সেই চুড়ান্ত মৃত্যুর মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে হঠাৎই যেন সবকিছু থমকে দাঁড়াল একবার। কোনও এক অনিৰ্দেশ্য বিন্দু থেকে উদাত্ত এবং গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে আসছে। এক পুরুষের গলা,
ওঁ প্ৰত্যালীঢ় পদাম সদেব ধরিতীম ছিন্নম শিরা কর্তৃকাম।
দীঘবস্ত্রা স্বকবন্ধ শোণিতসুধা ধরম পিবতীন মুদা।
নাগবদ্ধ শিরোমণি ত্রিনয়না হৃদ্যু তপালাম কৃতম।
রত্যাসক্ত মনোভাব পরিদ্রধান ধ্যায়েৎ।।
ধীরে ধীরে তিতলির চেতনায় সাড় ফিরে আসতে লাগল। স্তিমিত হয়ে এল। অন্ধকারের সেই আর্তনাদ। তিতলির মনে হল যেন এক পাতালপুরীর আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়ে সে দ্রুত উঠে আসছে ওপরে, আলোর দিকে। আস্তে আস্তে সমস্ত অন্ধকার কেটে যাচ্ছিল। আলোয়, আশায়, আনন্দে ভরে উঠছিল তিতলির চৈতন্যের প্রতিটি কোণ। আলোর সেই উৎসে পৌঁছানোর আগে সেই গম্ভীর পুরুষকণ্টটি শেষ বারের মতন শুনল তিতলি, শ্রীঁ ক্লীঁ হ্রীঁ ঐ বজ্ৰবৈরোচনীয়ে হুঁ হুঁ ফট স্বাহা… আর তার পরেই আলো আলো আলো…
হাঁপাতে হাঁপাতে বিছানার ওপর উঠে বসল তিতলি। কী সর্বনাশা ভয়ংকর স্বপ্ন, বাপরে! আর ও ঘুমিয়ে পড়েছিল কোন আকেলে? ভাগ্যিস ঘুমটা ভাঙল, নইলে সমস্ত প্ল্যান চৌপট হয়ে যাচ্ছিল আর কী! কাল রাতে কোনো এক পুরুতমশাই নাকি এসেছিলেন কী সব পুজে-টুজো করতে, সেই দেখে তো তিতলি আর বেশি কথা না। বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি দোতলাতে ওর ঘরে চলে এল। ঝিমোতে ঝিমোতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে কে জানে! কী ভাগ্যিস ঘুমটা ভেঙে গেল।
মোবাইল স্ক্রিন অন করল তিতলি, ভোর পাঁচটা। যাক একদম ঠিক সময়ে উঠেছে ও। চটপট রেডি হয়ে নিল। শীতের সকাল, গরম জামাকাপড় গায়ে চড়াল কিছু। ব্যাগ তো তৈরিই ছিল, সেসব নিয়ে সাবধানে, অতি ধীরে নিচে নেমে এল তিতলি।
যাক, সব্বাই মড়ার মতন ঘুমোচ্ছে। অত্যন্ত সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরে এসেই দ্রুত হাঁটা শুরু করল ও। মোড়ের মাথায় আসতেই আরও দুই মূর্তি।
কোনো কথা না বলে দ্রুত রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা মারল তারা। সকালের প্রথম ট্রেন ভোর ছটায়।
*********
ঘম থেকে উঠতে দেরিই হয়েছিল তথাগতর। যত রাত গড়িয়েছে আরও গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গেছিলেন তিনি। এমন অথৈ ঘুম বহুদিন হয়নি ওঁর।
ঘুম ভাঙল ঊর্মিমালার ধাক্কাধাক্কিতে। উঠেই চোখ কুঁচকে ফেললেন তিনি, ইসস, এত বেলা হয়ে গেছে… কী হয়েছে? ধাক্কাচ্ছ কেন?
