আমার সব সময় মনে হয় আমাদের দেশে মানুষের মাঝে বৈচিত্র (diversity) বলতে গেলে নেই। আমাদের খুব দুর্ভাগ্য আমাদের দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ভিন্ন কালচার, ভিন্ন ভিন্ন গায়ের রঙ, ভিন্ন ভিন্ন চেহারা, ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মানুষ খুব কম। তাই যে কয়জন আছে তাদেরকে আমাদের বুক আগলে রাখার কথা, আমাদের লক্ষ্য রাখার কথা তারা যেন তাদের ভাষার চর্চা করতে পারে, তাদের সংস্কৃতিটাকে ধরে রাখতে পারে, তাদের ধর্ম নির্ভয়ে পালন করতে পারে। আগের প্রজন্মের অনেকেই বড় ধরণের ভুল ধারণা নিয়ে বড় হয়েছে। আমাদের বাচ্চাদের পাঠ্যবইয়ে কিছুদিন আগেও আদিবাসী বা সংখ্যালঘু এমন কী মেয়েদের নিয়ে কী অসম্মানজনক কথা লিখে রাখা হতো সেটা কী কেউ লক্ষ্য করেছে? আস্তে আস্তে সেগুলো পাল্টানো হচ্ছে। আমার খুব বিশ্বাস করার ইছে যে আমাদের নূতন প্রজন্ম বড় হবে অনেক উদার মনের, আমরা পৃথিবীর যে সৌন্দর্য দেখতে পারিনি। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মাঝে তারা সেই সৌন্দর্য দেখতে পাবে। রামু, উখিয়া, পটিয়ায় যে ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে সেটা যেন এই দেশের মানুষদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমাদের আরো সতর্ক হতে হবে। নূতন প্রজন্মকে একেবারে শৈশব থেকে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন কালচার, ভিন্ন ঐতিহ্যকে সম্মান করা শেখাতে হবে।
এই দেশে যারা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী তারা নিশ্চয়ই তাদের মনের ভিতর একটি গভীর বেদনা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আমি তাদেরকে বলতে চাই তারা যেন হতাশাগ্রস্থ না হন, রামুর সেই ভয়ংকর রাতেও অল্প কিছু মানুষ জীবনের ঝুকি নিয়ে এই উন্মত্ত ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল, এই দেশে এ রকম অসংখ্য মানুষ আছে, তারাই হচ্ছে এই দেশের শক্তি। এই দেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক নয়, আমি নিশ্চিত ছাই হয়ে যাওয়া ফিনিক্স পাখী যেরকম আবার নূতন জন্ম নিয়ে পাখা মেলে দাঁড়ায়, এই দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনাও সেভাবে পাখা মেলে দাড়াবে।
মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রীস্টান যেভাবে পাশাপাশি যুদ্ধ করে বুকের রক্ত দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছে, ঠিক সেভাবে আবার সবাই মিলে পাশাপাশি দাড়িয়ে এই দেশ থেকে চিরদিনের জন্য সাম্প্রদায়িকতার বিষ বৃক্ষকে টেনে উপড়ে তুলে ফেলতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশ নামের দেশটিই তো অর্থহীন হয়ে যাবে।
সূত্র: http://www.sadasidhekotha.com/article.php?date=2012-10-09
প্রতিবন্ধী নই, মানুষ
১.
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে অনেক কাজ করি সে কারণে তাদের অনেকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে এবং ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। একবার কোন এক কারণে আমি তাদের অফিসে গিয়েছি, সেখানে যাঁরা ছিলেন তাঁদের প্রায় সবাই শুধু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নন, বেশিরভাগই পুরোপুরি দৃষ্টিহীন। সে জন্য তাঁরা যে কোন কাজকর্ম করছেন না তা নয়, সবাই কিছু না কিছু করছেন। কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, তখন হঠাৎ কারেন্ট চলে গিয়ে অন্ধকার হয়ে গেল। কারেন্ট চলে গেলে অন্ধকার হলে আমাদের কাজকর্ম থেমে যায়, কারেন্ট এলে আবার কাজ শুরু হয়। আমি নিজের অজান্তেই সে রকম কিছু একটা ভেবেছিলাম কিন্তু হঠাৎ করে আবিষ্কার করলাম সেই প্রতিষ্ঠানের কোন কাজ বন্ধ হলো না, সবাই নিজের মতো কাজ করতে লাগলেন। বিষয়টা আমার আগেই অনুমান করার কথা ছিল কিন্তু কখনও মাথায় আসেনি। আমরা যারা চোখ ব্যবহার করে কাজকর্ম করি তারা অন্ধকারে কাজ করতে পারি না। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা পারে, আলো না থাকলে আমরা খানিকক্ষণের জন্য প্রতিবন্ধী হয়ে যাই, তারা হয় না।
