আমি আজ সারারাত তন্ত্রমতে দেবীর আরাধনা করব, তাঁকে প্রসন্ন করে সেই প্রাচীন অভিশাপটিকে প্রশমিত করব। যতক্ষণ পূজা চলবে, কারও বাইরে থাকার দরকার নেই। পূজা শেষ হলে, যত রাতই হোক আমি একে নিয়ে চলে যাব, আমার গুরুর আদেশ আছে। আমার ব্যাপারে চিন্তা করবেন না, জগন্মাতার আদেশ হলে আমাদের আবার দেখা হবে।
কিন্তু ইনি তো বৌদ্ধ দেবী বললেন। আপনি হিন্দু ব্রাহ্মণ, আপনি কী করে? তথাগতর কথাটা মাঝপথেই থেমে যায়।
শান্তস্বরে বললেন মৈত্রমশাই, আপনি বোধহয় কাহিনির পুরোটা শোনেননি, তাই না? শেষ দিকটা মনে আছে? অবশেষে দেবী বজ্রবারাহী নিজে আবির্ভূত হয়ে ডাকিনীদের। নিরস্ত করেন এবং নিজের হাতে নিজের মুণ্ডচ্ছেদ করে নাচ শুরু করেন। তার সেই কাটা গর্দান থেকে রক্তধারা উপচে পড়ে দুই ডাকিনীর মুখে, ববৈরোণি এবং বজ্রবর্ণিনী। বজ্রবারাহীর এই রূপের নাম হল ছিন্নমুন্ডা। বুঝলেন কিছু?।
তথাগতর ঠোঁটদুটো নড়তে গিয়েও থেমে যায়।
গাঢ়স্বরে মৈত্রমশাই বলেন, দেবী বজ্রবারাহীর ছিন্নমুন্ডা রূপের সঙ্গে মিলিয়ে কোনও হিন্দু দেবীর কথা মনে পড়ে প্রফেসারসাহেব?
তথাগত নয়, ফিসফিস করে উত্তর দেন ঊর্মিমালা, দেবী ছিন্নমস্তা!
হ্যাঁ বউদি, ধীর ও শান্ত স্বরে বলেন মৈত্রমশাই, বৌদ্ধদের দেবী বজ্রবারাহীই আসলে হিন্দুধর্মের দেবী ছিন্নমস্তা।
নৈঃশব্দের মধ্যে অতসী এসে তামার থালায় করে পূজার যাবতীয় সামগ্রী নিয়ে এল। সেইসব বাড়ির পেছনে বাগানে নিয়ে যেতে বললেন মৈত্রমশাই। সেখানে খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে রাখা আছে আগে থেকেই। সেদিকে যাবার জন্যে। সবে পা বাড়িয়েছেন, এমন সময়ে ঊর্মিমালা বললেন, ভালো করে পুজো করবেন। ঠাকুরমশাই, আপনার যেন কোনো অমঙ্গল না হয়।
যেতে যেতে কথাটা শুনে থেমে গেলেন প্রৌঢ় ব্রাক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়ালেন। ঊর্মিমালার চোখে চোখ রেখে শান্তস্বরে বললেন, যদি বলতেন যেন আপনাদের কারও কোনও অমঙ্গল না হয় সেটা দেখতে, তো বুঝতাম। হঠাৎ আমার অমঙ্গল নিয়ে আপনি চিন্তিত হলেন কেন? আমাকে তো কেউ ডেকে আনেনি বউদি, আমি তো নিজেই এসেছি। বিপদ তো আপনাদের, আপনি আমার জন্যে উতলা হলেন কেন? পুরোহিতের দায়িত্ব যজমানের ভালোমন্দ ভাবার কথা, উলটো হওয়ার তো কথা। নয়। এখানে যজমান পুরোহিতের কথা ভাবছে কেন!
বিপদ বুঝে নিজে এগিয়ে এসেছেন, আপনি আমাদের কেউ নন তা জানি। তা অন্যের বিপদের কথা শুনে আজকের দিনে কজনই বা সাহায্য করতে আসে বলুন? আর আপনারও তো ঘর আছে, সংসার আছে। আর আমাদের সাহায্য করতে হলে আপনার খারাপ কিছু হলে তাদের কী হবে?
খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন মৈত্রমশাই, তারপর মৃদু হেসে বললেন, এইখানেই, এই মুহূর্তেই আপনি জিতে গেলেন বউদি। যার মনে সবার জন্য এত দয়া, এত করুণা, কোন অভিশাপ তার কী করবে? চিন্তা করবেন না বউদি। আমি, নবদ্বীপের। মহেশ্বর মৈত্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, কথা দিচ্ছি এ অভিশাপ আপনাদের ছতে পারবে না। উদ্বেগে ফেলবে, কিন্তু কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। আর এই সর্বভূতে দয়ার ভাবটিকে বাঁচিয়ে রাখবেন বউদি, মনে রাখবেন ভালোবাসাই হল সবচেয়ে বড় তন্ত্র, সবচেয়ে বড় যাদু।
*********
এক গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছিল তিতলি। যেন এক মহাশূন্যে সে ভেসে বেড়াচ্ছে, কোনও অবলম্বন নেই, কোনও দিশা নেই, কোনও গভীরতার বোধ নেই। সেই দিকহীন, প্রাণহীন, শব্দহীন আলোহীন অন্ধকারে সে একলা ভেসে চলেছে। তার নিজের কোনও বোধ নেই, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর কোনও দখল নেই, শুধু তার জাগ্রত চৈতন্য যেন অনুভব করছে যে সে বেঁচে আছে।
এমন সময় সেই মহতী অন্ধকারই যেন জমাট বাঁধতে শুরু করল, প্রথমে ধীরে এবং তারপর দ্রুত।শেষ তিনটি জায়গায় তিনটি জমাট অন্ধকার যেন তিনটি মানুষের আকৃতি নিল।
না, মানুষের নয়, মানুষীর।
এবং তাদের মাথা নেই, শুধু ধড় তিনটি আছে। আস্তে আস্তে সেই তিনটি প্রাণহীন ধড়ে প্রাণের সঞ্চার হল।তারপর তারা শুরু করল এক অলৌকিক অপার্থিব যৌথনৃত্য। সমগ্র অন্ধকারের সমুদ্র যেন শিউড়ে উঠল সেই নাচ দেখে। রাত্রির প্রতিটি গ্রন্থিতে যেন ভেসে উঠল কান্না, তিনটি অবোধ শিশুর কান্না। তিতলির বুকটা যেন কোন এক অব্যক্ত ব্যথায় মুচড়ে উঠতে লাগল, যেন কোন এক প্রাচীন অসহায় ফোঁপানির শব্দ আস্তে আস্তে কুরে কুরে খেতে লাগল তার চৈতন্য। মনে হল সেই কান্না, সেই ফোঁপানি, সেই অসহায় আর্তি যেন খেয়ে ফেলতে চাইছে তার সমগ্র সত্তা। কারা যেন কেঁদে কেঁদে বলছে ফিরিয়ে দাও, আমাদের, আমাদের মায়ের কাছে ফিরিয়ে দাও। ওগো, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাদের মায়ের কাছে নিয়ে চল।সেই কান্নায়, আর্তিতে আস্তে আস্তে যেন দমবন্ধ হয়ে আসতে লাগল তিতলির। মনে হল যেন সেই অন্ধকার হাহাকার-সমুদ্রে যেন ডুবে যাচ্ছে তিতলি। সে চেষ্টা করছে হাত পা ছুঁড়ে উদ্ধার পাওয়ার, কিন্তু কিছুই সে নাড়াতে পারছে না। তার বোধবুদ্ধি, চৈতন্য, সমস্তটার ওপর শ্বাসরোধী এক পর্দা নেমে আসছে যেন, তিতলি চাইছে চিৎকার করে উঠতে, হাহাকার করে উঠতে, চেঁচিয়ে উঠতে, কিন্তু তার কোনও ইন্দ্রিয়ই আজ আর তার বশে নেই। চোখের সামনে নেমে আসছে এক কালো পর্দা, নেমে আসছে অমোঘ মৃত্যু, নেমে আসছে, নেমে আসছে, নেমে আসছে।
