মায়ের মুখ একশ ওয়াট বাল্বের মতো জ্বলে উঠল, ছেলে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘আমি জানতাম তুই পাশ করবি! তোর মতো ছেলে কয়টা আছে, একেবারে না পড়ে পরীক্ষা দিয়ে তুই পাশ করে ফেলেছিস, একটু যদি পড়তি তাহলে কী হত চিন্তা করতে পারিস?”
সবুজ আসলেই চিন্তা করতে পারে না, সে কেমন করে পাশ করেছে সেটাও বুঝতে পারে না। নিশ্চয়ই পরীক্ষার খাতায় সে যেগুলো লিখেছিল সেগুলো খুবই সৃজনশীল লেখা ছিল, সে জন্যেই তাকে পাশ করিয়ে দিয়েছে।
মা ছেলের হাতে সৌদি আরবে থাকা বাবার পাঠানো টাকা থেকে এক হাজার টাকা বের করে দিয়ে বললেন, “যা বাবা, মিষ্টি কিনে আন।”
সবুজ মিষ্টি কিনতে গিয়ে দেখে সব মিষ্টি বিক্রি হয়ে গেছে, শেষ পর্যন্ত কিছু নিমকি কিনে আনল। পাশ করলে শুধু মিষ্টি খেতে হবে কে বলেছে? মাঝে মাঝে নোনতা জিনিসও খাওয়া যায়।
৮
রনি গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছে। আব্বু আম্মু খুব খুশি কিন্তু রনি নিজে হিসাব মিলাতে পারছে না, সে অনেকবার হিসাব করে দেখেছে, সেখানে কিছুতেই জিপিএ ফাইভ হওয়ার কথা না। কিন্তু হয়ে গেছে– সে নিজের চোখে দেখেছে।
বাবা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “দেখেছিস? আমি বলেছিলাম না তুই পারবি! এই দেখ তুই পেরেছিস।”
আম্মু বললেন, “মানত করেছিলাম পাগলা বাবার মাজারে এক হাজার টাকা দিব। এক্ষুনি টাকাটা পাঠাতে হবে।”
শুধু ছোট বোনটা ঠোট উল্টে বলল, ‘‘গোল্ডেন ফাইভ এমন কী ব্যাপার, সবাই পায়!”
আম্মু ঠমক দিয়ে বললেন, “চুপ কর পাজি মেয়ে। তুই এমন হিংসুটে হলি কেমন করে?”
রাতে ঘুমানোর সময় রনির মনে হতে লাগল আসলে এতদিন সে নিজের ক্ষমতাকে ছোট করে দেখেছে। সে আসলে অসম্ভব প্রতিভাবান। বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবীদের একজন– এখন ইচ্ছা করলে সে বাংলাদেশের যে কোনো ইউনিভার্সিটিতে ভতি হতে পারবে। সে ইচ্ছা করলে ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবে, না হলে ডাক্তার হতে পারবে। বিশাল একটা ইঞ্জিনিয়ার না হয় বড় একজন ডাক্তার হয়ে সে তার মতো আরেকজন মেধাবী মেয়েকে বিয়ে করবে! ফুটফুটে চোহারার সুন্দরী একটা মেয়ে।
রনি বিছানায় এপাশ ও পাশ করে, আনন্দে চোখে খুম আসতে চায় না।
৯
প্রিয়াংকার গোল্ডেন ফাইভ হয়নি। ফিজিক্সে একটুর জন্যে ছুটে গেছে। তার ক্লাশের সব মেয়ের গোল্ডেন ফাইভ হয়েছে। হাবাগোবা যে মেয়েটা কিছু পারে না যে সব সময় প্রিয়াংকার কাছে পড়া বুঝতে আসত সেও গোল্ডেন পেয়েছে। শুধু সে পায়নি। ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন না দেখলে এ রকম তো হতেই পারে। প্রশ্ন তো যথেষ্ট কঠিন হয়েছিল। এই প্রশ্নে জিপিএ ফাইভ তোলা তো সোজা কথা নয়।
প্রিয়াংকা স্কুলের সিঁড়িতে গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে আছে। অন্যরা সবাই চেঁচামেচি করছে। হঠাৎ করে দরজা খুলে টেলিভিশন ক্যামেরা হাতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এসে ঢুকল। একজন ক্যামেরা তাদের দিকে তাক করে বলল, “তোমরা কী খুশি?”
