এবং জেনে আশ্চর্য হবেন যে, এই মহাযানের বাড়বাড়ন্ত থেকে মন্ত্রযান বা বজ্রযানে অবনতি, পুরো ঘটনাটা ঘটার মধ্যে বাঙালিদের খুব বড় ভূমিকা ছিল। পালরাজাদের সময়েই মহাযানপন্থার বাড়বাড়ন্ত, এই সোমপুরা মহাবিহারও সম্রাট দেবপালের তৈরি। পূর্ব বিহার অর্থাৎ অঙ্গ থেকে চট্টগ্রাম অর্থাৎ হরিকেল অবধি, প্রাগজ্যোতিষপুর মানে আসাম থেকে তাম্রলিপ্ত, মানে তমলুক সমস্ত এলাকাটাই তখন বৌদ্ধ। তখন অবশ্য এই মধ্যবর্তী এলাকাটি বিভিন্ন অংশে বিভক্ত ছিল, যেমন পৌণ্ড্রবর্ধন, সুহ্ম, সমতট বা বঙ্গ ইত্যাদি। তা সব মিলিয়ে সমস্ত বাংলাদেশে তখন বজ্রযান তথা মন্ত্রযানের রাজরাজত্ব। তারপর কালের নিয়মে আদিশঙ্করাচার্য হিন্দুধর্মের পুনরুত্থান ঘটালেন, পালবংশ সরিয়ে শাসন ক্ষমতায় এলেন কর্ণাটকদেশাগত ব্রহ্মক্ষত্রিয় সেনরাজবংশ। বৌদ্ধধর্মের গৌরবসূর্য ভাগীরথীর তীরে অস্তমিত হল।
কেন? সেনরাজবংশ কী করল? সংশয় ঊর্মিমালার গলায়।
সেনরাজবংশ ছিল কট্টর হিন্দু। তারা সমস্ত বৌদ্ধ বিহারকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিল। উচ্চপদে বৌদ্ধদের নিয়োগ বন্ধ হয়ে গেল। একে আদর্শের অবক্ষয়, তার ওপর রাজা যদি বিরূপ হন, কোন ধর্মই বা টিকে থাকতে পারে বলুন?
যাই হোক, এই পালরাজাদের শাসনের একদম শেষ দিকে, দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বজ্রযান থেকে আরও একটি নতুন ধারার উদ্ভব ঘটে, সহজিয়া। বৌদ্ধধর্ম। এদের প্রচারক ছিলেন সিদ্ধাচার্যরা। এঁরা মানুষের মধ্যে থেকে সহজ ভাষায়। জনসাধারণকে উপদেশ দিতেন। চর্যাপদের নিশ্চয়ই নাম জানেন, মানে বাংলা ভাষার প্রথম বই, সেইটিও এঁদেরই লেখা। বাংলাভাষার উদ্ভবও এই সময়েই। বৌদ্ধ ইতিহাসমতে, এই সিদ্ধাচার্যরা সংখ্যায় ছিলেন চুরাশি।
এতটা বলে একটু জল খেলেন মৈত্রমশাই। ততক্ষণে তথাগতর পাঠানো ছেলেরা লিখে দেওয়া যাবতীয় উপচার নিয়ে ফিরে এসেছে। সেইগুলো রেখে ফিরে এলেন। গিন্নিমা, তারপর?
