এতটা একদমে বলে হাঁপাতে লাগলেন মাধব আচায্যি। এতক্ষণ তথাগত হাঁ হয়ে শুনছিলেন,এইবার সমীরবাবু বললেন, তারপর আচায্যিবাবু শোনেনইনি ওঁর ভাইয়ের সেই প্রতিবেশীদের গুরুভাই, কী এক প্রাচীন তান্ত্রিক পুথির খোঁজে এসেছেন মল্লারপুর। আর আচায্যিমশাইকে তো আপনি চেনেনই, যেটা ধরেন, তার একেবারে শেষতক বুঝে থাকেন। ইনিও মৈত্রমশাইকে বগলদাবা করে বালুরঘাটে এনে হাজির।
এতক্ষণে মৈত্রমশাই কথা বললেন, আমারও অবশ্য ইচ্ছে কম ছিল না, এদিকে আসার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের।
তথাগতবাবু প্রশ্ন করেন, কেন বলুন তো? এদিকেও কি তান্ত্রিক পুথি খুঁজছেন নাকি? সে সব বীরভূমের বাইরে কী করে পাবেন? সব তান্ত্রিক পীঠ, মহাশ্মশান, এসবই তো দক্ষিণবঙ্গে। এদিকে তো…
মৃদু হাসলেন মৈত্রমশাই, তান্ত্রিক পুথি খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে তন্ত্রপীঠের যোগ সামান্যই। আর তন্ত্র তো শুধু হিন্দুদের নয়…
মানে? তন্ত্র হিন্দুদের নয় মানে? খ্রিস্টানদের বা মুসলমানদের আবার তন্ত্র আছে নাকি? সংশয় প্রকাশ করেন লাইব্রেরিয়ান অনিন্দ্য ভুক্ত।
না না, সে কথা বলছি না। যদিও সুলেইমানি তন্ত্র বলে একটি ইসলামিক তন্ত্র প্রচলিত, তবে তার সঙ্গে ইসলামের যোগাযোগ নেই বললেই চলে।
মশাই কি তান্ত্রিক নাকি? তন্ত্র সম্পর্কে এত জ্ঞান, এত তান্ত্রিক পুথি খুঁজে বেড়াচ্ছেন… চট করে আচায্যি মশাইকে বলে দিচ্ছেন তেলকল না কিনতে, এদিকে দেখে তো কাঁপালিক বলে মনে হচ্ছে না মশাই। না লাল পট্টবস্ত্র, না হাতে খাঁড়া।কেসটা কী দাদা? জিজ্ঞেস করলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ অতীশ মণ্ডল।
ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠলেন, তারপর হাসিটাসি থামলে বললেন, আরে না না দাদা, আমি তান্ত্রিক নই। তন্ত্র নিয়ে উৎসাহী পাঠক বলতে পারেন। আসলে আমাদের পরিবার বৈষ্ণব, যে সে বৈষ্ণব নয় দাদা, খাস নবদ্বীপের বৈষ্ণব। যদিও আমি নিজে শাক্ত। আমার গুরুর আদেশে তন্ত্র নিয়ে একটু রিসার্চ করছি এই আর কী। ওই গুরুর দেখানো পথেই অল্প সামান্য কিছু তন্ত্রাভ্যাস করা আছে, তাই তেলকলের ব্যাপারটা বলতে পেরেছিলাম।
সবাই হই হই করে উঠল, ওই হল, মানে আপনি আধা তান্ত্রিক। তা দু-একটা নমুনা দেখান না দাদা।
আবার হেসে ফেললেন ভদ্রলোক, এ কী ম্যাজিক দাদা, যে বললেই দেখানো। যায়? একমাত্র মানুষের মঙ্গল করার উদ্দেশ্য ছাড়া গুরুর বারণ আছে এমনি এমনি ক্ষমতা প্রয়োগের। ওতে ক্ষমতা কমে যায়।
তথাগত ঠান্ডা মাথার মানুষ। তিনি ধীর স্বরে প্রশ্ন করলেন, তন্ত্র জিনিসটা হিন্দুদের নয় বলেছেন মৈত্রমশাই, কিন্তু ব্যাখ্যা দেননি। একটু খুলে বলুন না মশাই। নতুন কিছু শিখলেও তো শিখতে পারি।
মৈত্রমশাই খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বলতে লাগলেন,
