সে জন্যে নয়, আজ রাত থেকে কাল দুপুর পর্যন্ত আপনাদের সঙ্গে থাকা প্রয়োজন, আশু প্রয়োজন। আপনার পরিবারের ওপর ঘোর অমঙ্গলের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। ভয় পাবেন না, আমি বদ লোক নই।
কথাটার মধ্যে কিছু একটা ছিল, এমন করে বললেন মৈত্রমশাই, যে কেউ আর দ্বিরুক্তি করতে পারল না। প্রফেসর দত্তগুপ্ত হেসে বললেন, আরে চলুন চলুন, অত কিন্তু কিন্তু করতে হবে না। আমি লোক চিনি। অমঙ্গল হোক না হোক, একদিন অতিথিসেবা তো করতে পারব? তার ওপর আমার গিন্নি আবার লোক খাওয়াতে ভারী। ভালোবাসেন। ওহে মাধব, মৈত্রমশাইয়ের টুকিটাকি যা লাগে একটু পরে দিয়ে যেও তো। চলুন মৈত্রমশাই, এই দিকে আসুন…।
*********
স্বর্ণালি আর রুপালি অনেকক্ষণ হল বাড়ি চলে গেছে। ভারী ভালো মেয়ে, দিদিকে সাহায্য করবে বলে একপায়ে খাড়া, হাজার হোক একদিনের জন্যে একটা অ্যাডভেঞ্চার তো হবে ওদের। ওদিকে স্যামের সঙ্গেও কথা হয়ে গেছে। কাল দুপুর নাগাদ স্যাম আর ওর বন্ধুরা স্টেশনেই ওয়েট করবে, সেখান থেকে কালীঘাট। মা-বাবার কথা ভেবে একট। খারাপই লাগছিল তিতলির, কিন্তু সত্যিই স্যামকে ছাড়া ও আর থাকতে পারছে না। মা-বাবা বুঝবে নিশ্চয়ই… আর পড়াশোনা তো চালিয়ে যাবেই, সেটা তো আর ও ছাড়ছে না। স্যাম তো বললই ওর মা স্কুল টিচার, এতে কি তিতলির মাধ্যমিক দিতে আরও সুবিধাই হবে না? উফ, আর একটা মাত্র রাত। তিতলি প্রায় উড়েই বেড়াতে লাগল…
*********
মৈত্রমশাই ঘুরে ঘুরে বইয়ের সংগ্রহ দেখছিলেন। এমন সময় তথাগত ঘরে ঢুকতে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, আপনার বইয়ের সংগ্রহ তো ঈর্ষণীয় মশাই।
একটু লজ্জাই পেলেন তথাগত, মাস্টারের বাড়ি তো৷ আসলে আমরা, মানে আমাদের পরিবারের কেউ কোনওদিন গুরুগিরি ছাড়া, বা শিক্ষকতা ছাড়া অন্য কিছু করেননি। শিক্ষকতা আমাদের জাত ব্যবসা বলতে পারেন।
সামান্য ভ্রূকুটি করলেন মৈত্রমশাই, সেক্ষেত্রে তো আপনাদের উপাধি আচার্য বা উপাধ্যায় হওয়া উচিত, মানে ভট্টাচার্য বা বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি। অথচ আপনাদের উপাধি দত্তগুপ্ত। এর একটাই মানে হয় কিন্তু।
কী বলুন তো? কৌতূহলী হলেন তথাগত।
আপনারা কোনও এক পর্যায়ে বৌদ্ধছিলেন।
কী রকম?