এই চুরাশিজন সিদ্ধাচার্য বড় আশ্চর্যজনক লোক ছিলেন। এঁরা থাকতেন খুব। সাদাসিধেভাবে এবং কিছুক্ষেত্রে ভারী বিচিত্র জীবিকা পালন করতেন, যেমন দ্বারিকপা। বলে একজন ছিলেন, তিনি বেশ্যার দারোয়ান ছিলেন, শবরিপা ছিলেন ব্যাধ বা শিকারি। মজার কথা এই যে, এঁরা প্রত্যেকেই কিন্তু অসামান্য ও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।
এই চুরাশি জনের মধ্যে চারজন ছিলেন মহিলা। তাদের নাম মণিভদ্রা, লক্ষীঙ্করা, এবং মেখলা ও কনখলা নামের দুই বোন।
এই চুরাশি জন সিদ্ধাচার্যের সবার নামেই চমৎকার সব গল্প প্রচলিত আছে, তবে সবচেয়ে অদ্ভুত অবিশ্বাস্য বোধহয় মেখলা ও কনখলা নামে দুই বোনের নামে প্রচলিত। ঘটনাটি।– এতটা বলে থামলেন মৈত্রমশাই। তারপর বললেন, হয়তো একটু জটিল বা দীর্ঘ। হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আপনাদের জানা দরকার বলেই বলছি। আমাদের হিন্দুদের অনেক দেবদেবী বৌদ্ধদের থেকে সরাসরি নেওয়া। বৌদ্ধ দেবতাদের উৎপত্তির কিন্তু সুন্দর সূত্র বা প্রথা আছে, হিন্দুদের মতন এলোমেলো ভাবে কোনও দেবতার উৎপত্তি ঘটেনি। বৌদ্ধধর্মে। বৌদ্ধমতে আদিবুদ্ধ থেকে পাঁচজন ধ্যানীবুদ্ধের উদ্ভব। এই পাঁচজনের প্রত্যেকের সঙ্গে আবার একজন করে শক্তি ও বোধিসত্ত্ব আছেন। এইভাবে সমস্ত বৌদ্ধ দেবদেবীদের কোনও না কোনও ধ্যানীবুদ্ধকুলের অন্তর্গত করা যায়।
আরেকটা কথা, বেশিরভাগ বৌদ্ধ দেবদেবীই বড় ভয়ংকর ও উগ্রচন্ডা, শান্তশিষ্ট দেবদেবী হিন্দুধর্মেই বেশি। একেকজন বৌদ্ধ দেব বা দেবীর রূপবর্ণনা শুনলে অবধি ভয় করে, সামনে উপস্থিত হলে কী হবে জানা নেই। সেই থেকে তান্ত্রিক দেবদেবী মাত্রেই তার রূপ ভয়ংকর।
একটু জল খেলেন মৈত্রমশাই, খানিকক্ষণ থেমে তারপর ফের শুরু করলেন।
এইরকম এক ধ্যানীবুদ্ধ হলেন অক্ষোভ্য।ইনি পূর্বদিকের অধিপতি এবং সমস্ত কটু মানে কষাটে স্বাদ এঁর থেকে উৎপন্ন হয়। এঁর এবং এঁর কুলের সমস্ত দেবদেবীদের রং হল নীল এবং এঁর শক্তির নাম মামকী। এই অক্ষোভ্যকুলেই আছেন বৌদ্ধতন্ত্রের সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় দেবতা হেরুক, একই সঙ্গে সবচেয়ে সাংঘাতিক দেবতাও বটে। হেরুকের চারজন শক্তি এবং চারজনের সঙ্গে যুগনদ্ধ অবস্থায় এঁর চাররূপ ও চারনাম। এই চার শক্তির মধ্যে সবাই উগ্রস্বভাবা ও প্রাণহন্তারক বটে, তবে ভয়ংকরতমা হলেন যিনি তাঁর নাম দেবী বজ্রযোগিনী। ইনি বৌদ্ধতান্ত্রিকদের সর্বোচ্চ আরাধ্যা দেবী, ইনি ডাকিনীদের অধিষ্ঠাত্রী, প্রজ্ঞা ও ধ্বংসের দেবী, সাক্ষাৎ উগ্রকালস্বরূপিনী। এই দেবী বজ্রযোগিনীরই আরও একটি আরও উগ্রতর রূপ আছে, বজ্রবারাহী। এঁদের পূজা ভয়ানক কঠিন এবং বিন্দুমাত্র বিচ্যুতিতে সাধকের প্রাণসংশয় উপস্থিত হয়।
এতটা বলে একটু দম নিলেন মৈত্রমশাই। ঊর্মিমালার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, তিনি তাড়াতড়ি উঠে গেলেন পূজার আয়োজন করতে, অতসীকে বলেছেন আজ রাতে থেকে ওঁকে সাহায্য করে যেতে। একটু পরে ফিরে এলেন, তারপর ঠাকুরমশাই?
কী যেন ভাবছিলেন মৈত্রমশাই। আস্তে আস্তে তার সমস্ত স্নায়ু সজাগ হয়ে আসছিল, তিনি বুঝতে পারছিলেন উল্কার মতন খুব দ্রুত এক অভিশাপবিষ নেমে আসছে। সমস্ত রোম খাড়া হয়ে উঠছে তাঁর। যুদ্ধ আসন্ন এবং এ বড়ো সহজ যুদ্ধ নয়। তিনি।
