এর পরের ঘটনাগুলোর মাঝে অনেক রহস্য। ক্ষিপ্ত মানুষজন শুধু বৌদ্ধ ধর্মালম্বী সেই তরুনের উপর ক্ষিপ্ত হল না তারা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী সকল মানুষের উপর ক্ষিপ্ত হল। এরকম সময় সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করতে হয় রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে, উত্তেজিত মানুষদের শান্ত করে পুরো অবস্থাটাকে নিয়ন্ত্রন করতে হয়। কিন্তু আমরা খবরের কাগজে অবাক হয়ে দেখলাম বিএনপি দলীয় সংসদ বিক্ষোভকারীদের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করলেন। আওয়ামী লীগ ধর্ম নিরপেক্ষ দল, তাদের সরকার তাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তাদের, তারাও সাচ্চা মুসলমান হওয়ার এই সুযোগটা ছাড়লেন না, তাদের অঙ্গ সংগঠন মিছিল বের করে স্লোগান দিল, ‘বড়ুয়াদের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে’, তার চাইওতে ভয়ংকর তথ্য পুলিশদের নিয়ে তারা বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের রক্ষা করার চেষ্টা দূরে থাকুক বরং উত্তেজিত মানুষদের উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দেয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
প্রশাসন, সরকারী দল, বিরোধী দল সবাই যদি বোদ্ধ ধর্মালম্বীদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়ে যায় তাহলে জামাতে ইসলামী, ধর্মান্ধ, রোহিঙ্গা জঙ্গী তারা এই সুযোগটি কেন ছেড়ে দিবে? বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, মোটর সাইকেল হাজার হাজার লোক হাজির করে ফেলল, রীতিমত উৎসব করে তারা একটি নয়, দুটি নয় বারোটি বৌদ্ধ বিহার পুড়িয়ে দিল। ২০০১ সালে তালেবানরা যখন আফগানিস্থানের বামিয়ানে বৌদ্ধ মূর্তিগূলো ধ্বংস করছিল সেই দৃশ্যটি আমার ভেতর যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল রামুর ঘটনা তার থেকে অনেক বেশী ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেক কষ্টে পাওয়া আমাদের এই দেশটিকে নিয়ে আমাদের কতো ভালোবাসা, কতো স্বপ্ন, মাত্র কয়েক ঘন্টার মাঝে সারা পৃথিবীর সামনে আমাদের দেশের মুখে যে কালিমা লেপে দেয়া হলো সেটি কী আমরা এতো সহজে মুছে ফেলতে পারব?
ঘটনা সেখানেই শেষ নয়। আমরা ভেবেছিলাম এরকম ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটে যাবার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সবাই সতর্ক হয়ে যাবে কিন্তু হতবাক হয়ে দেখলাম এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে লাগল, পরের দিন উখিয়া আর পটিয়াতে একই ঘটনা ঘটতে লাগল। শুধু বৌদ্ধ বিহার নয় হিন্দু মন্দির পুড়িয়ে দেয়া শুরু হয়ে গেল।
রাজনৈতিক দলগুলো এই উন্মত্ততা থামানোর কোনো চেষ্টা করছে বলে মনে হল না কারন আমরা অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম তারা একে অপরকে গালাগাল করার কাজে লেগে গেল। এর চাইতে বড় হৃদয়হীন ব্যাপার আর কী হতে পারে?
২.
