সবাই চিৎকার করে বলল, ‘‘পারি!”
কী অসাধারণ একটি ব্যাপার! এই প্রথমবার আমি উল্লাসিত হয়ে বললাম, ‘‘আমি তোমাদের সবার জন্যে একটা করে বই এনেছি! তোমরা আস, আমি তোমাদের একটা করে বই উপহার দিই।”
অনুষ্ঠানের সব শৃঙ্খলা ধসে গেল, বাচ্চাগুলো ছুটে এল, আয়োজকেরা তাদের লাইন করিয়ে দিলেন, আমি তাদের হাতে একটি একটি বই তুলে দিলাম। আহা, কী মায়াকাড়া চেহারা, কিন্তু নিষ্ঠুর পৃথিবীর তাদেরকে দেবার মতো কিছু নেই। বাচ্চাগুলোর কিন্তু মুখে হাসি, তাদের কোনো অভিযোগ নেই, এই জীবন নিয়ে অভিযোগ করা যায় সেটি তারা জানেও না।
শুধু একজন আমার কাছে জানতে চাইল, “আমরা এখন ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়তে পারি। যদি আরও পড়তে চাই তাহলে কোথায় পড়ব?”
আমি তাকে আশ্বস্ত করে কিছু একটা উত্তর দিয়ে এসেছি, একটি মেয়ের লেখাপড়া হয়তো অনেক ভাবেই করা সম্ভব, কিন্তু তার মতো অন্যদের কে আশ্বস্ত করবে? আয়োজকেরা বাচ্চাদের দিয়ে একটা অনুষ্ঠান করিয়েছিলেন, সেই অনুষ্ঠান দেখে কে বলবে তাদের জীবন কাটে বাসার কাজ করে! ছোট একটি শিশুকে একটুখানি সুযোগ দেওয়া হলে তারা কত কী করে ফেলতে পারে?
এই দেশের সব শিশুদের আমরা কখন সেই সুযোগ করে দেব?
৩.
ঢেঁকি স্বর্গে দেলেও ধান ভানে, কাজেই আমি কিছু একটা লিখতে বসেছি লেখাপড়া নিয়ে যদি কিছু না বলি সেটা কেমন করে হয়?
খবরের কাগজে দেখেছি সংসদে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আমাদের শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় বলেছেন এই পাঁচ বছরে এই প্রথমবার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। খবরটি পড়ে আমার খুব মন খারাপ হয়েছে। কারণ আমি নিশ্চিতভাবে জানি, এই পাঁচ বছরে আরও অনেকবার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে।
আমার মতো আরও অসংখ্য ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকেরাও জানে– তারা যখন খবরের কাগজ এই খবরটি পড়বে তখন তাদের কী মনে হবে? আমাদের মাননীয় মন্ত্রী একটি সত্যকে অস্বীকার করছেন, নাকি তার থেকেও বেদনাদায়ক ব্যাপার, দেশের শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরও এই গুরুত্বপূর্ণ সত্যটির কথা কেউ তাকে জানায়নি? কোনটি বেশি বেদনাদায়ক?
আমরা সবাই প্রশ্ন ফাঁস সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম, তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে, রিপোর্টে বলা হয়েছে শুধু ইংরেজি এবং গণিতের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে– অথচ আমি নিজে খবরের কাগজে পদার্থ বিজ্ঞানের ফাঁস হয়ে যাওয়া চারটা প্রশ্ন সত্যিকার প্রশ্নের পাশাপাশি ছাপিয়েছিলাম। ফাঁস হয়ে যাওয়া অন্যান্য প্রশ্নগুলোও আমি ছাত্রদেরকে দিয়ে তদন্ত কমিটির হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম! হাতে প্রমাণ থাকার পরও তদন্ত কমিটি এই সত্যগুলোও উদ্ঘাটন করতে পারেনি– আমরা এখন তাদের কাছে খুব বেশি কিছু কি আশা করতে পারি?
৪.
এইচএসসির লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে, এখন ব্যবহারিক পরীক্ষা চলছে বা শেষ হয়েছে। আমার মনে হয় এই দেশে ব্যবহারিক পরীক্ষার বিষয়টাও দেশের মানুষের জানা দরকার। আমি নিজেই লিখতে পারি কিন্তু সবচেয়ে ভালো হয় যারা এই পরীক্ষা দেয় তাদের নিজেদের মুখে শোনা। একজনের ই-মেইল এ রকম–
“প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় আমাদের কোনো পরীক্ষা করতে হয় না। ফিজিক্সে আমরা বই দেখে কলেজে করা পরীক্ষার মানগুলো বসিয়ে দিই। কেমিস্ট্রি ফার্স্ট পেপারে পিওন বলে দেয় মান কী রকম হবে, একটু এদিক সেদিক করে লিখে দিই। সেকেন্ড পেপারে লবন শনাক্তকরণ থাকে, পিয়ন বলে দেয় কোনটা কী লবণ। আর সব পরীক্ষার বর্ণনাই লিখি বই, খাতা বা ফোনে তোলা ছবি দেখে। এজন্যে প্রতি পরীক্ষায় একশ টাকা দিতে হয়। চার বিষয় গুণ দুই পত্র = ৮০০ টাকা। কী ব্যবসা দেখছেন? পিওন না শুধু, শিক্ষকরাও জড়িত।”
একজন ছাত্র বা ছাত্রী যখন জানে তাদের শিক্ষকরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তখন সেই শিক্ষার কি আসলে কোনো গুরুত্ব আছে? বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ব্যবহারিক পরীক্ষায় ২৫ নম্বর থাকে। ১০০ এর ভেতর এই ২৫ মার্ক সরাসরি টাকা দিয়ে কেনা যায়, সবাই এটি জানে। ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক, কেউ বাকি নেই, কিন্তু কেউ কিছু করে না। তারপরও আমরা শিক্ষা নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলি, আমার দুঃখটা সেখানে।
৫.
আমি যখন ঢাকা যাই, তখন আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্যে মীরপুর ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে যাই। মীরপুরে পৌঁছানোর পর আমি যে রাস্তাটি ব্যবহার করি সেই বিহারি এলাকার ভেতর দিয়ে যায়, আমি সেটি আগে জানতাম না, এখন জানি।
বেশ রাতে আমি একদিন যাচ্ছি, দেখি রাস্তায় অনেক মানুষের ভীড়। মানুষের ভীড় দেখেই বোঝা যায় ভীড়টির গতিপ্রকৃতি কী রকম, কখনও হয় নির্দোষ আনন্দোল্লাস, কখনও হয় ক্ষুব্ধ মানুষের জটলা। আমি বুঝতে পারলাম এই ভীড়টির ভেতরে এক ধরনের ক্ষোভ রয়েছে– ভীড় ঠেলে ক্ষুব্ধ মানুষের ভেতর দিয়ে আমি যখন গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছি, আমার ড্রাইভার জানাল, এই ভীড়ের মাঝে মানুষজনের সঙ্গে কা বলছেন স্থানীয় এমপি। এর মাঝে বিন্দুমাত্র অস্বাভাবিকতা নেই, একজন এমপি তার এলাকায়, তার মানুষের সঙ্গে কথা বলতেই পারেন, তাদের ভেতরে কোনো ক্ষোভের জন্ম নিলে তাকেই তো সেটা প্রশামিত করার জন্যে আসতে হবে।
ঠিক তার কয়েকদিন পর শবেবরাতের রাত পার হয়ে যে ভোর এসেছে, সেই ভোরে বিহারিদের এলাকায় দশজন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হল। এর মাঝে মহিলা আছে, শিশু আছে, কিশোর-কিশোরী আছে।
