সূত্র: http://www.sadasidhekotha.com/article.php?date=2012-04-15
একটি দুঃখের গল্প
মোবারক সাহেব একটা শিক্ষাবোর্ডের দায়িত্বে আছেন, অনেকদিন পর আজকে তার ভিতরে এক ধরনের আত্মতৃপ্তির বোধ কাজ করছে। তিনি সময়মতো তার বোর্ডের ফলাফল প্রকাশ করতে পেরেছেন। বাংলাদেশের মতো দেশে এটি খুব সহজ কাজ নয়, বাইরের মানুষ কখনও জানতে পারবে না সবকিছু ঠিকঠিকভাবে শেষ করতে সবাই মিলে কত পরিশ্রম করতে হয়।
তার বোর্ডে পাশের হার অন্য বোর্ড থেকে কম। তাতে অবশ্যি অবাক হবার কিছু নেই, ফলাফল প্রকাশ করার আগেই তিনি সেটা জানতেন। এখানে অনেক গরীব মানুষ, বাবা-মা লেখাপড়া জানে না, লেখাপড়ার গুরুত্ব বুঝে না। মাঝখানে বন্যায় বই পত্র সহ সবকিছু ভেসে গেল। হরতালে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। ইংরেজি প্রশ্নটাও মনে হয় একটু বেশি কঠিন হয়েছিল।
সবকিছু মিলিয়ে পাশের হার একটু কম হতেই পারে। আস্তে আস্তে পাশের হার বাড়বে, দেশ এগিয়ে যাবে। দেশের এত বড় একটা কাজে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছেন তাতেই মোবারক সাহেব খুশি।
কয়েকদিন পর মোবারক সাহেবকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ডেকে পাঠানো হল, কী জন্যে ডাকা হয়েছে সেটা অনুমান করতে পারলেন না। খারাপ কিছু হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারপরেও তার ভেতরটা কেন জানি খচখচ করতে লাগল। সারারাত জার্নি করে সকালে ঢাকা পৌচেছেন। ঢাকায় ছোট শালির বাসায় উঠেছেন সবাই। তারা খুব যত্ন করল, তবুও তার ভেতরে কেমন যেন অশান্তি খচখচ করতে লাগল।
মন্ত্রণালয়ে আগে সবাই তাকে খুব সমাদর করত, এবারে কেমন যেন সবাই দূরে দূরে থাকল। তাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। শেষে একজন তাকে ডেকে পাঠাল, বয়স মোবারক সাহেব থেকে অনেক কম কিন্তু এই সরকার আসার পর প্রমোশনের পর প্রমোশন পেয়ে ধাই ধাই করে উপরে উঠে গেছেন। মোবারক সাহেব বসার আগেই মানুষটি খেঁকিয়ে উঠল, “আপনি এইটা কী করেছেন?”
মোবারক সাহেব অবাক হয়ে বললেন, “কী করেছি?”
“আপনার বোর্ডে সব ছাত্রদেরকে ফেল করিতে রেখেছেন, ব্যাপারটা কী? ছাত্রছাত্রীরা কি ফেল করার জন্যে লেখাপড়া করতে আসে? পেয়েছেন কী আপনি?”
