ছেলেমেয়েদের আগ্রহ এবং দেশ কিংবা পৃথিবীর প্রয়োজনের কথা মনে রেখে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা অন্যান্য বিভাগের ছেলেমেয়েদের জন্যে দ্বিতীয় মেজর (Second Major) হিসেবে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার সুযোগ করে দিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী, সব বিভাগেই দ্বিতীয় মেজর নেওয়ার সুযোগ আছে। আমার ধারণা, সত্যিকারের আগ্রহ নিয়ে পড়ালেখা কেমন করে হয় এটি তার একটা চমৎকার উদাহরণ। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের সব পড়ার পাশাপাশি শুধুমাত্র আগ্রহের জন্যে বাড়তি পড়াশোনা করছে– বিষয়টি দেখলেই এক ধরনের আনন্দ হয়।
একটা সময় ছিল যখন আমি মেধাবী শব্দটা ব্যবহার করতাম। আমার চারপাশে অনেক ‘মেধাবী’ হয়ে জন্মায়, অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা সত্যিই বুঝি কিছু মানুষকে বেশি মেধা দিয়ে পাঠান। সেই ছাত্রজীবনেই আবিষ্কার করেছিলাম যে, আসলে বাড়তি মেধা বলে কিছু নেই, চারপাশের অনেক মেধাবী মানুষই জীবনযুদ্ধে ঝরে পড়েছে। আবার যাদেরকে নেহায়েতই সাধারণ একজন বলে ভেবেছিলাম, অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছি, তারা উৎসাহ, আগ্রহ আর পরিশ্রম করে ‘মেধাবী’ দের পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে।
সেগুলো দেখে দেখে আজকাল আমার নিজের ডিকশনারি থেকে ‘মেধাবী’ শব্দটা তুলে দিয়ে সেখানে ‘উৎসাহী’ শব্দটা ঢুকিয়েছি। আমি দেখেছি, উৎসাহ থাকলে সবই সম্ভব। সত্যি কথা বলতে কী, আমি আমার পরিচিত জগতের সব মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছি। এক ভাগ হচ্ছে যারা উৎসাহী; অন্য ভাগ হচ্ছে যাদের কিছুতেই উৎসাহ নেই, যাদেরকে ঠেলাঠেলি করে নিয়ে যেতে হয়। উৎসাহীরা পৃথিবীটাকে চালায়, বাকিরা তার সমালোচনা করে!
আমার চারপাশে অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে একজন ছেলে বা মেয়ে শুধুমাত্র নিজের উৎসাহটুকু দিয়ে এগিয়ে গেছে। এ রকম মানুষের সাথে কাজ করাতেও আনন্দ। উৎসাহ বিষয়টা ছোঁয়াচেও বটে– একজনের থেকে আরেকজনের মাঝেও সেটা সঞ্চারিত হয়ে যায়।
আমি পৃথিবীর অনেক বড় বড় স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি দেখেছি। তাদের সুযোগ সুবিধে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি– আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের কিছুই দিতে পারি না, মাঝে মাঝে শুধু একটুখানি উৎসাহ দিই। সেই উৎসাহ ভরসা করেই তারা কত কী করে ফেলে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই।
তাই আজকাল সুযোগ পেলেই আমি ছেলেমেয়েদেরকে বলি, তোমরা যেটুকু প্রতিভা বা মেধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছ সেটুকুতে সন্তুষ্ট থাকার কোনো কারণ নেই। তুমি ইচ্ছে করলেই সেটাকে শতগুণে বাড়িয়ে ফেলতে পারবে। কাজেই আমি মনে করি পৃথিবীতে আসলে প্রতিভাবান বা মেধাবী বলে আলাদা কিছু নেই, যাদের ভেতরে উৎসাহ বেশি আর যারা পরিশ্রম করতে রাজি আছে তারাই হচ্ছে প্রতিভাবান, তারাই হচ্ছে মেধাবী।
সে জন্যে আমি মাও সে তুংয়ের উক্তিটিতে ‘হাত’ থেকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিই মস্তিস্কের দশ হাজার কোটি নিউরনকে। দুটি হাত দিয়ে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই, কিন্তু মস্তিস্কের দশ হাজার কোটি নিউরন দিয়ে অচিন্ত্যনীয় ম্যাজিক করে ফেলা সম্ভব। দুটি হাত দিয়ে খুব বেশি হলে এক দুইজন মানুষের মুখে অন্ন জোগানো সম্ভব। দশ হাজার কোটি নিউরন দিয়ে লক্ষ মানুষের মুখেও অন্ন জোগানো যেতে পারে!
৪.
আমি জানি আমাদের সমস্যার শেষ নেই। আমি জানি সব সমস্যার সমাধানও চট করে হয়ে যাবে না– আমাদের দীর্ঘদিন এই সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু সেটি নিয়ে হতাশ হবার কিছু নেই, কারণ বাংলাদেশ এখন ধীরে ধীরে নিজের পায়ে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।
আমাদের দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের শক্ত দুটি হাত দিয়ে এই দেশকে ধরে রেখেছে। এই দেশের নূতন প্রজন্মকে তাদের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে দশ হাজার কোটি নিউরন নিয়ে!
