জানেন, গুরু তাইই বলেছিলেন তাঁকে। গুরুর গোপন আদেশেই তার এদিকে আ এতদিন ধরে খুঁজে খুঁজে অবশেষে বোধহয় দৈবাৎ তিনি সেই জিনিসটির খোঁজ পেতে ঊর্মিমালার স্বরে সংবিৎ ফিরে পান তিনি, তারপর সমস্ত ইন্দ্রিয়কোষ সজাগ করে বলতে থাকেন, মেখলা ও কনখলার কাহিনিটি বড় চিত্তাকর্ষক। মহারাষ্ট্রে দেবীপট্ট নামক এক জায়গায় এক গৃহস্থের মেখলা ও কনখলা নামের দকি মেয়ে ছিল, মেখলা বয়সে ছিল বড়, দুবছরের। বিয়ের বয়েস হলে তাদের বাবা এক সম্পন্ন ব্যবসায়ীর দুই ছেলের সঙ্গে তাদের বিয়ে তো দিলেন কিন্তু তাদের বিবাহিত জীবন ছিল খুবই অভিশপ্ত। বড় ছেলেটি ছিল বিকৃতকামী এবং ছোটোছেলেটি ছিল বিবাহিত জীবনে উদাসীন। ফলে যা হয়, দুই বোনের বিবাহিত জীবন বিষময় হয়ে ওঠে। এরপর যা হয়, এসব কথা পল্লবিত হয়ে পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে পৌঁছায় এবং তাদের নিয়ে গুজব ছড়াতে থাকে। ফলে ঘরে-বাইরে তাদের বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়ে ওঠে।
একদিন দুই বোন তাদের বাড়িতে বসে নিজেদের দুঃখের কথা বলাবলি করছে, এমন। সময় সিদ্ধাচার্য কাহ্নপা বা কৃষ্ণাচার্য সেখান দিয়ে নিজের সাতশো ডাক ও ডাকিনীনিয়ে। যাচ্ছিলেন। তাকে দেখে দুই বোনের বড় ভক্তি হল, তারা তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে গুরু কাহ্নপার শরণ নিয়ে তাদের সংসারে বীতরাগের কথা জানাল।কাহ্নপা তখন দুইজনকে বজ্রবারাহী মন্ত্রে দীক্ষা দিলেন এবং নির্জনে গিয়ে সেই মন্ত্রের সাধনা করতে বললেন।
ওদের বাড়ির লোক কেউ খুঁজল না? ঊর্মিমালার গলায় স্পষ্টতই উৎকণ্ঠা।
বউদি, বাড়ির বউ বাড়ি থেকে কাউকে কিছু না বলে উধাও হয়ে গেলে এখনও, এই আধুনিক কালেও কি আমরা সেই হতভাগীকে ত্যাজ্য করে দিই না? আর এ তো। প্রাচীনকালের ঘটনা। মৃদু হাসেন মৈত্রমশাই।
দুই বোন জঙ্গলে গিয়ে দীর্ঘ বারো বছর ধরে বজ্রবারাহী মন্ত্রে সাধনা করে প্রচুর। অলৌকিক শক্তি প্রাপ্ত হয়। তারপর একদিন তাদের ইচ্ছা হয় গুরুর সঙ্গে দেখা করার। খুঁজতে খুঁজতে তারা বাংলাদেশের হেমদল নামের এক জায়গায় এসে গুরুর দেখা পায়।কিন্তু তখন তারা আর সেই যুবতী বউদুটি নেই, মধ্যবয়সী রুক্ষমূর্তি শুষ্কপ্রায় দুই সাধিকা, কাহ্নপা তাদের চিনতে অস্বীকার করেন।
তখন দুই বোন গুরুকে নিজেদের পুরোনো কথা মনে করিয়ে দিয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহণের কথা বলেন।
তখন কাহ্নপা বলেন, যদি শিষ্যত্বই তারা নিয়ে থাকে, তবে গুরুদক্ষিণা কই? বনচারী কপর্দকহীন দুই বোন জানতে চান গুরু কী দক্ষিণ চান?
