কে আমাদের নানা রকম নেতিবাচক ধারণা আছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আমরা প্রথম একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র ভর্তি করেছিলাম তখন বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সব বুড়ো প্রফেসর আমাদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে নানা ধরনের হাইকোর্ট দেখাতেন তাঁরা রীতিমতো আঁতকে উঠেছিলেন। ‘কানা খোঁড়া’ মানুষ ভর্তি করে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ঝামেলা তৈরি না করি সেজন্য আমাদের উপদেশ দিয়েছিলেন। প্রথমবারের মতো একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র ভর্তি হচ্ছে, তাও সেটি কোন কোটায় নয় নিজের যোগ্যতায় সেটি নিয়ে আমার ভেতরে এক ধরনের আনন্দ ছিল এবং আমার মনে আছে একাডেমিক কাউন্সিলে বুড়ো প্রফেসরদের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রতিবন্ধী ছাত্রটি ভর্তি করা হয়েছিল। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের দৃষ্টিভঙ্গি যদি এ রকম ভয়াবহ হয় তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে সেটা অনুমান করা কঠিন নয়। এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। একজন প্রতিবন্ধী ছাত্র যেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিকভাবে পড়তে পারে সেজন্য নীতিমালা আছে, আমরা তাদের প্রয়োজনটুকু দেখার চেষ্টা করি।
কিন্তু এই কথাটি কী পুরোপুরি সত্যি? আমাদের দেশে আইন করা হয়েছে প্রত্যেকটা নতুন বিল্ডিংয়ে হুইলচেয়ার করে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাথরুমগুলোতে যেন হুইলচেয়ার নিয়ে একজন প্রতিবন্ধী মানুষ ঢুকতে পারে তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের এত আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিল্ডিংয়ে সেটি করা হয়নি। আমার মনে আছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি টিম এসেছে যার একজন হুইলচেয়ারে চলাফেরা করে। অত্যন্ত দক্ষ প্রোগ্রামার হিসেবে সেই টিম একটা পুরস্কার পেয়ে গেল, এখন তাদের মঞ্চে গিয়ে পুরস্কার নিতে হবে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা আমাদের অডিটরিয়ামের রাজসিক মঞ্চ কিন্তু হুইলচেয়ারে করে আসা সেই ছেলেটির মঞ্চে ওঠার কোন জায়গা নেই। লজ্জায় মনে হলো মাটির সঙ্গে মিশে যাই। তার বন্ধুরা তাকে হুইলচেয়ারসহ মঞ্চে তুলে নিয়ে এলো। সেখানে বন্ধুদের ভালবাসা আছে কিন্তু পুরস্কার পাওয়া তরুণের সম্মানটুকু নেই। আমি তখন তাকে কথা দিয়েছিলাম পরের বছর সে যদি আসে আমরা তাহলে তার জন্য একটা র্যাম্পের ব্যবস্থা করে রাখব। (সত্যি কথা বলতে কী, পরের বছরও আমি বিষয়টা ভুলে গিয়েছিলাম। একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন মনে পড়েছে তখন তাড়াতাড়ি করে একজন কাঠমিস্ত্রি ডেকে খুব দায়সারা একটা র্যাম্প তৈরি করে রেখেছিলাম যেন সেটা দিয়ে তার বন্ধুরা হুইলচেয়াটাকে খানিকটা হলেও সম্মান নিয়ে উপরে নিয়ে যেতে পারে!)