তন্ত্র জিনিসটা অনেক পুরোনো জানেন। সভ্যতার আদিমে যখন মানুষ প্রকৃতির হাতে অসহায় ছিল, খাদ্য আর জীবনের তাগিদ তাকে তাড়িয়ে বেড়াত, তখন হয়তো যেন সে বেঁচে থাকে, যেন তার খাবার জোটে, তার জন্যেই বিভিন্নভাবে কোনও সর্বশক্তিমানের। কাছে নিজেদের প্রার্থনা নিবেদন করা শিখল। এই নিবেদনের প্রকৃতিটাই তন্ত্র।
ইংরেজিতে এই সব পুরোনো প্রাকৃতিক পূজাপদ্ধতির একটা নাম আছে, অ্যানিমিজম, তন্ত্রের সঙ্গে তার তফাত সামান্যই। সত্যি কথা বলতে কী, সমস্ত প্রাচীন ধর্মগুলিই আসলে ছিল বিভিন্ন প্রাচীন তান্ত্রিক প্রথা, শুধু দেখনদারি বাড়ানোর জন্যে আরও জটিল করে মানুষের সামনে পেশ করা। তন্ত্রের আসল উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য ভগবানের কাছে নিবেদন পেশ করার বিভিন্ন আচার-আচরণ বা পূজাপদ্ধতি মানুষকে বলে দেওয়া, সে ফসল ফলানোর আগে সমবেত নাচও হতে পারে, বা মদ তৈরি করার গোপন পদ্ধতিও হতে পারে। অথবা হতে পারে। গ্রামরক্ষক দেবীর নামে উৎসর্গ করা ষাঁড়টিকে বলি দেওয়া, অথবা অন্য পশু বলি দিয়ে। তার শরীরের প্রজনন অঙ্গগুলিকে চাষের মাঠে ছড়িয়ে দেওয়া।
আমাদের দেশেও হরপ্পা, মহেঞ্জোদারোতে তন্ত্র সাধনার অনেক চিহ্ন পাওয়া যায়। তাই এও বলা যায় যে বৈদিক আর্য সভ্যতা আর এদেশীয় তন্ত্রসভ্যতার মধ্যে তন্ত্রসভ্যতাই বেশি প্রাচীন।
এতটা বলে একটু দম নিলেন মৈত্রমশাই। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনছিলেন তাঁর কথা। সন্ধ্যা হয়ে আসা সত্ত্বেও কারও সে কথা খেয়াল ছিল না।
*********
স্যামের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করার কয়েকদিন সব চুপচাপই ছিল। সেই কদিনে স্যাম আর তার বন্ধুদের প্রোফাইল তন্নতন্ন করে খুঁজেছে তিতলি, ভূতগ্রস্তের মতন। ছেলেটাকে জানার জন্যে, চেনার জন্যে। যত জানছিল, তত মুগ্ধ হচ্ছিল তিতলি। যাদবপুরের ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার, ফাইনাল ইয়ার। চাকরিও পেয়ে গেছে এরই মধ্যে, বন্ধুদের সঙ্গে তার পার্টির ছবিও আপলোড করা আছে।
সঙ্গে কতগুলো ডাইনি টাইপের গা-ঢলানি মেয়ের ছবিও আছে অবশ্য, স্যামের গায়ে গা-ঠেকিয়ে, হা হা হিহিনা করে যেন চলছেইনা। কলকাতার মেয়েগুলো বেহায়া একদম, ওইরকমই ছেলেধরা টাইপের রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ভাবে তিতলি।
স্যামের নামও জানতে পেরেছে তিতলি, স্যমন্তক সেনগুপ্ত।
নাম শুনেই তিতলি আর ভালো লাগা নয়, প্রেমেই পড়েছে ছেলেটার। যেমন করে। সাজু পড়েছিল রূপাইয়ের প্রেমে, রোমিও জুলিয়েটের, দিলওয়ালেতে কাজল শাহরুখের, তেমনই তিতলি প্রেমে পড়ল স্যামের। কথা হয়নি তো কী? দেখা হয়নি তো কী? তিতলির ষোলো বছর বয়সের প্রেম কি ফ্যালনা নাকি? গ্রামের মেয়ে বলে হেলাফেলার বস্তু নাকি তিতলির ভালোবাসা?