মোবারক সাহেব এত অবাক হলেন যে অপমানিত বোধ করার সময় পেলেন না। সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন, একটা ছাত্রকে কখন পাশ করে কখন ফেল করে সেটা তার থেকে ভালো করে কেউ জানে না। একজন ছাত্রকে শিক্ষক কখনও পাশ করান না, কখনও ফেলও করান না। ছাত্র নিজে পাশ করে না হয় ফেল করে।
মোবারক সাহেব সামনে বসে থাকা কমবয়সী উদ্ধত বড় কর্তা রীতিমতো হুংকার দিয়ে বলল, “আপনার কত বড় সাহস, আপনি এই সরকারকে অপদস্ত করার চেষ্টা করছেন? আপনি দেখানোর চেষ্টা করছেন এই সরকারের আমলে লেখাপড়া হয় না। অন্য সব বোর্ডে পাশের হার বেড়ে যাচ্ছে, আর আপনি আপনার বোর্ডে সবাইকে ফেল করিয়ে দিচ্ছেন? আপনি জানেন না এই সরকার শত ভাগ পাশ করানোর টার্গেট নিয়েছে? আপনার মতো মানুষের কারণে আমাদের মুখে চুনকালি পড়ছে? নিশ্চয়ই আপনি রাজাকারদের দলে।”
মোবারক সাহেব থ হয়ে বসে রইলেন, একটা কথাও বলতে পারলেন না। মাথা নিচু করে অফিস থেকে বের হয়ে এলেন।
বাসায় ফিরে আসার পর মোবারক সাহেবের স্ত্রী তাঁর মুখ দেখেই বুঝতে পারলেন কিছু একটা হয়েছে। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে? তোমার এ কী চেহারা হয়েছে?”
মোবারক সাহেব বললেন, “আমি চাকরি ছেড়ে দেব।”
মোবারক সাহেবের স্ত্রী চমকে উঠে বললেন, “কেন?”
“আমাকে বলেছে সবাইকে পাশ করাতে হবে। বলেছে কেউ ফেল করার জন্যে পরীক্ষা দেয় না, পাশ করার জন্যে পরীক্ষা দেয়। পাশ না করলে দোষ আমার।”
মোবারক সাহেবের স্ত্রী বুঝতে না পেরে বললেন, “কিন্তু এই লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েকে তুমি কেমন করে ঠিক করে লেখাপড়া করাবে?’’
মোবারক সাহেব মাথা নাড়লেন, বললেন, “না, না, লেখাপড়া করে পাশ করানোর কথা বলেনি।”
“তাহলে?”
“বলেছে খাতায় একটু আঁকিবুকি করলেই মার্ক দিতে হবে। পাশ করাতে হবে। যত বেশি পাশ সরকারের তত বেশি ক্রেডিট। তত বেশি সোনার বাংলা।”
মোবারক সাহেবের স্ত্রী তবুও বুঝতে পারলেন না। বললেন “কিন্তু….”
“এর মাঝে কোনো কিন্তু নাই। একজন মাস্টার হয়ে আমি এটা করতে পারব না। হাঁটুর বয়সী ছেলে বড় অফিসার হয়ে আমাকে ধমকাধমকি করে– আমার পক্ষে এই অপমান সহ্য করা সম্ভব নয়।”
মোবারক সাহেবের স্ত্রী তার স্বামীকে ভালো করে চিনেন, একবার মাথায় ঢুকে গেলে আসলেই চাকরি ছেড়ে ছুঁড়ে দিতে পারে। স্বামীর গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, “প্লিজ তুমি মাথা গরম কর না। চাকরি ছেড়ে দিলে আমরা খাব কী? থাকব কোথায়, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার কী হবে? তুমি যেহেতু চাকরি করছ উপরের নির্দেশ তো মানতে হবে।”
মোবারক সাহেব বিড় বিড় করে বললেন, “উপরের নির্দেশ লিখিত দেওয়ার সাহস নাই। শুধু মুখে বলে। আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি চাকরি ছেড়ে দেব।”
২.
মোবারক সাহেব অবশ্যি শেষ পর্যন্ত চাকরি ছাড়লেন না, ছাড়া সম্ভব না। তাই তাদের সব সহকর্মীদের ডেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের কথা জানালেন, বললেন, ছেলেমেয়েরা ফেল করার জন্যে লেখাপড়া করে না, পাশ করার জন্যে লেখাপড়া করে। ছেলেমেয়েরা যেহেতু পাশ করার জন্যে লেখাপড়া করে, তাই কেউ যদি নিচে থেকে পাশ করতে না পারে তাহলে তাকে পাশ করিয়ে দিতে হবে। এটা সরকারের দায়িত্ব। তারা সরকারি কর্মচারি, তাদের দায়িত্ব সরকারের ইচ্ছা পূরণ করা।