কাহ্নপা বলেন, তার দুই বোনের মুন্ডু চাই।
এ তো সেই শকুন্তলা আর একলব্যের গল্পের মিশেল, মিস্টার মৈত্র। আশ্চর্য শোনায় দর্শনের অধ্যাপকটির গলা।
একটু থামেন মৈত্রমশাই, তারপর বলেন, তা বটে, তবে এর পরের কাহিনিটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি, মন দিয়ে শুনবেন। এই কথা। শোনামাত্র দুই বোন নিজেদের মুখের মধ্যে থেকে তীব্র আলোকময় তীক্ষ্ণ প্রজ্ঞাখঙ্গ বার করে নিজেদের মুণ্ড কেটে ফেলে এবং গুরুকে ভেট দেয়। এবং তারপরেই তাদের ধড দুটি শুরু করে এক অপার্থিব, অলৌকিক নাচ, সেই নাচ বিশ্বচরাচরে আর কেউ কোনওদিন দেখেনি। নাচতে নাচতে তাদের দেহ এক মায়াবী নীল আলোর মধ্যে উঠে যায় ঊর্ধ্বাকাশে, ডাকিনীদের মধ্যে। ডাকিনীরাও তাদের দেখে উত্তেজিত হয়ে নিজেদের মুণ্ডচ্ছেদন শুরু করে দেয়, তারাও শুরু করে সেই স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল মথিত করা নাচ। সৃষ্টি রসাতলে যায় যায় প্রায়।
বলে থেমে যান মৈত্রমশাই, এই শীতেও ঘাম জমেছে ওঁর মুখে, স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন।
উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন আরেকজনও। ঈষৎ কাঁপা গলায় ঊর্মিমালা জিজ্ঞেস করেন, তারপর? তারপর কী হল?
তারপর, অবশেষে দেবী বজ্রবারাহী স্বয়ং আর্বিভূত হয়ে ডাকিনীদের নিরস্ত করেন। এবং নিজের হাতে নিজের মুণ্ডচ্ছেদ করে নাচ শুরু করেন। তার সেই কাটা গর্দান থেকে রক্তধারা উপচে পড়ে দুই ডাকিনীর মুখে, বজ্ৰবৈরোণি ও বর্জবর্ণিনী।
এরপর গুরু কাহ্নপা নিজের হাত বাড়িয়ে দুই শিষ্যার মাথায় তাদের কাটামুণ্ড জুড়ে দেন এবং তাদের সিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। এর পর বেশ কিছু বছর অশেষ লোকহিত করে দুই বোন খেচরে, অর্থাৎ ডাকিনীদের স্বর্গে যান।
এতটা বলে ফলকটা দুজনের চোখের সামনে তুলে ধরেন মৈত্রমশাই, উত্তেজনায় তার গলা তখন থরথর করে কাঁপছে, ভালো করে দেখুন আপনারা, দুই নাচতে থাকা বোনকে দেখতে পাচ্ছেন? নিজেদের মাথা কাটতে উদ্যত! নীচে পদ্মাসনে বসে আছেন।
গুরু কাহ্নপা বা কৃষ্ণাচার্য। ওপর থেকে আশীর্বাদ দিচ্ছেন দেবী বজ্রবারাহী।
তার মানে… কথার খেই হারিয়ে যায় ঊর্মিমালার…
এ কোনো অর্বাচীন জিনিস নয় বউদি, এটি একটি কম করে হাজার বছরের পুরোনো বৌদ্ধতন্ত্রফলক। দেবী বজ্রবারাহীর আরাধনার জন্যে, তাকে আহ্বান করার জন্যে এর সৃষ্টি। কোনও অতিলৌকিক প্রতিভার অধিকারী সাধক এর সৃষ্টিকর্তা। এর ইতিহাস অদ্ভুত, ক্ষমতা অসামান্য। এবং এরই মধ্যে এক সুপ্ত অভিশাপ লুকিয়ে আছে। খুব সম্ভবত কোনও শক্তিশালী পুরুষ এই ফলককে অভিশাপ দেন।
ভয়ে ঊর্মিমালার মুখ বিবর্ণ হয়ে আসে, তা হলে? কী উপায় ঠাকুরমশাই?
