মোবারক সাহেবের কর্মীরা বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ, তারা পুরো ব্যাপারটা বুঝে গেলেন, তারপর কাজশুরু করে দিলেন। পরীক্ষার সাথে যুক্ত সবাইকে নিয়ে মিটিংয়ের পর মিটিং করতে লাগলেন, ডিসিদের সাথে কথা বললেন, স্কুলের হেড মাস্টারদের ডেকে পাঠালেন, পরীক্ষাকদের ডেকে পাঠালেন।
মোটামুটি কোনো ঝামেলা ছাড়াই সবাইকে সরকারের ইচ্ছার কথা জানিয়ে দেওয়া হল। ছাত্রছাত্রীরা যেহেতু পাশ করার জন্যে লেখাপড়া করতে এসেছে তাই তাদের পাশ করার ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে। শুধু একটা মিটিংয়ে খিটখিটে বুড়ো মতো একজন মানুষ ঝামেলা শুরু করল, তেড়িয়া হয়ে বলল, “আমি ঠিক বুঝবার পারলাম না। পোলাপান পরীক্ষার খাতায় কিছু না লিখলেও তাগো পাশ করাইতে হবে?”
যিনি মিটিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, “কিছু না লিখা মানে কী? পরীক্ষার খাতায় সবাই কিছু না কিছু লিখে।”
“উল্টাপাল্টা ছাতা মাতা যাই লিখে তাতেই নম্বর?”
“এখন সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা। সৃজনশীল মানে বুঝেন তো? নিজের মতো করে লেখা– একটু ভুলত্রুটি তো হতেই পারে, দোষ তো ছেলেমেয়েদের না। দোষ সিস্টেমের, ছেলেমেয়েদের ভিকটিমাইজ করে লাভ কী? তাই বলছি উদারভাবে মার্ক দিবেন। বুঝেছেন?”
খিটখিটে বুড়ো বলল, “না, বুঝি নাই। পাশ মার্ক না পাইলে আমি পাশ করাবার পারুম না।”
মিটিংয়ের দায়িত্বে যিনি ছিলেন তিনি এবার রেগে উঠলেন, বললেন, “আপনি কি চান আপনাকে পরীক্ষকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেই? সরকারের এককটা শুভ উদ্যোগকে এ রকম নেগেটিভভাবে দেখছেন কেন?”
খিটখিটে বুড়ো টেবিলে থেকে তার ব্যাগটা নিয়ে হাঁটা শুরু করল। মিটিংয়ের পরিচালক আরও রেগে উঠলেন, বললেন, “কী হল? আপনি কই যান?”
“আমি মাস্টার মানুষ। নিজের হাতে ছেলেমেয়েদের সর্বনাশশ করবার পারুম না। আপনার করেন। আল্লাহ যেন আপনাদের মাপ কইরে দেয়।”
খিটখিটে বুড়োটা চলে যাবার পর মিটিংয়ের পরিচালক মেঘ স্বরে বললেন, “কে? কে এই বেয়াদপ মানুষটা? কত বড় বেয়াদব।”
একজন বলল, “মডেল স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক।”
“কী রকম শিক্ষক?”
“খুব ভালো। তবে ঘাড় ত্যাড়া, প্রাইভেট পড়ালে লাখ টাকা কামাতে পারে, পড়ায় না। তাই নিয়ে বউয়ের সাথে রাত দিন ঝগড়া। সংসারে অশান্তি…”
“কত বড় সাহস। আমাকে জ্ঞান দেয়। নিশ্চয়ই রাজাকার।”
“জে না। মুক্তিযোদ্ধা ছিল।”
“এই রকম মুক্তিযোদ্ধা আমার অনেক দেখা আছে।”
মিটিংয়ের পরিচালক গজ গজ করতে লাগলেন।
তবে ‘ঘাড় ত্যাড়া’ শিক্ষক খুব বেশী পাওয়া গেল না, বিষয়টা নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকলেও প্রায় সবাই এই নূতন পদ্ধতি মিনে নিলেন, ছাত্রছাত্রীদের যেভাবে সম্ভব পাশ করাতে হবে।
৩.
