আমি খুব সৌভাগ্যবান কারণ আমি খুব উৎসাহী কিছু মানুষের আশেপাশে থাকি, অসংখ্য ভাবনা চিন্তা আমাদের মাথায় কাজ করে। বাংলাদেশের সব তরুণদের নিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাহায্য করা ঠিক এরকম একটা চিন্তা ভাবনা। যদি এরকম একটা উদ্যোগ নেয়া হয় তাহলে কী দেশের তরুণেরা এগিয়ে আসবে না?
নিশ্চয়ই আসবে!
কেউ কি আমাকে বলবেন?
পরশুদিন আমাকে একটা মেয়ে ফোন করেছে। সে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। মেয়েটি খুবই বিচলিত। কারণ সে জানতে পেরেছে- পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেছে। মেয়েটি বলল, আমরা এতো কষ্ট করে পড়াশোনা করি আর কিছু মানুষ বাজার থেকে প্রশ্ন কিনে এনে পরীক্ষা দেয়, পরীক্ষায় ভালো করে, ভালো জায়গায় সুযোগ পায়। তাহলে এটাই কী নিয়ম- এই দেশটা দুর্বৃত্তদের? আমরা কিছু না?
আমি মেয়েটাকে সান্ত্বনা দিলাম। বললাম- শিক্ষামন্ত্রী যেটা বলেছেন, সেটা নিশ্চয়ই সত্যি। আসলে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে ধোকা দিয়ে কিছু কিছু ছাত্রছাত্রীকে ঠকিয়ে কিছু মানুষ টাকা কামিয়ে নেয়। পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর সেই প্রশ্নটি দেখিয়ে হৈচৈ করে। মেয়েটি বলল, ‘আমার কাছে যে প্রশ্ন আছে আমি আপনাকে এখনই পাঠিয়ে দিই। দু’দিন পর পরীক্ষা হয়ে গেলে আপনি মিলিয়ে নেবেন।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে।’ মেয়েটি সাথে সাথে আমাকে হাতে লেখা কিছু প্রশ্ন পাঠিয়ে দিল।
আজকে পরীক্ষা ছিল। সকাল থেকে আমি মনে মনে দোয়া করছি- যেন প্রশ্নগুলো মিলে না যায়, আমি মেয়েটিকে বলতে পারব- দেখেছ, আাসলে প্রশ্ন ফাঁস হয় না!
দুপুরে মেয়েটি ফোন করে জানালো- ফাঁস হওয়া প্রশ্ন মিলে গেছে। আমাকে সে এক কপি প্রশ্ন পাঠিয়েছে।
আমি পরীক্ষার প্রশ্ন আর দু’দিন আগে পাওয়া হাতে লেখা প্রশ্ন একসাথে করে দিয়ে দিচ্ছি। কেউ বিশ্বাস না করলে নিজের চোখে মিলিয়ে নিতে পারবে। আমার ই-মেইলের তারিখ আর সময়টিও যুক্ত করে দিলাম। মেয়েটির ই-মেইল এড্রেস সরিয়ে দিলাম, যাতে সে যেন আবার উটকো ঝামেলায় না পড়ে।
মেয়েটি আমাকে বলেছে- স্যার, কিছু একটা করেন।
কেউ কি আমাকে বলতে পারবে, আমি কী করব? এই দেশের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে আমাদের দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, আমরা সেটা নিয়ে কতো স্বপ্ন দেখি। আমাদের ছেলেমেয়েরা এই স্বপ্নকে ধারণ করে, লেখাপড়া করে, তারপর দেখা যায়- এই দেশের সরকার একটা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা দিতে পারে না! আমি বিশ্বাস করতে রাজি না যে, আন্তরিকভাবে চাইলে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সমস্যা হওয়া সম্ভব। আমি যে মেয়েটার কথা বলছি, সে আমাকে ফোন করার আগে পাগলের মতো সব জায়গায় ফোন করে তার অভিজ্ঞতাটি জানাতে চেষ্টা করেছে- কেউ শুনতে রাজি হয়নি।
একটা সমস্যা না দেখার ভান করলেই কি সমস্যাটা মিটে যায়? সমস্যা মেটাতে চাইলে সেটাকে সবার আগে স্বীকার করতে হয়। দেশের সর্বোচ্চ মহল এই সমস্যাটা স্বীকার করতেই রাজি না। তাহলে সমস্যাটা সমাধান হবে কেমন করে?
