বাধ্য হয়ে সে গণিত পড়ছে, ফিজিক্স পড়ছে, কেমেস্ট্রি পড়ছে। বুঝতে খুব কষ্ট হয়, তাই সে সবকিছু মুখস্ত করে ফেলার চেষ্টা করে। মুখস্ত করতে কী কষ্ট! রাত্রিবেলা যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে তখন সে একা একা বই মুখস্ত করে। মনে মনে ভাবে, তাদের জীবনটা এত কষ্টের কেমন করে হল!
খাবার টেবিলে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “রনি, তোমার পরীক্ষার প্রিপারেশন কেমন হচ্ছে?”
রনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সত্যি কথাটাই বলল, “ভালো না আব্বু।”
বাবা ভুরু কুচকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন ভালো না?”
“আমার সায়েন্স বুঝতে কষ্ট হয়। তাই না বুঝে সবকিছু মুখস্ত করতে হয়।”
“লেখাপড়া করলে তো একটু আধটু মুখস্ত করতেই হয়।”
“একটু আধটু নয় আব্বু, পুরো বই মুখস্ত করতে হয়। আমার সায়েন্স নেওয়াটা ভুল হয়েছে– তোমরা জোর করে সায়েন্সে ঢুকিয়ে দিলে।”
মা রনির প্লেটে মুরগির একটা রান তুলে দিয়ে বললেন, “কোনো চিন্তা করিস না বাবা, দেখিস তোর পরীক্ষা খুব ভালো হবে। নির্ঘাত গোল্ডেন ফাইভ।”
রনি দুর্বলভাবে হাসল, বলল, “গোল্ডেন ফাইভ না আরও কিছু। শুধু কোনোভাবে টেনে টুনে পাশ করলেই আমি খুশি।”
৫.
প্রিয়াংকা পড়ার টেবিলে বসে তার বইটির দিকে তাকিয়েছিল কিন্তু এই মূহূর্তে সত্যিকার অর্থে সে কিছু দেখছিল না। পাশে তার মা হাতে কয়েকটা কাগজ নিয়ে দাড়িয়েছিলেন, প্রিয়াংকাকে বললেন, “মা। একবার দেখ।”
প্রিয়াংকা কঠিন গলায় বলল, ‘‘না। দেখব না।”
“দেখ মা। সবাই দেখছে, তুই কেন দেখবি না?”
“না মা। তুমি আমাকে দেখতে বল না। আমি ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দেখে পরীক্ষা দিব না।”
মা বললেন, “সবার পরীক্ষা ভালো হবে, গোল্ডেন ফাইভ পাবে, শুধু তুই পাবি না। তখন তুই মন খারাপ করবি।”
“করলে করব। কিন্তু আমি ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দেখব না। দেখব না দেখব না দেখব না। আমাকে তুমি অন্যায় কাজ করতে বল না।”
“এটা তো অন্যায় না মা। সবাই সেটা করে সেটা অন্যায় হবে কেমন করে? এটাই তো নিয়ম।”
“আমি এই নিয়ম মানি না।”
প্রিয়াংকা দুই হাত দিয়ে তার চোখ বন্ধ করে টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়ল। মা দেখলেন তার দুই হাতের ফাঁক দিয়ে চোখের পানি ফোটা ফোটা হয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
পৃথিবীর সব ছেলেমেয়ে এক রকম, কিন্তু তার মেয়েটি কেন অন্যরকম হয়ে জন্ম নিল? মা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নগুলো হাতে নিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন।
৬.
