নিচ হয়ে এদিকওদিক দেখলেন। না নেই, কোথাও তার চিহ্ন নেই। হঠাৎ করে আজানা আশঙ্কায় বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল আর অমঙ্গল আশঙ্কায় স্তব্ধ হয়ে গেলেন মায়ারানি, শাশুড়ির বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল।
বংশলোপ।
জানেন না মায়ারানি সে কোথায়, কীরকম আছে। দশ বছর হয়ে গেল, তার মুখদর্শন করেননি তিনি।
দশ বছর আগেকার এক অভিশপ্ত দুপুর যেন উত্তপ্ত আগুনের ঝলকের মতন মায়ারানির স্মৃতিসত্তা নাড়িয়ে দিয়ে গেল।
পুজো করছিলেন মায়ারানি, সেদিন নীলষষ্ঠীর ব্রত ছিল। যতই কুপুত্র হোক, মা সবসময়ই সন্তানের ভালো চান, তাই সেইদিনও করজোড়ে প্রার্থনা করছিলেন; এমন সময়ে উঠোনে বিপুল হট্টগোল, চিৎকার চেঁচামেচি আর কান্নার আওয়াজ পেয়ে বেরিয়ে আসেন।
এসে দেখেন তাঁর উঠোনে প্রায় সারা পাড়া ভেঙে পড়েছে। তার সামনে রণরঙ্গিণী মূর্তিতে হরেন গোঁসাইয়ের বউ, তার হাতে ধরা হরেন গোঁসাইয়ের বড় মেয়ে, তেরো বছরের মাম্পি। মাম্পি বোধহয় স্নান করছিল, ক্রুদ্ধা গোঁসাইগিন্নি সেই অবস্থাতেই ভিজে টেপজামার ওপর একটা গামছা জড়িয়ে টেনে এনেছেন মেয়েটাকে। ঘটনার অভিঘাতে, লজ্জায় আর ভয়ে থরহর করে কাঁপছে মেয়েটা। গোঁসাইগিন্নির অবশ্য তাতে হুঁশ নেই, তিনি চিল চিৎকারে পাড়া মাথায় তুলেছেন, ছি ছি ছি, পাড়ার মধ্যে বাস করা দায় হয়ে উঠল দেখছি।বেআদব বদমাশ ছেলে, ছি ছি ছি। এত দিন মেয়েদের স্নান করার সময় উঁকি ঝুঁকি দিতিস, সাহস বাড়তে বাড়তে কোথায় উঠে ঠেকেছে দ্যাখো… ঘরে ঢুকে সোমত্ত মেয়েকে… বলি এমন ছেলেকে আঁতুড়েই নুন খাইয়ে মেরে ফেলতে পারোনি মেজোবউ… ছি ছি…
মায়ারানি প্রথমে হকচকিয়ে গেছিল, তারপর সামান্য সামলে নিয়ে বিস্মিত স্বরে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে দিদি?
আর দিদি বলে ডেকো না ভাই। দেখো তোমার গুণধর সুপুত্তুরের কাণ্ড। মাম্পি চান করতে বাথরুমে ঢুকেছে, সেই সুযোগে তোমার ছেলে বাইরে থেকে কাঠি দিয়ে ছিটকিনি খুলে ভেতরে ঢুকে… ছি ছি ছি… তোকে না দাদা দাদা বলে ডাকত, হ্যাঁ? সেদিনও মাসিমা মাসিমা করে ডেকে লুচি আর পায়েস খেয়ে গেলি… ছি ছি ছি… দুধ দিয়ে কী কালসাপই না পুষেছ ভাই… কী শিক্ষাই না দিয়েছ… এ পাড়ায় বাস করা কিন্তু ঘুচিয়ে দোবো, আমাকে চেনো না…
পাথরের মতন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মায়ারানি, আর তার ভেতরটা পড ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। আজ অবধি না তার মা-বাবা, না শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী, কেউ তাকে একটা কটু কথা বলতে পারেননি, এমনই শান্ত অথচ দৃঢ় স্বভাব মায়ারানির।সত্য ব্যবহার ও স্পষ্ট উচ্চারণের জন্যে পাড়ায় লোকে তাঁকে ভয়ও করে, ভালোও বাসে। আজ সারা জীবন ধরে তিল তিল করে জমানো মান ইজ্জত সব যেন তাসের ঘরের মতন তাঁর চারিপাশে ভেঙে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল যেন গোঁসাইগিন্নি সর্বসমক্ষে তাঁর শাড়ি টেনে খুলে উলঙ্গ করে দিচ্ছে।
সে কোথায়?