একটা দেশ কেমন চলছে সেটা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে সেই দেশের সংখ্যা লঘুদের দেশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা। তারা যদি মনে করে তারা নিরাপদে আছে, দেশের অন্য দশজন মানুষের মতো তারাও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারছে তাহলে বুঝতে হবে দেশটা ভালো চলছে। যদি দেখা যায় তাদের ভেতর এক ধরনের হতাশা, অনিশ্চয়তা আর আতংক তাহলে প্রতি মাসে একটা করে পদ্মা সেতু তৈরী করলেও বুঝতে হবে দেশটি ভালো নেই।
আমি নিজে কোনো জরিপ করিনি কিন্তু তারপরেও আমি জানি এই দেশের সংখ্যা লঘুরা ভালো নেই। জাতিসংঘে চাকরী করে সেনাবাহিনীর লক্ষ লক্ষ টাকা কামাই করতে যেন কোনো অসুবিধে না হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্য সরকার যেদিন ঘোষনা দিল এই দেশে আদিবাসী বলে কেউ নেই সেদিন শুধু আদিবাসীরা নয়, সংখ্যালঘুরাও হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। যে রাজনৈতিক নেতারা আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে বলতে এক সময় মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন এখন তারাই যখন চোখের পাতি না ফেলে অম্লান বদনে বলেন এই দেশে কোনো আদিবাসী নেই তখন আমি হতবাক হয়ে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। (যারা এখনো জানেন না তাদের মনে করিয়ে দেই, আদিবাসী মানে নয় যারা আদি থেকে বাস করছে, ইংরেজী Indigenous শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে আদিবাসী শব্দটা ব্যবহার করা হয় যার অর্থ মূল ধারা থেকে আলাদাভাবে থেকে যারা তাদের আদি ঐতিহ্যকে ধরে বেঁচে থাকে।)
এই দেশে সংখ্যালঘুরা যে ভালো নেই তার খুব বড় একটা প্রমান কয়দিন আগে পত্রিকায় বের হয়েছিল, সেখানে লেখা হয়েছিল এই দেশে হিন্দুদের সংখ্যা খুব দ্রুত কমে যাচ্ছে। আমরা সবাই সেই রিপোর্টটি দেখেও না দেখার ভান করেছি, পত্রপত্রিকার কোথাও সেটা নিয়ে কারো আলোচনা বা মন্তব্য চোখে পড়েনি। মনে হয় সবাই ধরে নিয়েছে এরকমই তো হবার কথা। এই দেশে আহমদিয়াদের উপর নিয়মিত হামলা হয়, গত নির্বাচনে চার দলীয় জোট বিজয়ী হয়ে হিন্দুদের উপর একটা পৈচাশিক নিপীড়ন চালিয়েছিল, এবার প্রথমবারের মত বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের উপর হামলা হল, তাহলে কী তাদেরকেও এই দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার কূট কৌশল শুরু হয়েছে? মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর যে নিপীড়ন চলছে, এই দেশে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের উপর অত্যাচার করে তার একটা বদলা নেব, সেটাই কি উদ্দেশ্য? (একটা জিনিষ কী কেউ লক্ষ করেছে, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মহান নেতা সারা পৃথিবীতে সম্মানিত, নোবেল বিজয়ী আংশান সুচি কিন্তু তাদের দেশে রোহিঙ্গাদের উপর যে অত্যাচার হচ্ছে সেই বিষয়ে কখনো মুখ খুলেন না?)
৩.
আমি আমার সারা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যে কয়টি সত্য আবিষ্কার করেছি তার একটি মাত্র দুটি শব্দ ব্যবহার করে লিখে ফেলা যায়, সেটি হছে ‘বৈচিত্রেই সৌন্দর্য’- আমি এটা প্রথম স্পষ্টভাবে টের পেয়েছিলাম যুক্তরাষ্ট্রে। আমি বেল কমিউনিকেশন্স রিসার্চের যে গ্রুপে কাজ করতাম সেখানে প্রায় সব দেশেরই এক দুইজন করে লোক ছিল। পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা দেশের মানুষ সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করে মহানন্দে পাশাপাশি বাস করছে। (শুধু আমার মনে হয় কোনো সমস্যা আছে, তা নাহলে দেশের আকাশ কালো করে আসা মেঘ, ঝমঝম বৃষ্টি আর ব্যাঙের ডাক শোনার জন্যে কেন এতো মন কেমন কেমন করত কে জানে!) যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় বড় সমস্যা আছে (যেমন সেই দেশের কালো পুরুষ মানুষের বেশীর ভাগ জেলে থাকে) তারপরেও বলতে হবে এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন (diversity) ধরনের মানুষের বেঁচে থাকা। তারা নিজের দেশের ঐতিহ্য বা কালচারকে ছুড়ে ফেলেনি, সেগুলোকে ধরে রেখেই সবাই মিলে পাশাপাশি বাস করছে। যারা আমার কথা বিশ্বাস করতে চায় না তদেরকে বলব সেখানকার চায়না টাউন ঘুরে আসতে। আমার খুব মজা লাগে যখন দেখি সেখানে আজকাল বাংলা টাউনও তৈরী হতে শুরু করেছে। আমার বুকটা ভেঙ্গে যায় যখন দেখি এই দেশে আমরা আমাদের শিশুদের পুরোপুরি উল্টো জিনিষ শিখিয়ে বড় করি। তাদেরকে আমরা শেখাই, ‘আমার থেকে ভিন্ন মানে আমার থেকে খারাপ।’ অথচ সত্যি কথাটা হচ্ছে আমার থেকে ভিন্ন কাউকে পাওয়ার অর্থ হচ্ছে পৃথিবীটাকে আরেকটু সুন্দর করে দেখার একটা সুযোগ।
