তবে ওয়ার্ল্ড কাপের সময় বাংলাদেশের চেহারা দেখে আমি সবসময়ই দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কোনো একটা বিচিত্র কারণে এই দেশের অনেক মানুষ মনে করে তারা যে দলটার সমর্থক সেই দলের দেশটির পতাকা টানাতে হবে। শুধু যে টানাতে হবে তা নয়, পতাকাটা হতে হবে অনেক বড়। পতাকা টানাতে গিয়ে ইলেকট্রিক শক খেয়ে তরুণেরা মারা গেছে, তার আপনজনের কেমন লেগেছে কল্পনাও করতে পারি না।
যশোরের ডিসি এই পতাকা দেখে বিরক্ত হয়ে বলেছেন, স্বাধীন দেশে বিদেশি পতাকা এভাবে টানানো যাবে না, পতাকা নামাতে হবে। তার জন্যে অভিনন্দন, সারা দেশে অন্তত একজন মানুষ আছেন যিনি জানেন পতাকা এক টুকরো কাপড় নয়, পতাকাটা দেশের প্রতীক!
পৃথিবীর সব দেশে জাতীয় পতাকার সম্মান রাখার জন্যে নিয়ম-কানুন আছে, ইচ্ছেমতো কেউ বিদেশি পতাকা তুলে ফেলতে পারে না। বিদেশি পতাকার সঙ্গে নিজের দেশের পতাকাটা আরও বড় হতে হয়। আগে একেবারেই ছিল না, তবে আজকাল দেখছি প্রায় অনেক জায়গাতেই বিদেশি পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকাটাও আছে, দেখে ভালো লাগে। যদি এ রকম হত, যে কয়টি বিদেশি পতাকা আছে ঠিক সেই কয়টা কিংবা তার থেকে বেশি আমাদের লাল সবুজ পতাকা উড়ছে, তাহলে সেই দৃশ্য দেখে আমাদের বুকটা ভরে যেত।
আমাদের যে প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বড় হয়েছে তারা জানে আমাদের লাল সবুজ পতাকার লাল রংটি আসলে মোটেও লাল রংয়ের একটা কাপড় নয়, সেটি আসলে আমাদের আপনজনের বুকের রক্ত দিয়ে রাঙানো। এর মাঝে এক বিন্দু অতিরঞ্জন সেই! সেই জন্যে জাতীয় পতাকাটা আমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ।
২.
যারা ভাবছেন ‘ওয়ার্ল্ড কাপ’ নামক যে বিষয়টি নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই আমি সেটা নিয়েই লিখতে বসেছি, আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করতে চাই। আমি আজকে আমার কিছু টুকরো টুকরো ভাবনার কথা লিখতে চাই। ভিন্ন ভিন্ন কিছু ভাবনা।
কিছুদিন আগে আমার সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ করে আমাকে তাদের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হবার জন্যে অনুরোধ করলেন। ‘প্রধান অতিথি’, ‘মাঝারী অতিথি’, ‘দায়সারা অতিথি’, এই বিষয়গুলো আমার জন্যে বোঝা কঠিন। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি এই বিভাজন নিয়েই প্রায় খুনোখুনি হবার অবস্থা ঘটতে দেখেছি! যাই হোক, এই প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণটি আমি খুব আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করলাম, কারণ তাদের অনুষ্ঠানে তারা প্রায় দুইশ বাচ্চাকে নিয়ে আসবেন– তাদের সবাই হচ্ছে গৃহকর্মী, সোজা বাংলায় ‘বাসার কাজের মেয়ে’। এ রকমটি আগে কখনও ঘটেনি।
ঢাকা শহরে ঠিক সময়ে কোথাও পৌঁছানো অসম্ভব একটি ব্যাপার। বেশি সতর্ক হয়ে অনেক আগে রওনা দিয়ে অনেক আগে পৌঁছে গেছি, না হয় ঠিক সময়ে রওনা দিয়ে দেরি করে পৌঁছেছি। তবে সেদিন ভাগ্যের জোরে আমি ঠিক সময়ে পৌঁছে গেলাম এবং পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাকে স্টেজে তুলে দেওয়া হল।
মঞ্চে বসে আমি অনুষ্ঠানের দর্শক-শ্রোতাদের দেখতে পেলাম এবং আমার বুকটা ব্যথায় টনটন করে উঠল। যারা আমার সামনে বসে আছে তাদের বয়স দশ-বারো বছর কিংবা আরও কম। এই বয়সের শিশুদের মুখে এক ধরনের সারল্য থাকে, এক ধরনের নির্দোষ কমনীয়তা থাকে, তাদের সবার মুখে সেটা আছে। আমার সামনে যারা বসে আছে তাদের সবাই নিজের বাবা, মা, ভাই, বোনকে ছেড়ে একা একা অন্য একটা পরিবারের বাসায় কাজ করে। যে বয়সে স্কুলে যাবার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করার কথা, মা বাবার আদরে বড় হবার কথা, তখন তারা কাপড় কাচে, বাসন ধোয়, রান্না করে, ফাই-ফরমাশ খাটে।
আয়োজকরা আমাকে জানালেন, এদের অনেকেই জানে না তারা কোথা থেকে এসেছে, তাদের দেশ কোথায়, বাবা-মা-পরিজন কোথায় থাকে। তরপরও তারা হচ্ছে এদেশের গৃহকর্মীদের বা কাজের মেয়েদের মাঝে সৌভাগ্যবানেরা। তারা যেসব পরিবারের সঙ্গে কাজ করে, তারা এই কাজের মেয়েদের এই সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে, সময় করে লেখাপড়া করতে দিয়েছে, এই সংগঠনের সঙ্গে খানিকটা বিনোদনের জন্যে ঘর থেকে বের হতে দিয়েছে। সে জন্যে আজকে আমি তাদের দেখার সুযোগ পেয়েছি। অন্যদের আমরা কখনও দেখব না, তাদের কথা শুনব না।
আয়োজকেরা জানালেন, এই বাচ্চাদের সবাইকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দেখিয়ে আনা হচ্ছে। আমাকে অনুরোধ করলেন তাদেরকে কিছু একটা বলতে– সম্ভব হলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। আমি শিক্ষক মানুষ, মাস্টারী করি, আমার কাজ কথা বলা, যে কোনো জায়গায় জানি আর না জানি কিছু একটা বলে ফেলতে পারি, কিন্তু আজকে এই মুহূর্তে আমি হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, আমার বলার কিছু নেই। এই বাচ্চাগুলো যদি কোনো স্কুলের বাচ্চা হত, আমি তাদের স্বপ্নের কথা বলতে পারতাম, ভবিষ্যতের কথা বলতে পারতাম, কিন্তু যে বাচ্চা বাসায় কাজ করে তার জীবন কাটায়, তাকে আমি কী মিথ্যা স্বপ্ন দেখাব?
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের মতো মানুষের সামনে নূতন একটি দিগন্ত উম্মোচিত হয়েছে, সুন্দর ভবিষ্যৎ হাতছানি দিয়েছে, কিন্তু এই ছোট শিশুদের জীবনে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কি কিছু আছে? আমি কি তাদের কোনো আশার কথা বলতে পারব? কোনো স্বপ্নের কথা বলতে পারব?
সারা জীবনে যেটি কখনও হয়নি, আজকে আমার সেটি ঘটে গেল। আমি তাদের বলার মতো কিছু খুঁজে পেলাম না। অবান্তর একটি-দুটি কথা বলে তাদের জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা কি পড়তে পার?”
