৩.
কিছুদিন আগে একজন ব্রিটিশ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কাজগুলো দেখতে এসেছিল। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে জানতে পারলাম সে গণিতে লেখাপড়া করে এসেছে। যে মানুষটি চোখে দেখতে পায় না সে কেমন করে গণিত নিয়ে পড়াশোনা করতে পারে সেটি নিয়ে আমার কৌতূহল ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করায় সে বলল চোখে দেখতে পায় না বলে ভুল করে সে অন্য একটি ক্লাশরুমে গিয়েছিল, সেখানে সে শুনতে পেল গণিত পড়ানো হচ্ছে, তার কাছে মনে হলো বিষয়টা খুব চমৎকার তখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের গিয়ে জানাল সে গণিতে স্নাতক পড়তে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় অধ্যাপক বলল, যে মানুষ চোখে দেখতে পায় না সে কখনও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গণিতে স্নাতক ডিগ্রী নিতে পারবে না। মেয়েটি বলল, এটা তোমাদের একটা থিওরি, আমাকে দিয়ে এই থিওরির একটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখো তোমাদের থিওরিটা সঠিক কী না! কাজেই প্রফেসররা তাকে গণিত পড়তে দিতে বাধ্য হন। এবং সে সকল থিওরিকে ভুল প্রমাণিত করে স্নাতক ডিগ্রী নিয়ে বের হয়ে এলো!
আমি তখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, লন্ডন শহরে তুমি কেমন করে যাতায়াত কর? সে বলল, সে সম্পূর্ণ একা একা পুরো লন্ডন শহর চষে বেড়ায়, সে জন্য তার দরকার ছোট একটা কম্পিউটার ট্যাবলেট, আর কিছু নয়!
এই বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির এমন কিছু নতুন আবিষ্কার এখন সবার হাতে হাতে চলে এসেছে যেগুলো প্রতিবন্ধী মানুষের সামনে একেবারে নতুন একটি দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। একটি উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশের মানুষের প্রয়োজন ভিন্ন, কাজেই এর সমাধানও হতে হবে ভিন্ন আর সেই কাজটুকু করতেও হবে আমাদের নিজেদের। এর মাঝে সেটি শুরু হয়েছে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা সেটা করার চেষ্টা করি, অন্যরাও যদি করে আমার মনে হয় অনেক কিছু হতে পারে।
৪.
প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন নিয়ে আমাদের কোন আগ্রহ নেই, তাই তাদের লেখাপড়া নিয়ে আমাদের আগ্রহ থাকবে সেটি নিশ্চয়ই আমরা আশা করতে পারি না। প্রতিবন্ধী বাচ্চারা যতটুকু সম্ভব সাধারণ বাচ্চাদের সঙ্গে লেখাপড়া করে বড় হবে সেটা সবার স্বপ্ন। এই মুহূর্তে তার ব্যবস্থা নেই কিন্তু আইন করে সেই ব্যবস্থা করা হবে। আমরা তার অপেক্ষা করে আছি। যেটি করা কঠিন সেটা করতে সময় লাগতে পারে। কিন্তু যেটি করা সোজা সেটি যদি করা না হয় তাহলে আমরা হতাশা অনুভব করতে থাকি। যেমন ধরা যাক ব্রেইল বইয়ের ব্যাপারটি, কথা ছিল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের জন্য ব্রেইল বই দেয়া হবে কিন্তু সেটি দেয়া হলো না। তখন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সঙ্গে আমরা অন্তত পক্ষে পাঠ্য বইগুলোর সফট কপির জন্য ঘঈঞই-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করলাম যেন নিজের উদ্যোগে সেগুলোকে ব্রেইল করে নেয়া যায়। বিচিত্র ব্যাপার হচ্ছে, প্রত্যেকটা পাঠ্যবই পি.ডি.এফ
করে তাদের ওয়েবসাইটে রাখা আছে যে কেউ সেটা ডাউনলোড করে নিতে পারবে। কিন্তু ব্রেইলে ছাপানোর জন্য যে রকম ভাবে টেক্সট ফাইল দরকার সেটি কিছুতেই পাওয়া গেল না।
বিষয়টি যখন জানাজানি হলো তখন এই দেশের তরুণেরা নিজেরা সেই বইগুলো নতুন করে টাইপ করে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে! প্রতিবছর এই দেশের বাচ্চারা নতুন বই হাতে বুঝে বিশাল একটা হাসি নিয়ে বাড়ি যায়Ñ এর চাইতে সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে বলে আমার জানা নেই। ঠিক একই সময় সব রকম চেষ্টা করেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য পুরো ক্লাসের জন্য একটা করে ব্রেইল বই আমরা তুলে দিতে পারি না! শুধু তাই নয়, যখন প্রক্রিয়াটা আমরা নিজেরাই করতে চাই তখনও ঘঈঞই থেকে আমরা সহযোগিতা পাই না।
৫.
