ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে এসে ঢোকেন তথাগত, উত্তেজিত গলায় বলেন, পেয়েছি মিস্টার মৈত্র, এই দেখুন। নামটা ভুলে গেছিলাম ওঁর। নালন্দা নয়, আজ থেকে হাজার বছর আগে আমাদের এক পূর্বপুরুষ সোমপুরা মহাবিহারের অধ্যক্ষ বা স্থবির ছিলেন। আমরা তারই বংশধর।
সোমপুরা মহাবিহারের মহাস্থবির? কী বলছেন প্রফেসর সাহেব? আপনাদের তো পুণ্যবান বংশ তা হলে! নালন্দার পর সোমপুরা, ওদন্তপুরী, জগদ্দল এই তিনটি। তো ছিল বৌদ্ধদর্শন ও বৌদ্ধধর্ম অধ্যয়ন ও প্রচারের পীঠস্থান। আর বালুরঘাট থেকে বেশি দূরেও নয় সে জায়গা।
জানি মিস্টার মৈত্র, তথাগত বলে ওঠেন জায়গাটা এখন বাংলাদেশে। নওগাঁওতে। এখন নাম পাহাড়পুর। এই বাড়ি থেকে পাহাড়পুর অবধি সোজা রাস্তা থাকলে দেড় থেকে দুঘণ্টার বেশি লাগার কথা না। খুব সম্ভবত তাই আমাদের সেই পূর্বপুরুষের কয়েক জেনারেশান বাদে কেউ এসে বালুরঘাটে বসতি স্থাপন করেন। আমরা বালুরঘাটে আছি কমসেকম পাঁচশো বছর, বেশি বই কম নয়। তবে একটা কথা বলতেই হবে, বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস নিয়ে আপনার পড়াশোনা কিন্তু ঈর্ষণীয়।
মৃদু হাসলেন মৈত্রমশাই, তন্ত্র জানতে গেলে তো বৌদ্ধধর্ম জানতেই হবে প্রফেসর সাহেব। তন্ত্রের যে বর্তমান চেহারা আমরা বুঝি বা জানি, তার উদ্ভবই তো বৌদ্ধধর্ম তথা বৌদ্ধতন্ত্র থেকে। আচ্ছা, এখন চলুন দেখিবউদি কী সব ফলক পেয়েছেন। আমার। মনে হয় একটি অসামান্য দৈবশক্তিসম্পন্ন কোনো তান্ত্রিক আধার আপনাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। সাধারণভাবে তাকে নাড়াচাড়ার অর্থ সাক্ষাৎ মৃত্যুকে আহ্বান করা। যদি আমার আশঙ্কা ঠিক হয়, কয়েকটি জিনিস কিন্তু আমাকে আনিয়ে দিতেই হবে প্রফেসর সাহেব, যত রাতই হোক, যেখান থেকে খুশি হোক।
আচ্ছা কী কী লাগবে বলে দেবেন একটু। একেবারে অসম্ভব না হলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা হয়ে যাবে। প্রফেসর সাহেবের গলায় উদ্বেগটা নজর এড়ায় না কারোরই।
আর আপনার সেই পূর্বপুরুষের নাম কী? যিনি সোমপুরা মহাবিহারের অধ্যক্ষ। ছিলেন?
