সেই ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি শবে বরাতের রাতে পরের বছরের জন্যে ভাগ্য বেটে দেওয়া হয়। বিহারি পল্লীর মোহাম্মদ ইয়াসিন নামের মানুষটি জানত না তার পরিবারের জন্যে কী ভয়ংকর নির্মম একটি ভাগ্য কয়েক ঘণ্টা আগে শবেবরাতের রাতে তাদের কপালে লিখে দেওয়া হয়েছিল।
আমি কারও নাম মনে রাখতে পারি না, কিন্তু পুড়িয়ে মারা মানুষগুলোর মাঝে লালু, ভুলু নামে দুজন জমজ শিশুর নাম আছে, সেই নামগুলো আমার স্মৃতির মাঝে গেঁথে গেছে– আমি মনে হয় সেটা কখনও ভুলতে পারব না।
এই নির্মম পৈশাচিকতাটি কেমন করে ঘটেছে বোঝার চেষ্টা করেছি, বুঝতে পারিনি। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এই এলাকায় যে এক ধরনের উত্তেজনা ছিল আমি সেটা নিজের চোখে দেখেছি, কিন্তু খবরের কাগজ পড়ে আমি কিছু বুঝতে পারছি না। সেখানে দেখেছি, এই ভয়ংকর পৈশাচিক ঘটনার জন্যে ছয়জন বিহারিকেই ধরে নেওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে এখানে খুব বড় ধরনের একটি অন্যায়, খুব বড় একটা অবিচার হতে যাচ্ছে। সেটি থামানোর কোনো পথ নেই।
আমরা সবাই জানি, ১৯৭১ সালে এই বিহারি সম্প্রদায় বাঙালিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। এই পুরো এলাকার অসংখ্য বাঙালিদের হত্যা করা হয়েছিল। এমনকি স্বাধীনতার পরও ২০ জানুয়ারি এখানে জহির রায়হানসহ অনেকে খুন হয়েছেন, হারিয়ে গেছেন। এখনও সেই এলাকায় বধ্যভূমি খুঁজে পাওয়া যায়। বিহারিদের অনেকেই এখনও নিজেদের পাকিস্তানি মনে করে পাকিস্তানে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের এই বিহারিদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। গত চার দশক থেকে এই বিহারি সাম্প্রদায় এখানে ক্যাম্পে জীবন কাটিয়ে দিয়েছে।
চার দশক দীর্ঘ সময়। একাত্তরে যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদের সংখ্যা এখন খুব বেশি থাকার কথা নয়। এখন এখানে নূতন প্রজন্ম জন্ম নিয়েছে। তারা এই দেশের মাটিতে জন্মেছে, এই দেশে সম্মান নিয়ে তাদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমাদের সবার উপর দায়িত্ব এই মানুষগুলোকে আমাদের দেশে আমাদের সমাজে সম্পৃক্ত করে নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তাদেরকে গড়ে ওঠার অধিকার দেওয়া।
আমি নিশ্চিত, যারা নূতন প্রজন্ম তাদের নিশ্চয়ই পাকিস্তান যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই– পাকিস্তান নামক দেশটির এমন অবস্থা যে যারা পাকিস্তানের অধিবাসী তারাই এখন এই দেশ থেকে পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে! সরকার হোক, মানবাধিকার কর্মী হোক, সবাই মিলে ক্যাম্পে রিফিউজি হিসেবে কয়েক যুগ থেকে বাস করা মানুষগুলোর জীবনে একটুখানি স্বস্তি, একটুখানি স্বপ্ন, একটুখানি আশা ফিরিয়ে দেওয়া উচি। পূর্বপুরুষের অপরাধের জন্যে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে– সেটি তো কোনোভাবে আমরা মেনে নিতে পারি না।
স্বাধীনতার আগে বিহারিদের সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেকভাবে দেখা হত। তখন তারা বাংলা বলতে না। বাংলা না জেনেই তারা যেন এই দেশে জীবন কাটাতে পারে পাকিস্তান সরকার নানাভাবে সেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল। আমি এখন যখন বিহারি এলাকার ভেতর দিয়ে যাই, তখন দেখি তারা চমৎকার বাংলা বলতে পারে!
মিরপুরে তাদের এলাকার ভেতর দিয়ে দুই লেনের একটি রাস্তা গিয়েছে, দশ জন বিহারি শিশু-কিশোর-মহিলাকে পুড়িয়ে মারার পর একটি লেন সম্ভবত তারা প্রতিবাদ হিসেবে বন্ধ করে রেখেছে, সেখানে বাংলায় লেখা অনেক ব্যানার ঝুলছে। সেদিন যাবার সময় দেখলাম একটা লোকসভা হচ্ছে, বিহারি বক্তারা চমৎকার বাংলায় তাদের বক্তব্য দিচ্ছেন। তারা আসলে পুরোপুরি আমাদের মানুষ হয়ে গিয়েছেন।
তাহলে কেন তাদের ভিনদেশি মানুষ হিসেবে আমাদের এই দেশে কষ্ট দিয়ে যাব? স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্যে আমরা অনেক কষ্ট করেছি– আমরা সেই কষ্ট করেছি যেন পরের প্রজন্মকে কষ্ট করতে না হয়। কেন তাহলে আমরা নূতন প্রজন্মকে কষ্ট দিয়ে যাচ্ছি?
০২-০৭-১৪
গাড়ির চতুর্থ চাকা
মে মাসের ১০ তারিখে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে আমাকে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি তখন অনেক চিন্তাভাবনা করে একটা বক্তব্য দাঁড় করিয়েছিলাম। বক্তব্যটি যদিও একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা নির্দিষ্ট বয়সের তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছিল কিন্তু সেখানে আমি যে কথাগুলো বলেছিলাম, আমার খুব ইচ্ছে সেই কথাগুলো অন্যদেরও বলি। আমার মনে হয় এই লেখায় সে কাজটি করার জন্যে খুব বড় একটা সুযোগ। আমি সুযোগটি গ্রহণ করছি, পাঠকেরা নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা
আজকের দিনটি তোমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি– একই সঙ্গে এটি সবচেয়ে আনন্দেরও একটি দিন। আমার অনেক বড় সৌভাগ্য যে তোমাদের এই আনন্দের দিনটিতে আমি তোমাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে পারছি। আমাকে এই সুযোগটি দেওয়ার জন্যে তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই।
তোমরা যে রকম তোমাদের জীবনের প্রথম সমাবর্তনে এসেছ আমিও ঠিক সে রকম আমার জীবনের প্রথম সমাবর্তন বক্তা হিসেবে এসেছি। সমাবর্তন নিয়ে তোমাদের মনের ভেতর যে রকম আগ্রহ এবং উদ্দীপনা– তোমাদের সামনে কয়েকটি কথা বলার জন্যে আমার ভেতরেও ঠিক একই আগ্রহ এবং উদ্দীপনা।