বাংলাদেশে তো সম্পূর্ণ বৌদ্ধদের ঘাঁটি ছিল। শঙ্করাচার্য যখন অদ্বৈতবাদ প্রচার করে হিন্দুধর্মের পুনরুত্থান ঘটালেন, তখন নবম কী দশম শতাব্দী। সেই সময়টা বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয়ের সময়ও বটে।তারপর থেকে প্রচুর বৌদ্ধরা হিন্দুধর্মে ফিরে আসতে থাকে। কিন্তু বর্ণাশ্রম প্রথা চিরকালই হিন্দুধর্মে প্রবল ছিল, তাই যেসব ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধ হয়ে গেছিলেন, তাঁদের ফের ব্রাহ্মণ করিয়ে ফেরত নেওয়া হল না, গুপ্ত ব্রাহ্মণ বা বৈদ্য করিয়ে ফেরত নেওয়া হল।
অনেকটা ঠিকই ধরেছেন, সহাস্যে বলেন তথাগত, আমরা বৌদ্ধই ছিলাম। আমাদের এক পূর্বপুরুষ নাকি বিক্রমশীলা না নালন্দা কোথাকার অধ্যক্ষ ছিলেন, আমরা তাঁরই বংশধর, তারপর থেমে যোগ করেন, সেই থেকে আমাদের জাতব্যবসা হল শিক্ষাদান আর বাড়ির ছেলেদের নাম সব ওইরকম। আমার ছেলের নাম শাক্য, আমার বাবার নাম ছিলো সিদ্ধার্থ, ঠাকুর্দার নাম ছিলো বৈরোচন… আমাদের বাড়িতে তো একটা প্রাচীন পুথি আছে, তাতে আমাদের ফ্যামিলি লাইনের প্রায় গত এক হাজার বছরের সমস্ত পূর্বপুরুষদের নাম আছে, দাঁড়ান, এক্ষুণি আনছি। বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন।
ধীরে ধীরে মেঝেতে বসলেন মৈত্রমশাই। তারপর পদ্মাসনে বসে ধ্যানস্থ হলেন।
তিনি নিশ্চিত, যে একটি অপঘাত বা অমঙ্গলের কালো ছায়া এই পরিবারের ওপর নেমে এসেছে এবং নেমে এসেছে সদ্য, এঁদের অজান্তে। বিকেলে প্রফেসর দত্তগুপ্তকে। দেখা মাত্র সেই আশঙ্কার কালোমেঘ নজরে পড়েছিল তাঁর। কোনও এক অতিশক্তিশালী তন্ত্রবিষ আশ্রয় নিয়েছে এখানে। বিনা রক্তপাতে সে বিদায় নেবে না। সে কালনাগিনীর ছোবল নেমে আসতে দেরি নেই বিশেষ।
গুরু খুব সম্ভবত এর কথাই বলেছিলেন মৈত্রমশাইকে।
খানিকক্ষণ বাদে খুকখুক কাশির শব্দ শুনে চোখ খুললেন মৈত্রমশাই। বুঝতে অসুবিধা হল না, ভদ্রমহিলা এই বাড়ির গিন্নি, শ্রীমতী দত্তগুপ্ত। ভদ্রমহিলা গলবস্ত্র হয়ে ধরা গলায় ভয়ার্ত মুখে বললেন, নমস্কার ঠাকুরমশাই, আমি ঊর্মিমালা, এ বাড়ির বউ। আপনি যেন কী সব অমঙ্গলের কথা বলছিলেন? আমার উনি এসে বললেন। আমার তো শুনে থেকে ভয়ে বুক কাঁপছে।
ভয়েরই কথা বউদি। তবে চিন্তা করবেন না। অসম্ভব শক্তিশালী একটি তান্ত্রিক আধার আপনাদের অজানিতে এ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। রক্তপাত বা অপঘাত ছাড়া সে বিদায় নেবে না। তবে চিন্তা করবেন না, কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই। একটা কথা মন দিয়ে বলুন তো, সদ্য নতুন কিছু কিনেছেন?নতুনও হতে পারে, পুরোনো। অথবা কিছু পেয়েছেন, বা কিছু এসেছে আপনারদের বাড়িতে?
নতুন কিছু কেনা তো হয় নি, চিন্তায় ডুবে গেলেন দত্তগুপ্তগিন্নি, তবে কয়েকদিন আগে আমার চেনা একটি মেয়ে একটি ফলক দিয়ে যায় আমাকে, কোথাও একটা কুড়িয়ে পেয়েছিল। অদ্ভুত কিছু মূর্তি আঁকা, আর আলতা সিঁদুর দিয়ে লেপা। আমি তো কোনও দেবী ভেবে ঠাকুরঘরে রাখলাম…
তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়ালেন মৈত্রমশাই, এক্ষুনি দেখান আমাকে সেই ফলক।