মহাস্থবির রত্নাকরশান্তি।
*********
ফলকটা হাতে নিয়ে আরক্তমুখে বসে ছিলেন মৈত্রমশাই। তার মুখের ওপর একই সঙ্গে খেলা করে যাচ্ছিল ভয় এবং উদ্বেগ। তার পাশে বসে চুপ করে বসেছিলেন তথাগত এবং ঊর্মিমালা।
ফলকটা দেখেই চমকে উঠেছিলেন তিনি। ঊর্মিমালার মনে হয়েছিল যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতন একবার কেঁপে উঠলেন মৈত্রমশাই, একদম সিধে হয়ে গেলেন। তারপর খুব সাবধানে, যেন বিষাক্ত কিছু নাড়াচাড়া করছেন এমন ভাবে লাল চেলিতে ফলকটি হাতে নিয়ে বৈঠকখানায় এসে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর বিড়বিড় করতে করতে সারা ফলকটাকে ছুঁয়ে দেখলেন।
কিছুক্ষণ পর দৃঢ়স্বরে বললেন, কতগুলো জিনিস একটু আনিয়ে দিতে হবে প্রফেসর সাহেব, বেশি সময় নেই। খুব সম্ভবত পরের বারো ঘণ্টার মধ্যেই আপনাদের ওপর একটা বিশাল ফাড়াআসতে চলেছে।দেখি কতদূর কী করা যায়। এই বলে একটি কাগজে কিছু লিখে দিলেন। প্রফেসার সাহেব তৈরিই ছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ লোক পাঠিয়ে দিয়ে এসে মৈত্রমশাইয়ের পাশে গিন্নিকে নিয়ে উদ্বিগ্নমুখে বসলেন, এইবার যে সব কিছু খুলে বলতে হচ্ছে মিস্টার মৈত্র। এ কীসের ফলক, কীসের ভয়, কোন অমঙ্গল আশঙ্কা। আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কারও কোনও ক্ষতি করিনি, আমরা যখন পেরেছি লোকের সাহায্য করেছি। আমাদের তো এসব ঝামেলার মধ্যে পড়ার কথাও নয়।
খানিকক্ষণ চোখ বুজে থাকার পর মৈত্রমশাই শুরু করলেন,
প্রারব্ধ বোঝেন প্রফেসারসাহেব? খুব সম্ভবত প্রাচীন কোনও ঘটনাচক্রের ফলে এই প্রচণ্ড শক্তিশালী তন্ত্রফলকটি আপনাদের কাছে ফিরে এসেছে।তবে আজ রাতটাই। আজ রাতেই আমি এঁর যথাবিহিত পূজাসংস্কার করব, কাল সকালে বা দুপুরে নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে আসব। এ জিনিস লোকারণ্যে থাকা ঠিক না।
কিন্তু এটা কীসের ফলক ঠাকুরমশাই। মূর্তিগুলো কার?
খানিকক্ষণের নৈঃশব্দ্য, তারপর ধীরস্বরে বলতে লাগলেন তিনি,
বলতে গেলে তো অনেক কথাই বলতে হয় প্রফেসরসাহেব, তবে যতটা সম্ভব সংক্ষেপে বলছি।
ভগবান গৌতম বুদ্ধের পরিনির্বাণের একশো বছরের মধ্যে বৌদ্ধসংঘে বিবাদ শুরু হয়। পরের চারশো বছরের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম দুইভাগ হয়ে যায়, স্থবিরবাদ বা থেরবাদ বা হীনযান ও মহাসাংঘিক বা মহাযান।
হীনযান ও মহাযানের মধ্যে দর্শনের পার্থক্য বলতে গেলে রাত ভোর হয়ে যাবে, অত সময় আমাদের নেই। হীনযানীরা বুদ্ধের আসল মতবাদ আঁকড়ে রইল।মহাযানীরা বুদ্ধকে লোকোত্তর বলে তাকে পূজা করা শুরু করল, নিয়ে এল স্বর্গ-নরক, পূজা অর্চনা, ক্রিয়া কাণ্ড ইত্যাদি। এবং তারা শুরু করল আরও একটা জিনিস, মূর্তিপূজা। ভারতবর্ষে মূর্তিপুজার উদ্ভব বৌদ্ধদের হাত ধরেই।
কথাটা অবশ্য ঠিক; বৈদিক হিন্দুধর্মে যাগযজ্ঞ ছাড়া আর কোনও পূজাবিধির উল্লেখ নেই। মূর্তিপূজার তো নেইই। তথাগত সমর্থন করেন।
ধীরে ধীরে বৌদ্ধধর্ম যখন তিব্বতে ঢুকল পঞ্চম, ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ, তখন সেখানকার স্থানীয় বন-উপজাতিদের সঙ্গে অনেক লড়াই ও আপোষের পর তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম এক সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিল, তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম বা বজ্রযান। তাতে মূর্তিপূজা আর মন্ত্রতন্ত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। ধীরেধীরে বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয় শুরু হল, তার জায়গা নিলো মন্ত্রযান। বৌদ্ধধর্মের সমস্ত উচ্চ আদর্শ ও ভাব নীতি, যেমন চারটি আর্যসত্য, অষ্টাঙ্গিক মার্গ, পঞ্চশীল বা অষ্টশীল পালন এসব জলাঞ্জলি দিয়ে প্রধান হয়ে। উঠল গুরুবাদ, ভূতপ্রেতাদির পূজা, যন্ত্র-মন্ত্র-মণ্ডল ইত্যাদি।