সবাই চিৎকার করে বলল, “হ্যাঁ খুশি।”
“তাহলে আনন্দ করছ না কেন?”
সবগুলো মেয়ে তখন আনন্দে চিৎকার করতে লাগল, একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরতে লাগল, লাফাতে লাগল নাচতে লাগল।
শুধু প্রিয়াংকা একা চুপচাপ সিঁড়িতে বসে রইল।
১০
সবুজ একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। এই নিয়ে পত্র পত্রিকায় মাঝে মাঝেই লেখালেখি হয়ে, কাউকে লেখাপড়া করতে হয় না, ক্লাশে যেতে হয় না, প্রতি সেমিস্টারে গ্রেড চলে আসে। কয়েক বছর নিয়মিত টাকা দিয়ে গেলেই সার্টিফিকেট। সবুজ একটা বিবিএর সার্টিফিকেট নিয়ে নেবে।
রনি যতগুলো সম্ভব সবগুলো পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে, কোথাও টিকতে পারেনি। সত্যি কথা বলতে কী, কোথাও পাশ করতে পারেনি। প্রথম দিকে বাবা মা উৎসাহ আর সাহস দিয়েছেন, শেষের দিকে তারা প্রথমে হতাশ, তারপর বিরক্ত এবং শেষে কেমন যেন ক্ষেপে উঠলেন।
একদিন খাবার টেবিলে বাবা বলেই বসলেন, “তুই কী রকম ছাত্র? ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়া তো দুরের কথা– কোথাও পাশ পর্যন্ত করতে পারিস না?”
রনি দুর্বল গলায় বলল, “আমি তো চেষ্টা করছি!”
“এই চেষ্টার নমুনা…’’ বাবা হুংকার দিলেন, “এই গোল্ডেন ফাইভ? এর জন্যে আমি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তোদের জন্যে পরিশ্রম করি? সামান্য একটা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাস না?”
রনি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘‘আমি কী করব?”
“দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে– দূর হয়ে যা।”
রনি খাবার টেবিল থেকে উঠে গেল। রাত্রিবেলা বাথরুমে রাখা এক বোতল হারপিক খেয়ে ফেলল। মাঝরাতে হাসপাতালে দৌঁড়াদৌড়ি। জানে বেঁচে গেল কিন্তু ভেতরটা ঝলসে গিয়ে খুব খারাপ অবস্থা।
প্রিয়াংকা খুব শক্ত মেয়ে ছিল, কিন্তু একসময় সেও ভেঙ্গে পড়ল। একদিন হাউ মাউ করে কেদেঁ তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মা আমাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দাও, এই দেশে আমি আর থাকতে পারছি না।”
মা অবাক হয়ে বললেন, “সে কী, তুই না তোর দেশকে এত ভালোবাসিস। সব সময় বলেছিস দেশের জন্যে কিছু একটা করবি?”
“হ্যাঁ মা বলেছিলাম।”
“তোর না দেশ নিয়ে এত স্বপ্ন ছিল?”
“ছিল মা। এখন আর কোনো স্বপ্ন নাই।’’
মা অবাক হয়ে তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন– এই মেয়েটির চোখে এখন আর কোনো স্বপ্ন নেই?
১১.
গল্পটা এখানে শেষ। এটা কাল্পনিক গল্প, নামগুলো বানানো কিন্তু ঘটনাগুলো সত্যি। প্রিয়াংকার ই-মেইলটা আমার কাছে আছে। যাদের দায়িত্বে এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তারা কি জানেন এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এখন কী ভয়ংকর অবস্থা? শতভাগ পাশ করিয়ে দেওয়ার এই মহাপরিকল্পনায় সবচেয়ে এগিয়ে মাদ্রাসা– তারা ৯৫% পাশ করিয়েছে।