এই দেশের ছেলেমেয়েদের আমরা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাতে চাই। ভয়ঙ্করভাবে ক্ষুব্ধ এই হতাশ ছেলেমেয়েগুলোকে আমরা কেমন করে স্বপ্ন দেখাবো?
কেউ কি আমাকে বলবেন?
কয়েক টুকরো ভাবনা
গত কিছুদিন থেকে আমাকে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্ন করা হচ্ছে সেটি হচ্ছে, “ওয়ার্ল্ড কাপে আপনি কোন দলকে সাপোর্ট করেন?” আমি তখন রীতিমতো সমস্যায় পড়ে যাই, সারা পৃথিবী যখন ওয়ার্ল্ড কাপের উত্তেজনায় ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে, খবরের কাগজের মূল অংশই হচ্ছে ওয়ার্ল্ড কাপের খুঁটিনাটি তখন আমি যদি বলি আমার ওয়ার্ল্ড কাপে পছন্দের দল নেই তখন সবাই আমার দিকে কেমন জানি অন্যরকম চোখে তাকায়! সবারই ধারণা হয় আমার নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে।
ওয়ার্ল্ড কাপ বিষয়টাই আমার জন্যে হৃদয়বিদারক। টেলিভিশনে ওয়ার্ল্ড কাপ দেখাচ্ছে, তখন আমাকেও দেখতে হয়। এমনিতে পছন্দের কোনো দল নেই কিন্তু খেলা দেখার সময় যে দলটা একটু দুর্বল তার জন্যে কেমন জানি মায়া হয় এবং নিজের অজান্তেই এক সময়ে তার পক্ষ নিয়ে নিই। অবধারিতভাবে আমার দুর্বল দলটি হেরে যায় এবং তখন আমার মন খারাপ হয়ে যায়। কাজেই ওয়ার্ল্ড কাপ খেলাটি থেকে আমি এখনও কোনো আনন্দ পাইনি, অনেক দুঃখ পেয়েছি।
ছেলেবেলায় আমি প্রচুর ফুটবল খেলেছি, কখনও খেলার মাঠে ফুটবলে লাথি দেওয়ার জন্যে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছি এবং তাতেই অনেক আনন্দ পেয়েছি। কিন্তু আজকালকার ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা দেখে আমি মাঝে মাঝেই খুব ভাবনায় পড়ে যাই। যে কোনো খেলার মূল কথা হচ্ছে, যে দলটি ভালো খেলবে সে জিতবে। ওয়ার্ল্ড কাপে আমরা দেখি দুই দলই ভালো, কেউ কাউকে গোল দিতে পারছে না, তখন লটারি করে ঠিক করা হচ্ছে কে বিজয়ী! (খেলা শেষে পেনান্টি কিক দিয়ে জয়-পরাজয় ঠিক করা আসলে লটারি ছাড়া আর কিছু নয়।) পেনান্টি কিক দেবার বেলায় অনেক সময়েই দেখি গোলকিপার উল্টো দিকে ঝাঁপ দিয়েছে– কোন দিকে ঝাঁপ দিবে সিদ্ধান্তটি নিতে হয় কিক দেওয়ার আগে। কাজেই পুরোটাই কপালের উপর, পুরোটাই লটারি।
যে খেলার জয় পরাজয় ভাগ্যের উপর নির্ভর করে, সেই খেলা কেমন করে সত্যিকারের খেলা হতে পারে সেটি আমি কখনও বুঝতে পারিনি। আমাকে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও আমি বুঝব বলে মনে হয় না।