আমার অবিশ্য তখন আরও কিছু জানা বাকি ছিল। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের লেখাপড়ার জন্য ব্রেইল পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। কাগজে যখন ব্রেইলে কিছু লেখা হয় তখন সেটা খানিকটা উঁচু হয়ে যায় এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা হাত দিয়ে স্পর্শ করে সেটা পড়তে পারেন। এই ব্রেইল প্রিন্টার খুব দামী একটা প্রিন্টার তাই অনেকদিন থেকেই আমি সাধারণ ডট মেট্রিক্স প্রিন্টার দিয়ে ব্রেইলে লেখার একটা পদ্ধতি বের করার চেষ্টা করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত সেই প্রিন্টার তৈরি হয়েছে এবং সেই প্রিন্টারে লেখা পড়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা খুব খুশি। এ রকম সময়ে তাদের কমবয়সী একজন ছেলে বলল, ‘স্যার, আমাদের এখানে সত্যিকারের ব্রেইল প্রিন্টার আছে, আপনাকে দেখাই।’ আমি আগে ব্রেইল প্রিন্টার দেখিনি তাই তার সঙ্গে পাশের ঘরে গেলাম। সেখানে সে কম্পিউটার টেপাটেপি করে ব্রেইল প্রিন্টারে কিছু একটা প্রিন্ট করতে দিল। সারা পৃথিবীর সকল প্রিন্টারে যা হয় এই মহামূল্যমান প্রিন্টারেও তাই হলোÑ হঠাৎ করে ভেতরে কাগজটা আটকে গেল। আমি ধরেই নিলাম ব্রেইল প্রিন্টার দেখানোটা আজকের মতো এখানেই শেষ।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ব্রেইল প্রিন্টার দেখানো এখানেই শেষ হলো না। কারণ আমি দেখলাম পুরোপুরি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছেলেটা একটা স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে প্রিন্টারটা খুলতে শুরু করল। কিছুক্ষণেই সে প্রিন্টারটা খুলে ফেলল এবং ভেতরের যন্ত্রপাতি আলাদা হয়ে গেল এবং ভেতরে কোন এক জায়গায় আটকে থাকা কাগজটা টেনে বের করে ফেলল। তারপর যে দক্ষতায় সে প্রিন্টারটি খুলেছিল সেই একই দক্ষতায় পুরো প্রিন্টারটা জুড়ে ফেলল। (আমি যখন যন্ত্র খুলে সেটা আবার লাগানোর চেষ্টা করি তখন সব সময়েই কিছু স্ক্রু বাড়তি থেকে যায়, এবারে কিন্তু কোন বাড়তি স্ক্রু থাকল না এবং সব স্ক্রু ঠিক ঠিক জায়গায় লাগানো হয়ে গেল।) প্রিন্টার রেডি হবার পর সে আবার কম্পিউটার টেপাটিপি করে কাগজে ব্রেইল প্রিন্ট করে দেখাল। ব্রেইল প্রিন্টার দেখে আমি যতটুকু মুগ্ধ হয়েছিলাম তার থেকে এক শ’ গুণ বেশি মুগ্ধ হলাম এই ছেলেটিকে দেখে। একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ নিশ্চয়ই কিছু কিছু কাজ কখনই করতে পারবে না আমার মনে সে রকম একটা ধারণা ছিল। আমি ধরেই নিয়েছিলাম কিছু কিছু কাজ নিশ্চয়ই শুধুমাত্র যারা দেখতে পায় তারা করবে। আমার ভুল ভাঙল, কে কী কাজ করতে পারবে আর কী কাজ করতে পারবে না সেই সীমারেখাটি কেউ কোনদিন টানতে পারবে না। আমি যাকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভেবে এসেছি আসলে নিজের চোখে দেখলাম দৃষ্টি না থাকাটা এখন আর তার জন্য কোন প্রতিবন্ধকতা নয়, আমরা যে কাজটা আমাদের দৃষ্টি ব্যবহার করে করি এই ছেলেটি সেই একই কাজ দৃষ্টি ব্যবহার না করেই করতে শিখেছে। সবাই হয়ত তার মতো পারবে না কিন্তু এই ছেলেটি যেহেতু পারে তার অর্থ চেষ্টা করলে পারা সম্ভব। ঠিকভাবে সুযোগ দেয়া হলে আরও অনেকে নিশ্চয়ই আরও অনেক কিছু করতে পারবে যেটা আমরা এখন চিন্তাও করতে পারি না। আমার মনে হলো হয়ত প্রতিবন্ধী শব্দটাই নতুন করে ব্যাখ্যা করা দরকার, তার কারণ একজন একদিকে প্রতিবন্ধী হলেও অন্যদিকে তারা সেটি পূরণ করে নিতে পারে, আমাদের শুধুমাত্র সেই সুযোগটি করে দিতে হবে।