ঠাকুর মশাই নেই, ফলকটাও নেই। হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন ঊর্মিমালা।
তো তাতে হাঁপাচ্ছ কেন? উনি তো বলেইছিলেন যে ফলকটা নিয়ে যাবেন গঙ্গায় ফেলে আসতে, সে যত রাতই হোক। একেবারে সেখানেই গেছেন হয়তো, আমাদের ডাকবেন না, সে তো বলেই গেছিলেন। আমি বরং একবার মাধবদের বাড়িতে খোঁজ করে দেখছি।
আর্তনাদ করে ওঠেন ঊর্মিমালা, ওগো সর্বনাশ হয়ে গেছে। সকাল থেকে তিতলিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ও বাড়ির সোনাই-রুপাইও নেই। তোমার ভাইকে ফোন করলাম, সেখানেও নেই। তিতলি একটা চিঠি লিখে গেছে দেখো। বলে একটা চিঠি ফেলে দিলেন তথাগতর কোলে।
চিঠিটা পড়তে পড়তে ভয়, উদ্বেগ আর আশঙ্কায় তথাগতর মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠল। দ্রুত উঠে পড়েন তিনি। এই মুহূর্তেই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
সর্বনাশ আসবে বলে তৈরিই ছিলেন প্রফেসার তথাগত দত্তগুপ্ত। কিন্তু একচক্ষু হরিণের মতন বিপদটা এল সম্পূর্ণ অন্যদিক দিয়ে, এলও বড়ই দ্রুত। এবং এ বিপদ মহাবিপদ, ঘোর বিপদ।
বাথরুমে গিয়ে মুখেচোখে জল দেওয়ার সময় বুঝলেন তথাগত, আশঙ্কায় তার সর্বাঙ্গ কঁপছে। থরথর করে।
**********
শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে যেদিকটায় পায়খানা পেচ্ছাপে, বৈঠকখানা বাজারের নোংরায়, মরা বিড়াল ছানা, ভাঙা মাটির ভাড়, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ আর চোলাইয়ের বোতলে ছাকনাচুর হয়ে থাকে, সেদিকে একটা ভাঙা ঝোঁপড়ির মধ্যে বসে ইঞ্জেকশনে মিক্সচার টেনে নিচ্ছিল টেনিয়া।
শীতকালের বিকেল, ঠান্ডা লাগছে হেবি। একটু আগেও টেনিয়ার হাড় অবধি জমে যাচ্ছিল ঠান্ডাতে। দুটো শট নিয়ে এসেছে টেনিয়া, তাই বডিটা সামান্য ওম মারছে। আহ, নাসিরভাই উমদা জিনিস ছাড়া দেয় না, মালটাও খিচে নেয় তেমনি। সালা চারটে পুরিয়া চার হাজার, হারামিটা এক পয়সা কম নেয় না।
মাথায় দুটো কিক পড়তেইইন্দ্রিয়গুলো সটাসট চোখা হয়ে ওঠে টেনিয়ার। সেবার তো বৈজনাথের মাথায় দানা ভরে দেবার আগে দুটো ছিলিম গাঁজা উড়িয়ে তারপর। একটা নাসিরের দেওয়া শট নিয়ে গেছিল টেনিয়া। আহা, প্রথম দানাটাই সোজা কপালে, আওয়াজ করার সময় অবধি পায়নি হারামিটা। ভাবতেই টেনিয়ার মুখে একটা হাসি। খেলে যায়।
পুলিশ অবশ্য ভালো ভাবে নেয়নি ব্যাপারটা। হাড়কাটার একটা বেশ্যার জন্যে টেনিয়া হিট খেয়ে কাউকে উড়িয়ে দিল– এটা ওদের বিশ্বাস হয়নি; ভেবেছে গ্যাং ওয়র। তুলে নিয়ে গিয়ে লকআপে ঢুকিয়ে উলটো করে ঝুলিয়ে কী মার কী মার! সেই থেকেবাঁহাতের কড়ে আঙুলটা নাড়াতে পারেনা ও। তবে অফিসারটার নাম মনে রেখেছে। টেনিয়া। সুবীর সামন্ত। শুয়োরের বাচ্চাটা এখন যাদবপুর থানায় আছে। দুনিয়াটা সালা গোল, মওকা আসবেই, সেদিন হারামজাদাটার খোমা বিলা করে দেবে টেনিয়া।
মিক্সচারটা সিরিঞ্জে প্রায় ডাক্তারের নিষ্ঠায় ভরতে থাকে ও। এদিকে কেউ বিশেষ আসে না। স্টেশনের বাইরে নিজের ভাড়ার ট্যাক্সিটা রেখে এদিকে এসে একটা শট নিয়ে যায়, নইলে ওর চলে না। তামার পয়সা ঘষে দারু, বা হেরোইন, চরস ছাড়া ওর নেশা হওয়া মুশকিল, তবে তাতে হেব্বি খরচ। দুয়েকবার চুমকড়ি, মানে জিভে সাপের ছোবল নিয়ে অবশ্য দেখেছে ও, আহ, নেশার রাজা। কিন্তু ওই যে, কুত্তি প্যয়সা। শালি কারও কথা শোনে না।