অবিশ্বাস্য শান্তস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন মায়ারানি। সারা উঠোন মুহূর্তে চুপ করে গেল। শুধু গোঁসাইগিন্নি থুতু ফেলে মুখ বাঁকিয়ে বললেন, যাবে কোথায়, দ্যাখো গে, আবার কোথায় মুখ মারতে গেছে। কুকুরের লেজ কি আর…।
যদি তাকে দেখতে পাও কেউ, বলে দিও, যদি বেঁচে থাকতে চায়, এ বাড়িতে যেন আর না ফেরে।এইদণ্ডে আমি ওকে ত্যজ্য করলাম, আমি ওকে আমার ছেলে বলে। আর মানি না, এই পরিবারের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক নেই ওর। আর তুমি ঘরে যাও দিদি।মাম্পির কাছে আমি গিয়ে পা ধরে ক্ষমা চেয়ে আসব না হয়, এখন আর শাপমণ্যি করে বাড়ি যাও। কেউ যদি কখনও জানতে পারো ও মরে গেছে, আমাকে জানাবে।, আর যদি আমি মরে যাই, ওকে খবর দেবে না, আজ থেকে ও হালদার বাড়ির কেউ। নয়। এই বলে ধীরপায়ে ঘরে ঢুকে খিল দিলেন মায়ারানি।
পাড়ার সবাই যে যার নিজের ঘরে ফিরে গেল। এবং সেইদিন থেকে টেনিয়া আর বাড়ি ফেরেনি। আর কোনওদিনই তার মুখ দেখেননি মায়ারানি।
বংশলোপ।
মায়ারানি জানেন যে একমাত্র তিনি আরার ছেলে ছাড়া হালদারবাড়ির আর কেউ বেঁচে নেই। হালদার পরিবারের যারা চট্টগ্রামে থেকে গেছিল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের আক্ষরিক অর্থেই কুচি কুচি করে কেটে সারা বাড়িতে ছড়িয়ে রেখে সারা গ্রামকে ডেকে দেখানো হয়েছিল যে নাপাক হিন্দুদের কী শাস্তি হওয়া উচিত। দেড় বছরের শিশুও রেহাই পায়নি। তারপর সারা বাড়িতে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাজাকার আর হিংস্র পাকবাহিনী।
মাঝেমধ্যে মনে হত মায়ারানির–হয়তো একদিন সে ফিরবে, ভালো হয়ে ফিরবে। কোনও এক অলৌকিক মধ্যরাতে এসে চুপিচুপিমাকে ডেকে বলবে, মা, আমি ভালো হয়ে গেছি, চলো অন্য কোথাও গিয়ে থাকি। সে রকম কখনও হলে মায়ারানি হয়তো একবস্ত্রেই চলে যেতেন। কতদিন স্তব্ধ দুপুরে খেতে বসে বাইরে কারও আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠতেন, সে এল নাকি ফিরে?।
কী করতেন মায়ারানি সত্যি যদি সে ফিরে আসত? কী করতেন? কে জিতত? মাতৃহৃদয় নাকি ন্যায়বিচার?
আজ যখন জানলেন মায়ারানি হয়তো আজই তার শেষ দিন, তখন কেমন যেন মনে হচ্ছে মাতৃহৃদয় জিতলেও জিতে যেতে পারত। অন্তত মরে যাবার আগে একটিবার দেখতে পেতেন। বাপের বাড়ি বলে অনেকদিনই কিছু নেই তার। শ্বশুর গেলেন, স্বামীও। তারপর শাশুড়িও। এখন ছেলেকে হারিয়ে কী নিয়ে বাঁচবেন মায়ারানি? কীসের আশায়?