জিপিএ ফাইভের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং, গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য– কোনো কিছুই এই দশ হাজার কোটি নিউরনকে পরাজিত করতে পারবে না।
দুঃখ, লজ্জা এবং ক্ষোভ (অক্টোবর ০৯, ২০১৩)
১.
কয়দিন থেকে মনটা খুব খারাপ – শুধু আমার নয়, আমার ধারনা পুরো দেশের প্রায় সব মানুষেরই মন খারাপ। একজন নয় দুইজন নয় – প্রায় আট দশ হাজার মানুষ এসে শতবর্ষের পুরানো ঐতিহ্যবাহী বারোটি বৌদ্ধ বিহার পুড়িয়ে দিয়ে গেল? যার অর্থ এই দেশে অন্তত আট দশ হাজার মানুষ আছে যারা বিশ্বাস করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের উপাসনালয় পুড়িয়ে দেয়া যায়। যারা পুড়িয়েছে তারা নাকি বেশিরভাগই তরুন – যে বয়সে বুকের ভেতর স্বপ্ন জন্ম নেয়, মানুষের জন্যে ভালোবাসা জন্ম নেয় সেই বয়সে তারা এসে এরকম ভয়ংকর একটি ঘটনা ঘটিয়ে যেতে পারল? শুধু কী উপাসনালয় – তারা বেছে বেছে শুধু বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের বাসাও পুড়িয়ে দিয়ে গেছে, সেই বাসায় যারা ছিল শিশু কিশোর তরুণ তরুণী – তাদের বুকের ভেতর যে আতংক আর হতাশার জন্ম দিয়ে গেছে এই দেশ কী কখনো তাদের সেই আতংক আর হতাশা মুছে দিতে পারবে?
ঘটনাটি ঘটে যাবার পর বহুদিন আমি খবরের কাগজ পড়তে পারিনি-সেগুলো জমিয়ে রেখেছি। আমি না পড়লেই তো সেই ভয়ংকর তথ্যগুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে না, তাই সাহস সঞ্চয় করে একসময় একটু একটু করে পড়েছি। পড়ে হতবুদ্ধি হয়ে যাচ্ছি, কিছুতেই হিসেব মিলাতে পারছি না।
ঘটনাটা শুরু হয়েছে ফেসবুকে পবিত্র কোরান শরীফ অবমাননার একটি ছবি ‘ট্যাগ’ করা থেকে। পৃথিবীতে ১০০ কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে, আমি সেই ১০০ কোটি মানুষের একজন নই (শুনেছি আমার নামে নাকি ফেসবুকে একাউন্ট আছে- আমার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই) তাই ছবি ‘ট্যাগ’ করা মানে কী আমি জানতাম না। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি আমাকে দেখানোর জন্য কেউ আমার ফেসবুকে একটা ছবি পাঠাতে পারে এবং সেটা স্বাভাবিক নিয়মে আমি তো দেখতেই পাব আমার ‘ফেসবুক বন্ধু’রাও দেখতে পাবে (মনে রাখতে হবে ‘বন্ধু’ এবং ‘ফেসবুক বন্ধু’ অনেকটা গণতন্ত্র এবং আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের মতো), যারা ফেসবুক করে তাদের সবারই চেষ্টা থাকে ‘ফেসবুক বন্ধু’দের সংখ্যা বাড়ানোর জন্যে, তাই তারা সবাই যে সত্যিকার বন্ধু এবং কারো মনে কোনো দুরভিসন্ধি নেই সেটা গ্যারান্টি করা খুব কঠিন। কাজেই কোনো একজন ‘ফেসবুক বন্ধু’ যদি আমার কাছে খুব একটা আপত্তিকর ছবি পাঠিয়ে বসে থাকে তাহলে আমার অন্য সব ‘ফেসবুক বন্ধু’রাও অবাক বিস্ময়ে দেখবে আমি একটা আপত্তিকর ছবি আমার ফেসবুক একাউন্টের মাধ্যমে প্রচার করে বেড়াচ্ছি – যদিও সেখানে আসলে আমার বিন্দুমাত্র ভূমিকা নেই। রামুতে ঠিক সেরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল, একজন বৌদ্ধ ধর্মালম্বী তরুনের ফেসবুক একাউন্টে কোনো একজন পবিত্র কোরান শরীফ অবমাননার একটা ছবি ট্যাগ করিয়ে সেই ছবিটি সেটি অন্যদের দেখার ব্যবস্থা করেছিল। তরুনটির ‘ফেসবুক বন্ধু’ সেই ছবিটি দেখে শুধু নিজেরাই ক্ষিপ্ত হল না, সেটি অন্যদের দেখিয়ে তাদেরকেও ক্ষিপ্ত হওয়ার সুযোগ করে দিল।
