অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন মায়ারানি। দুপুর গড়িয়ে মায়ারানির উঠোনে মিঠে বিকেল নেমে এল। মায়ারানি তাও ঠায় বসে রইলেন। তারপর পাশের বাড়িতে সন্ধেবেলায় তীক্ষ্ম শাঁখ বেজে উঠতে সংবিৎ ফিরে পেলেন তিনি। ধীরপায়ে উঠে আলমারি খুললেন, সবচেয়ে ওপরের কুঠুরির একদম পেছনে হাত চালিয়ে বার করে আনলেন একটা ছোটো চামড়ার ব্যাগ, মৃত সেলস অফিসার স্বামীর শেভিং কিট। তার মধ্যে হাত চালিয়ে তুলে আনলেন ভারী পুরোনো রেজরটা।
তারপর টলতে টলতে গেলেন তাঁর ভাড়ার ঘরে। খুঁজেপেতে একটা নতুন ব্লেড বার করে আধাআধি ভাঙলেন। রেজরে ভরলেন। তারপর একটা বালতি টেনে এনে বিছানার বাঁদিকে রাখলেন। তারপর ঠাকুরঘরের সামনে নির্নিমেষ নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। সবশেষে বিছানায় শুয়ে একবার সামান্য অভিমানভরেই হয়তো বললেন, এ জন্মে বিনা দোষে বড় কষ্ট দিলে ঠাকুর। আমার কিন্তু কোনও অপরাধ ছিল না। দেখো ঠাকুর, পারলে পরের জন্মে ভালো মা বানিয়ে পাঠিও।বলে বাঁহাতটা বালতির মধ্যে রেখে, কব্জির উলটোদিকে রেজারটা প্রায় গেঁথে দিয়ে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে টেনে দিলেন মায়ারানি হালদার।
*********
ঘোরের মধ্যে ছিল তিতলি। এমনও হয়? রূপকথা আজও ঘটে? এভাবেও প্রেমে পড়া যায়?
গত বছরেই ভালো রেজাল্ট করে বাবাকে বলে একটা দামি স্মার্টফোন পেয়েছে তিতলি। আর ফোন পাওয়া মাত্রই সিম কার্ড, ডেটা প্ল্যান ইত্যাদি গজাবি সেট করেই ফেসবুক! আর মুহূর্তের মধ্যে তিতলির সামনে যেন পুরো দুনিয়াটা দরজাকবাট খুলে তার গ্রামের বাড়ির উঠোনে চলে এল। লক্ষ্ণৌয়ের মনামাসি, বম্বের বুলুকাকা, কলকাতার রত্নাপিসিমা, আরও অনেকে; তারপর ওর স্কুলের সিনিয়র শবনমদিদি যে জয়েন্ট পেয়ে কলকাতায় যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছে সব্বাইকার সঙ্গে রোজ রোজ কথাবার্তা হা হা হি হি। কে বলে পৃথিবীটা এত বড়? এই তো সেদিন ব্যাঙ্গালোরের। অনিদা প্যারিস গেল, তারপর কত্ত কত্ত ছবি আপলোড করল, দেখে দেখে তো তিতলির আর আশ মেটে না।
শুধু কি আত্মীয় আর বন্ধুবান্ধব? তা ছাড়াও তাদের বন্ধু, কত গায়ক, নায়ক লেখক, সব্বাই যেন কত হাতের কাছে চলে এসেছে জাদুকাঠির ছোঁয়ায়।
এই করতে করতে একদিন তিতলি দেখে অচেনা একটি ছেলের থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, নাম স্যাম।
প্রোফাইল পিকচারটা দেখে থমকে গেল তিতলি, আইব্বাস, পুরুষ মানুষ এত সুন্দরও হয়? দারুণরকম দেখতে তো ছেলেটাকে।
ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা অ্যাক্সেপ্ট করেই ফেলল তিতলি।