পরীক্ষার হলে সবুজ প্রথম এক দুইদিন প্রশ্নটা একটু পড়ার চেষ্টা করলেও শেষের দিকে সেটাও ছেড়ে দিল, প্রশ্ন পড়ে সে আগা-মাথা কিছুই বুঝে না, তাহলে শুধু শুধু পড়ে কী লাভ? শুধু মাকে খুশি করার জন্যে সে পরীক্ষা দিতে এসেছে। তাই পরীক্ষার খাতায় সে যা মনে আসে তাই লিখে এল। কোনো মাথা-মুণ্ডু নেই সেই রকম অবান্তর কথা। পরীক্ষার প্রশ্নে যে শব্দগুলো আছে সেই সব শব্দ দিয়ে তৈরি একটা দুইটা বাক্য, কখনও আস্ত প্যারাগ্রাফ। যে পরীক্ষার খাতা দেখবে তার কাছে যেন মনে হয় আসলেই বুঝি পরীক্ষার উত্তর লিখছে। এক ধরনের তামাশা বলা যায়।
রনির পরীক্ষা যত খারাপ হবে বলে ভেবেছিল তত খারাপ হল না। প্রশ্নগুলো ফাঁস হয়েছিল বলে রক্ষা কিন্তু তবুও খুব লাভ হয়নি, ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর সে প্রাণপণে মুখস্ত করে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এত কিছু তার মনে থাকে না। তবুও সে লিখে এসেছে, হিসেব করে দেখেছে টেনেটুনে জিপিএ ফোর হয়ে যাবে। তার জন্যে জিপিএ ফোর অনেক।
প্রিয়াংকার জন্যে পরীক্ষাগুলো ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। সে ভালো স্কুলে পড়ে তার ক্লাশের সবাই ভালো ছাত্রী। সবাই ফাঁস হয়ে আসা প্রশ্নগুলো দেখে এসেছে। প্রশ্নটা হাতে পেয়েই সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠেছে, শুধু সে নিঃশ্বব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। সবাই যখন টানা মুখস্ত লিখে যাচ্ছে, সে তখন চিন্তা করে করে লিখেছে। মনটা ভালো নেই, ভোরে উৎসাহ নেই, তা না হলে পরীক্ষা আরও ভালো হত। পরীক্ষার উত্তর দিতে দিতে মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে আসে। নিজেকে বুঝিয়ে শান্ত করে সে দাঁতে দাঁত চেপে পরীক্ষা দিচ্ছে।
প্রশ্নটা হাতে নিয়ে তার চোখে পানি এসে যায়, এত বড় একটা অন্যায় কিন্তু দেশে কোনো প্রতিবাদ নেই। মন্ত্রী বলছেন, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়নি, এগুলো সাজেশন। সাজেশন? প্রিয়াংকার ইচ্ছা করে টেবিলে মাথা কুটে রক্ত বের করে ফেলে। খোদা তাকে কেন এমন একটা দেশে জন্ম দিল? কেন?
৭.
পরীক্ষার ফল বের হয়েছে. সবার ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা। শুধু সবুজের পরীক্ষা নিয়ে কেনো দুর্ভাবনা নেই, তার নিজের ফলাফল জানারও কোনো আগ্রহ নেই। সৌদি আরবে বাবাকে কিছু একটা জানাতে হবে, পরীক্ষার আগে ডেঙ্গু হয়ে গিয়েছিল, তাই ভালো করে পরীক্ষা দিতে পারেনি, এ রকম একটা গল্প বলা যাবে।
দুপুরের দিকে সবুজের একজন বন্ধু তাকে ফোন করে জানাল সবুজ নিশ্চয়ই পরীক্ষায় পাশ করেছে, কারণ তার কলেজে শত ভাগ পাশ! তার এই বন্ধু একটু ঠাট্টা তামাশা বেশি করে, তাই ইয়ার্কি করছে ভেবে সবুজ ফোন রেখে দিলেও তার ভেতরটা খচ খচ করতে লাগল। সে সাহস করে মোবাইলে খোঁজ নিয়ে দেখে সে সত্যিই পাশ করে ফেলেছে, জিপিএ খুবই খারাপ কিছু পাশ!
সবুজ একটা গগনবিদারী চিৎকার দিল এবং সেই চিৎকার শুনে মা ভয় পেয়ে ছুটে এলেন। সবুজ মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘‘আম্মু আমি পাশ করেছি।’