আগামী ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো দিনটিকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়ে সবার ভেতরে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি করবে বলে খুব আশা করে আছি। প্রতিবন্ধী মানুষদের আমাদের পাশাপাশি নিয়ে এসে এক সঙ্গে কাজ করার গন্তব্যটুকুতে আমরা এখনও পৌঁছিনি। যাত্রা শুরু করলে এক সময় পৌঁছব, আমরা এখনও যাত্রা শুরু করিনি। সবাই মিলে যাত্রাটাকু শুরু করি, কাজটুকু খুবই সহজ, শুধু মনে রাখতে হবে প্রতিবন্ধী মানুষেরা আসলে প্রতিবন্ধী নয়, আসলে তারা মানুষ।
২০-১১-১৩
প্রশ্নপত্র ফাঁস কি অপরাধ নয়
আমি খুব আশাবাদী মানুষ। আমার পরিচিত মানুষেরা আমার এই লাগামছাড়া আশাবাদ দেখে খানিকটা কৌতুক অনুভব করেন, আমি তাতে কিছু মনে করি না। তার প্রথম কারণ, এই আশাবাদের কারণে আমি অন্যদের থেকে অনেক বেশি আনন্দে দিন কাটাই। দ্বিতীয় কারণ, আমার দীর্ঘজীবনে আমার বেশিরভাগ আশাবাদই সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
এই দেশ নিয়েও আমি সবসময় খুব আশাবাদী। আমার নিজের চোখেই দেখছি, দেশটি আর দারিদ্রে মুখ থুবড়ে পড়া দেশ নয়। দেশটির অর্থনীতি আগের থেকে অনেক বেশি শক্ত। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী পাশের দেশের মানুষ থেকে আমাদের দেশের মানুষ অনেক দিক থেকেই বেশি শান্তিতে আছেন। এ রকম তথ্য আমি অমর্ত্য সেনের লেখা থেকে জেনেছি।
এখন পর্যন্ত আমাদের দেশের অর্থনীতি চালিয়ে যাচ্ছে গার্মেন্টসের মেয়েরা, প্রবাসী শ্রমিকেরা এবং খেত-খামারের চাষীরা। আমাদের মতো শিক্ষিত মানুষেরা এখনও দেশের অর্থনীতিতে সে রকম কিছু দিতে পারেনি, কিন্তু আমি সেটা নিয়ে মোটেও নিরাশ নই। আমি সবসময় জোর গলায় বলি, আমাদের দেশের স্কুলের ছাত্রছাত্রীই হচ্ছে প্রায় তিন কোটি (কানাডার লোকসংখ্যার সমান)। আর এই ছাত্রছাত্রীরা ঠিকভাবে লেখাপড়া শিখে যখন খেটে খাওয়া মানুষজনের পাশে দাঁড়াবে, তখন দেশের চেহারা পাল্টে যাবে।