এটি যে আমার দেখা একটিমাত্র ঘটনা তা কিন্তু মোটেও নয়। বেশ কয়েক বছর আগে একটি মেয়ে আমাকে কোন একটি কাজে ফোন করেছিল। ফোনে কথা বলে বুঝতে পারলাম সে শারীরিকভাবে একজন প্রতিবন্ধী মানুষ, তাকে চলাফেরার জন্য হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়। আমাকে কেন ফোন করেছিল এতদিন পরে আর মনে নেই, আমি তাকে সম্ভবত ছোটখাটো সাহায্যও করেছিলাম। মেয়েটি ব্লগে লেখালেখি করে, প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার নিয়ে সে রীতিমতো একটা আন্দোলন শুরু করেছে। তার তৈরি করা একটা সংগঠনও আছে এবং সেখানে আরও অনেকে যোগ দিয়েছে। (মেয়েটি বা তার প্রতিষ্ঠানের নাম বললে অনেকেই হয়ত তাকে চিনে যাবে, ইচ্ছে করেই তার নামটা এখানে উচ্চারণ করছি না। আমি যে কারণে এই লেখাটি লিখছি সেখানে তার পরিচয়টি হবে একজন প্রতিবন্ধী মানুষ, আমি সেটা চাই না। তার সত্যিকারের পরিচয় সে ঠিক আমাদের মতো একজন মানুষ, যখন সে রকমভাবে পরিচয় দিই তখন তার নাম লিখতে আমার কোন দ্বিধা হবে না।) যাই হোক, এক সময় মেয়েটির সঙ্গে আমার দেখা হলো, তখন আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম তার যে এত লেখালেখি, এত বড় সংগঠন, এত চমৎকার একটি আন্দোলন, সমাজের জন্য তার চেয়ে এত বড় অবদান তার সবকিছু করেছে শুধুমাত্র একটি আঙ্গুল দিয়ে। সারা শরীরের শুধু এই আঙ্গুলটি দিয়ে কোন কিছু স্পর্শ করতে পারে। সত্যি কথা বলতে কী এই মেয়েটিকে দেখে আমার নিজেকে পুরোপুরি অকিঞ্চিতকর একজন মানুষ বলে মনে হয়েছে। শুধুমাত্র একটা সচল আঙ্গুল দিয়ে একজন মানুষ যদি এত কিছু করতে পারে তাহলে আমরা আমাদের সারা শরীর হাত পা মাথা ঘাড় বুক পেট সবকিছু নিয়ে কেন কিছু করতে পারি না? এই মেয়েটি যদি কোন অভিযোগ না করে তার সব কাজ করে যেতে পারে তাহলে আমরা কেন সারাক্ষণ জগতসংসার দেশ নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করে অভিযোগ করি? আমাদের সমস্যাটা কেথায়?
বেশ কিছুদিন আগে আমি আরও একটি টেলিফোন পেয়েছিলাম, যে আমাকে ফোন করেছিল সেও ছিল একটি মেয়ে। গলার স্বর শুনে বুঝতে পারলাম বয়স বেশি নয়, কিছু তার কথা বুঝতে আমার একটু সমস্যা হচ্ছিল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল তার গলার স্বরটা কেমন যেন একটু যান্ত্রিক। মেয়েটি তখন আমাকে এসএমএস পাঠাল এবং সেখান থেকে জানতে পারলাম সে শুধু হুইলচেয়ারে নয়, সে পাকাপাকিভাবে একটা বিছানায় আবদ্ধ একজন মানুষ। কিছুদিন আগেও সে পুরোপুরি সুস্থ সবল ছটফটে দুরন্ত একটি মেয়ে ছিল। কোন একটি গণিত অলিম্পিয়াডে তার সঙ্গে নাকি আমার একবার দেখাও হয়েছিল। কোন একভাবে সে তার স্কুলের চারতলা থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল, সেখান থেকে পড়ে কারো বেঁচে থাকার কথা নয়, সে প্রাণে বেঁচেগিয়েছিল কিন্তু সে চিরদিনের জন্য একটা বিছানায় আবদ্ধ হয়ে পড়ল, নিশ্বাসটুকুও নিতে হয় যন্ত্র দিয়ে। সেই মেয়েটিও তার একটি মাত্র আঙ্গুল ব্যবহার করে কবিতা লিখত, সেই কবিতা সে আমার কাছে পাঠিয়েছিল। আমাকে বলেছিল এই শারীরিক অবস্থা নিয়ে সে নাকি ছবিও আঁকত। বিছানার মাঝে আটকে থাকা একটা কিশোরীর সামনে বাইরের পৃথিবীর জানালা কিভাবে খুলে দেয়া যায় আমি যখন সেটা ভাবছি তখন তার একজন বান্ধবী আমাকে জানাল সেই মেয়েটি আর বেঁচে নেই। যে মানুষটিকে কখনও সামনা সামনি দেখিনি তার জন্য দুঃখে আমার বুকটা একেবারে ভেঙ্গে গিয়েছিল।