*********
পরেরদিন বিকেলে লেকের আড্ডায় গিয়ে এক ছোটোখাটো টাকমাথা সৌম্যদর্শন। প্রৌঢ়কে দেখে একটু আশ্চর্যই হলেন বালুরঘাট কলেজের দর্শনের প্রাক্তন অধ্যাপক তথাগত দত্তগুপ্ত। দেখা হতেই তার বন্ধুরা হই হই করে ডেকে নিলেন।আলাপটা অবশ্য অবসরপ্রাপ্ত আমলা সমীরমোহনই করালেন।আসুন গুপ্তদা, আলাপ করিয়ে দিই।ইনি মিস্টার মৈত্র, আর ইনি প্রফেসার দত্তগুপ্ত। প্রফেসর সাহেব কিন্তু বিখ্যাত লোক মিস্টার। মৈত্র, অনেকদিন ফিলোজফি পড়িয়েছেন কলেজে। এঁর কাছে কিন্তু বিশেষ জারিজুরি খাটবে না আপনার, এই বলে দিলুম।
মৃদু হেসে যুক্তকরে নমস্কার করলেন তথাগতবাবু। মাথা সামান্য নিচু করে প্রতিনমস্কার করলেন নবাগত প্রৌঢ়টি। সাদা ট্রাউজার্স, কমলা রঙের হাফশার্ট আর সাধারণ এক জোড়া বাটার জুতো পরে আছেন ভদ্রলোক। সম্পূর্ণ ন্যাড়া মাথায় সামান্য একটি টিকির আভাস, যা আজকালকার বাঙালিদের মধ্যে দেখাই যায় না। তবে সমস্ত শরীরে যেটা নজর কাড়ে, খেয়াল করলেন তথাগত, সেটা হচ্ছে চোখদুটি।আশ্চর্য শান্ত মায়াময় অথচ উজ্জ্বল চোখদুটি, দেখেই মনে হয় বুদ্ধিমান ভালো লোক। ভদ্রলোককে মনে মনে বেশ পছন্দই হয়ে গেল তার।
নতুন এলেন নাকি এখানে? স্মিত হেসে প্রশ্ন করলেন প্রফেসার দত্তগুপ্ত।
আরে ন্না ন্না, গেসলাম বীরভূমের মল্লারপুর, মাঝখানে প্রায় ঝাঁপিয়েই পড়লেন। অকৃতদার, সম্পন্ন ব্যবসায়ী মাধব আচার্য, ভাইয়ের ওখানে, বুইলেন।একটা তেলকল সস্তায় পাচ্ছিলাম কিনা, ভাবলাম কিনে রাখি। তা একদিন সকালে উঠে দাঁত মাজতে মাজতে রাস্তায় হাঁটছি, দেখি ইনি পাশের বাড়ির বাগানে একটা বেদিতে বসে ধ্যানট্যান করছেন। আমি তো মশাই, আপনারা জানেন, সারা জীবন টাকাপয়সা ছাড়া অন্য ব্যাপারে কিছু ভাবিনি। তা পাপীতাপী মানুষ, ভাবলুম দেখে নিই ধ্যানট্যান কী করে করতে হয়, রাত্তিরে হিসেবটিসেব করে খেয়েদেয়ে মশারি টশারি ফেলে প্র্যাকটিস করব না হয়। ওমা, খানিকক্ষণ পর ইনি হঠাৎ চোখটোখ খুলে বলেন, তেলকলটা কিনবেন না, ওতে অভিশাপ আছে। আমার তো মশাই ঠকাস করে হাত থেকে টুথব্রাশটা পড়ে নর্দমায় ভেসে চলে গেল। আমি তেলকল কিনব ইনি কী করে জানলেন? পাশের বাড়ির সঙ্গে আমার ভাইয়ের তো বাক্যালাপই নেই, ওদের জানার প্রশ্নই ওঠে না। তারপর ভাবলুম। বাজারে তো কথা উড়ছেই, ইনি হয়তো সেখান থেকে জানবেন। যাই হোক, পনেরো। টাকার টুথব্রাশটা গচ্চা দিয়ে বাড়িতে এসে ছানটান করে খেতে বসিচি কী বসিনি, ওম্মা, খবর পেলুম সেই তেলকলে নাকি পুলিশ এসেছে। কী ব্যাপার? আমি তো মশাই ধাঁ! তারপর ছুটে গিয়ে দেখি তেলকলের মেঝে খুঁড়ে পুলিশ একটা মেয়ের লাশ তুলছে। সে কী ওয়াক তোলা গন্ধ মশাই! জানা গেল মালিক নাকি তার ছেলের বউকে মেরে পুঁতে দিয়ে তেলকলটা আমার ঘাড়ে চাপাবার চেষ্টায় ছিল, বিয়ের দেনাপাওনা নিয়ে কারবার… আমি তো মশাই ছুট্টে গিয়ে এঁয়াকে বল্লম, আপনাকে ছাড়ছি না দাদা!
