শেষে যেদিন তিতলির হাই এর উত্তরে স্যামের হ্যাল্লো বিউটিফুল মেসেজটা তিতলির মোবাইলের স্ক্রিনে সদ্যফোঁটা পদ্মফুলের মতই ভেসে এল, সেদিন তিতলির পুজো দেওয়ার ঘটা দেখে বাড়ির লোকজন তো অবাক!
তারপর মেসেজ, চ্যাট, হোয়াটসঅ্যাপ। তিতলি আর স্যামের কথার ঝিরিঝিরি কিশোরী ঝরনাটি কবে বেগবতী নদী হয়েছে, সে তিতলি নিজেই জানে না। ফোনে কথা বলা, হোয়াটসঅ্যাপে সেল্ফি পাঠানো, কিছুতেই পিছিয়ে থাকেনি তিতলি।
এমনকি যেদিন স্যাম ওর স্নান করার ভিডিও পাঠাতে বলল সেদিনও নয়।
বলতেই হবে স্যামের দাবিটা শুনে লজ্জায় কুঁকড়েই গেছিল তিতলি। ছি ছি ছি, ম্যাগো, কী লজ্জা লজ্জা! কী বেহায়া এই স্যামটা। ভাবলে এখনও ফর্সা মুখটা গোলাপি হয়ে আসে তিতলির। বিয়ের আগেই এসব কী, অ্যাঁ? ছিঃ!
শেষে অবশ্য লজ্জাঘেন্নার মাথা খেয়ে একটা দশ মিনিটের ভিডিও তুলে পাঠিয়েই দিয়েছিল তিতলি।নইলে যদি কলকাতারনিলাজ বেহায়া ডাইনিগুলো তার আগেই এসব দেখিয়ে তার স্যামকে কজা করে ফেলে? হতেই পারে না। চোয়াল শক্ত করে, মনকে বেঁধে যতটা সম্ভব ব্রীড়া ও কামকলা মিশিয়ে সে একটা ভিডিও পাঠিয়েছে স্যামকে। গ্রামের মেয়ে বলে সে কলকাতার মেয়েদের থেকে কম মর্ডান নাকি? ছোঃ!
মাঝে অবশ্য শবনমদিকে একবার হালকা আভাস দিয়েছিল তিতলি। সবদিক জেনেশুনে শবনমদি সেদিন অনেক রাতে কল করেছিল তিতলিকে। বলেছিল যে এই নাম যাদবপুরে প্রেজেন্ট চার বছরে কেউ পড়ে না, আগের দুই ব্যাচেরও খবর নিয়েছিল, সে ব্যাচেও কেউ পড়েনি। যদিও তিতলি তার একটা কথাও বিশ্বাস করেনি। কারণ সব শোনার পর স্যাম তাকে বুঝিয়েছিল যে শবনম স্যামকে প্রপোজ করে, এবং তিতলির প্রেমে অন্ধ স্যাম তা রিফিউজ করে। তাই শবনম যে মিথ্যে কথা বলে তিতলির মন বিষিয়ে দেবেই এ তো দিনের আলোর মতন পরিষ্কার!
দত্তগুপ্ত বাড়ির ছাদে এসব কথাবার্তা নিয়ে আলোচনা করতে করতে সেদিন হাসি ঠাট্টায় ভেসে যাচ্ছিল বিশ্বচরাচর।তিনটি অবোধ বালিকার ওপর হালকা মিহি চাদরের। মতন নেমে আসছিল শীতের হিমেল পরশ।
কেউ দেখেনি সেদিন, খুব মিহি মখমলের মতন, গুঁড়ো অন্ধকারের মতন নেমে আসছিল তিনটি নৃত্যরতা রমণীর এক অবিশ্বাস্য ভয়াবহ নাচের সিলয়েট। ধীরে ধীরে সেই তিনটি অন্ধকারের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি সিলয়েট চাদরের মতোই তিনটি অপাপবিদ্ধ কন্যার গায়ে জড়িয়ে গেল, অমোঘ নিয়তির মতোই!