সবুজ মুখে সিগারেটটা চেপে রেখে তার চুলে জেল দিচ্ছিল, তখন তার মা ঘরে এসে ঢুকলেন, মাকে দেখে সবুজ তাড়াতাড়ি তার সিগারেটটা হাত দিয়ে ধরে পিছনে লুকিয়ে ফেলল। মা দেখেও না দেখার ভান করলেন, বললেন, “বাবা, তোর পরীক্ষা তো এসে গেল। একটু বই নিয়ে বসবি না?”
সবুজ উদাস মুখে বলল, “নাহ্ আম্মু। ঠিক করেছি এই বছর পরীক্ষা দিব না।”
“কেন? পরীক্ষা দিবি না কেন?
সবুজ বিরক্ত হয়ে বলল, “পরীক্ষা দিতে হলে লেখাপড়া করতে হয়। আমি কোনো লেখাপড়া করি নাই। ইন্টারের সিলেবাস কত বড় তুমি জান?”
মা ভয় পাওয়া গলায় বলল, “তোর বাবা শুনলে খুব রাগ করবে।”
সবুজ আরও বিরক্ত হয়ে বলল, “বাবার শোনার দরকার কী? থাকে সউদি আরবে, মাসে মাসে টাকা পাঠিয়ে তার দায়িত্ব শেষ। আমি পরীক্ষা দিলাম কি না দিলাম তাতে বাবার কী আসে যায়?”
মা আরেকটু কাছে এসে ছেলের গায়ে হাত দিয়ে বললেন, “প্লিজ বাবা, প্লিজ! পরীক্ষাটা দে।”
সবুজ মায়ের হাত সরিয়ে বলল, ‘‘আহ্ মা! তুমি বড় বিরক্ত কর। যাও দেখি।”
মা কাতর গলায় বললেন, ‘‘বাবা, আমি তো বলি নাই তোর পরীক্ষা দিয়ে গোল্ডেন ফাইভ পেতে হবে। শুধু বলেছি পরীক্ষাটা দে।”
“পরীক্ষা দিলে ফেল করব।”
“তবু পরীক্ষাটা দে।”
“আমার কোনো বইপত্র পর্যন্ত নাই। কোনো কোচিং করি না।”
“তোকে সব বই কিনে দেব।”
“কিন্তু খাতায় আমি কী লিখব? আউল ফাউল জিনিস?”
“যা ইচ্ছে তাই লিখবি বাবা। তবু পরীক্ষাটা দে। তোর বাবাকে বলতে পারব তুই পরীক্ষা দিয়েছিস। রেজাল্ট খারাপ হলে কিছু একটা বলা যাবে।”
শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে সবুজ পরীক্ষা দিতে রাজি হল। তবে এক শর্তে সে কোনো লেখাপড়া করতে পারবে না।
৪.
রনি রাত নয়টার সময় বাসায় ফিরে এল, তখন তার দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নাই। প্রথমে কোচিং, তারপর গণিত স্যারের কাছে প্রাইভেট, তারপর ফিজিক্স স্যারের কাছে ব্যাচে পড়া। বাসায় ফিরে আসতে প্রত্যেকদিনই দেরি হয়। স্যারেরা সাজেশন দিয়েছে আজকে রাত জেগে মুখস্ত করতে হবে, চিন্তা করেই রনির মনটা খারাপ হয়ে গেল।
মা রনির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আয় বাপ, হাত মুখ ধুয়ে খেতে আর। মুখটা শুকিয়ে দেখি এতটুকু হয়ে গেছে।”
রনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার ইচ্ছা ছিল বাংলা কিংবা ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ার। সেটা যদি না হয় তাহলে সাংবাদিকতা পড়া, ঘাড়ে ক্যামেরা নিয়ে সাংবাদিক হয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ছুটে বেড়াচ্ছে সব সময়েই সে এ রকম একটা স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু রনির বাবা-মা তার স্বপ্নকে কোনো দাম দেননি, জোর করে তাকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়িয়েছেন, তাকে জোর করে ডাক্তার না হয় ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন।