নতুন একটা বিল্ডিং তৈরি করতে যত টাকা দরকার হয় তার তুলনায় সেই বিল্ডিংয়ে হুইল চেয়ারে ওঠার ব্যবস্থা করে দেয়া বা বাথরুমে হুইলচেয়ার নিয়ে ঢোকার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য বলতে গেলে কিছুই খরচ নেই, তারপরেও সেটা করা হয় না। দেশে এটা নিয়ে একটা আইন তৈরি করা হয়েছে, আমরা বেশিরভাগ সেই আইনটার কথা জানিই না! বিল্ডিংয়ে ঢোকার শুধু একটা অংশ, যে মানুষটি হুইলচেয়ারে চলাফেরা করে তার কোন একটা বিল্ডিংয়ে ঢোকার আগে অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়ে আসতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে রাস্তাঘাট যানবাহন কোনকিছুতেই কিন্তু হুইলচেয়ারে করে যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। যে সব দেশ প্রতিবন্ধী মানুষবান্ধব সেখানে গেলে এক ধরনের মুগ্ধতা নিয়ে দেখতে হয় তারা কত গভীর মমতা নিয়ে এই মানুষগুলোর চলাফেরার ব্যবস্থা করে রেখেছে। সেখানে সাধারণ মানুষের চলাফেরা করার যেটুক অধিকার হুইলচেয়ারে করে একজন মানুষের তার সমান অধিকার। রাস্তাঘাট ফুটপাথ সব জায়গায় হুইলচেয়ার নিয়ে যাওয়া যায়, হুইলচেয়ারের সুবিধাটুকু বড় বড় স্পষ্ট সাইন দিয়ে বলে দেয়া থাকে। পার্কিংলটে হুইলচেয়ারের যাত্রীদের গাড়ি পার্কিংয়ের আলাদা জায়গা থাকে। বাস, ট্রেনে তাদের ওঠার ব্যবস্থা থাকে, ওঠার পর হুইলচেয়ারে বসে যাওয়ার আলাদা জায়গা থাকে। একজন মানুষ তার বাসা থেকে হুইলচেয়ারে রওনা দিয়ে সারাদিন পুরো শহর চষে বেড়িয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসতে পারবে, তারে একটি বারও অন্য কারও সাহায্য নিতে হবে না। আমাদের পাশের দেশ ভারতবর্ষ যদি এর মাঝেই প্রতিবন্ধী মানুষদের যাতায়াতের জন্য অনেক কিছু করে ফেলতে পারে তাহলে আমরা কেন পারব না?
একটি প্রতিষ্ঠানকে কিংবা একটা শহরকে এমনকি একটা দেশকেও যদি হুইলচেয়ারে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিতে হয় তার জন্য এমনকিছু বাড়তি টাকা পয়সার দরকার হয় না। যেটুকু দরকার হয় সেটি হচ্ছে একটুখানি ইচ্ছে বা একটুখানি সিদ্ধান্ত। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে ক্ষুদ্র টাকা পয়সা খরচ করে সবার জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা হবে তার প্রতিদানে যেটুকু পাওয়া যাবে তার মূল্য সেই টাকা পয়সার সহস্র গুণ বেশি। প্রতিবন্ধী মানুষ বলে আমরা যাদের চোখের আড়াল করে রেখেছি, সমাজের বোঝা বলে আমরা যাদের অবহেলা করে এসেছি, তাদের কিন্তু আসলেই সবার চোখের আড়ালে সমাজের বোঝা হিসেবে থাকার কোন প্রয়োজন নেই। যদি এই দেশের পথেঘাটে বাসে ট্রেনে গাড়িতে একজন হুইলচেয়ারে করে নিজে নিজে যেতে পারে তাহলে আমরা অবাক হয়ে দেখব তাদের আর পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে না, তারা নিজেরাই অনেক সময় নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে নিতে পারবে। এই দেশের দুই কোটি চল্লিশ লাখ মানুষ যদি কোন না কোন ভাবে প্রতিবন্ধী হয় তাহলে তাদের ঘরের মাঝে আটকে রেখে চোখের আড়াল করে ফেলার চেষ্টা করার কোন মানে হয় না। আমাদের তাদের মুক্ত করে দিতে হবে। এই বিশালসংখ্যক মানুষের যতজনকে সম্ভব পরিপূর্ণ জীবন যাপনের অধিকার দিতে হবে।