*********
তাহলে তন্ত্র বলতেই সবাই ভয়ংকর কিছু কেন বোঝে?অতীশ মণ্ডলের কথাটা ফেলে দেওয়ার মতন না।
স্মিত হাসলেন মৈত্রমশাই, কারণ যে তন্ত্রকে আমরা আজ চিনি, তা আসলে ব্ল্যাক ম্যাজিক ছাড়া আর কিছু নয়, ওটা তন্ত্রের এক বিকৃত রূপ। তন্ত্র বলতেই লোকে মারণ উচাটন, অর্থাৎ খারাপ কিছু বোঝে। এই মারণ, উচাটন, বিদ্বেষণ এসবকে বলা হয় কৃষ্ণ ষটকর্ম। এসব তন্ত্রে অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ। এই কৃষ্ণ ষটকর্মের মতোই আছে শুক্ল ষটকর্মও, যেমন যজন, যাজন, অধ্যয়ন…
ইয়ে, যজন আর যাজন একই জিনিস না? সংশয়কারী অনিন্দ্য ভুক্তের প্রশ্ন।
না। যজন মানে নিজের জন্যে পূজা ও যাগযজ্ঞ, যাজন মানে অন্য কারও জন্যে পূজা ও যাগযজ্ঞ, যেখান থেকে যজমান শব্দটা এসেছে।মৈত্রমশাইয়ের হাসিটা কিন্তু অমলিন।
সে কি? যজমান শব্দটা তান্ত্রিক নাকি? চিন্তিত দেখায় অনিন্দ্য ভুক্তকে।
শুধু যজমান কেন? বাঙালি জীবনের প্রতিটি ধর্মকেন্দ্রিক আচরণই আসলে তান্ত্রিক। ইষ্টদেবতা, যজমান, গুরুবাদ, মন্ত্রদান, শান্তিস্বস্ত্যয়ন, সবই তান্ত্রিক অভ্যেস। আমরা বাঙালিরা এতই তান্ত্রিক বা তন্ত্রসভ্য জাতি যে আমরা নিজেরাই বুঝি না। আমরা। সব কাজ পারি বোঝাতে গিয়ে কোন বাক্যবন্ধ ব্যবহার করি? বলি যে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ। খেয়াল করে দেখবেন, কখনও কিন্তু বেদপাঠের কথা বলি না।
এতটা বলে একটু সময় নিলেন মৈত্রমশাই, তারপরে অমলিন হাসিমুখে শেষ অস্ত্রটি ছাড়েন, এমনকি যে সমস্ত দেবদেবীর মূর্তি দেখেন, সবই তন্ত্রমতে কল্পিত, পৌরাণিক হিন্দুধর্মেই এর উৎপত্তি। সনাতন বৈদিক হিন্দুধর্মের সঙ্গে এখনকার হিন্দুধর্মের মিল বড় অল্প। আমাদের সমস্ত পূজা ও সাধনপদ্ধতি, অর্ঘ্য অর্পণাদি, পূজামন্ত্র, সব কিছু তান্ত্রিক মতে হয়। ঘটস্থাপন, প্রাণপ্রতিষ্ঠা, চক্ষুদান, মূর্তির সামনে মেঝেতে যন্ত্র অঙ্কন, চারকাঠি বা ধ্বজস্তম্ভস্থাপন, সবই তান্ত্রিক পূজাপদ্ধতি। এমনকি সরস্বতীপূজার জয় জয় দেবী চরাচরসারে থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন পিনাকেতে লাগে টঙ্কার সে সবই আসলে তন্ত্রসঙ্গীত।
শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। শুধু সন্ধের অন্ধকারে ধরা গলায় প্রশ্ন করেন। সমীরমোহন, এত যে সব বললেন, এ সবই মনগড়া নাকি ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে কিছু।
অবশ্যই আছে, সন্ধ্যার অন্ধকারে চোখদুটি যেন জ্বলে উঠল মৈত্রমশাইয়ের, কিন্তু তার আগে আমার একটি মিনতি আছে দত্তগুপ্ত মশাইয়ের কাছে। আজ রাতটা কি আপনার বাড়িতে কাটাতে পারি?
প্রস্তাবটা এতই আকস্মিক, যে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে গেলেন। নিজে যেচে নিমন্ত্রণ নেওয়ার মতন লোক তো মৈত্রমশাইকে মনে হচ্ছিল না।
তবে সামলে নিলেন প্রফেসার দত্তগুপ্ত, সে তো পরম সৌভাগ্য মৈত্রবাবু।মাধবের অতিথি মানে আপনি আমাদেরও অতিথি… আর আমাদের তো শাস্ত্রেই আছে…
