পালবংশের উন্নতি হোক। সামান্য তিনটি গ্রামীণ কন্যার জন্যে স্বয়ং মহামাত্য ছুটে এসেছেন…
স্থানীয় মহাপ্রতিহারের সঙ্গে কয়েকজন দণ্ডপাশিকা বা দণ্ডশক্তি পাঠালেই হত। কিন্তু আশেপাশের গ্রাম থেকে এই কন্যাশিশুচুরি এবং সোমপুর মহাবিহারের ভিতর তাদের গোপনে নিয়ে আসার অভিযোগ বেশ কয়েকদিন ধরে স্থানীয় মহাসামন্তের দ্বারা আমাদের কর্ণগোচর হচ্ছিল। যেহেতু পালবংশের গৌরব সোমপুর মহাবিহারের সঙ্গে জড়িত, তাই আমাকে নিজে আসতে হয়েছে ভন্তে। এইবার জবাব দিন, কন্যা তিনটি কোথায়? আর এরকম আচরণের কারণ কী?
মুহূর্তে মুখের ভাব বদলে যায় সেই বিশালদেহী পুরুষটির। সারা মুখে ছড়িয়ে পরে অদ্ভুত এক শান্তি, কন্যা নয় মহামাত্য, তারা এখন মহান হেরুক ও বজ্রবারাহীর পদতলে অতি পবিত্র তিনটি অর্ঘ্য, তিনটি স্বয়ম্ভকুসুম।
চোয়াল দৃঢ় হল বোধিভদ্র ও রত্নাকরশান্তির। রজঃস্বলা বা ঋতুমতী কন্যাকে এই নবোত্থিত মন্ত্রযানমতে বলা হয় স্বয়ম্ভকুসুম। সোমেশ্বর অতশত বুঝলেন না, শুধু গলা চড়িয়ে বললেন, অর্ঘ্য মানে? কী উন্মাদের প্রলাপ শুরু করেছেন ভন্তে?
বিশাল পুরুষটি এইবার পূজার স্থল থেকে পুরোপুরিভাবে সরে দাঁড়ালেন। আর সেইক্ষণে তিনজনেই ক্রোধে, আতঙ্কে, বিবমিষায় স্থির হয়ে গেলেন।
সেই চিত্রাঙ্কিত বস্ত্রটির একদম নিচে একটি ফলক রাখা আছে। তাতে কয়েকটি শরীর উৎকীর্ণ। লাল রঙের সেই ফলকটি সিঁদুর ও চন্দনচর্চিত, সামনে কিছু ফুল পড়ে আছে। তার সামনে ভূমির ওপর জটিল একটি জ্যামিতিক ছবি আঁকা। যন্ত্র অঙ্কনে দুই পণ্ডিতপ্রবরেরই বিশেষ সিদ্ধি আছে, কিন্তু তাঁরাও বুঝতে পারলেন না, এতই জটিল সে যন্ত্র। অবশ্য তাঁরা বুঝবার মতন অবস্থাতেও ছিলেন না।
সেই যন্ত্রচিত্রটির মধ্যস্থানে একটি তাম্রপত্রের ওপর ত্রিভুজাকারে সাজিয়ে রাখা তিনটি সদ্যকর্তিত ছিন্ন শিশুবালিকামুণ্ড!
ক্রোধে ক্ষোভে দিশাহারা বোধিভদ্র কাঁপতে কাঁপতে দক্ষিণ হস্তের তর্জনী তুলে বললেন, ওরে নরাধম পাষণ্ড, এ কী করেছিস? তিনটি অসহায় বালিকার বলি দিয়ে ভাবছিস অহৎ হবি? বোধি লাভ করবি? হায় শাক্যসিংহ, হায় অবলোকিতেশ্বর, দেখে যাও, তোমাদের প্রচলিত সদ্ধর্মের নামে কী মহাপাপ করেছে এই বর্বর। ওরে পাপিষ্ঠ, নিরীহ প্রাণীহত্যায় ভেবেছিস পুণ্য হবে তোর?নরকভোগ হবে তোর, অক্ষয় নরকভোগী হবি তুই। মহাপণ্ডিতাচার্যের হাহকার সারা গর্ভগৃহে ছড়িয়ে পড়ল।
অবাকই হলেন নাকি বজ্রকেতু, সে কী পণ্ডিতপ্রবর? নরবলি তো মহাবলি, মন্ত্রযানে এর থেকে বেশি পুণ্যকর্মের রাস্তা আর কিই-বা আছে? আপনারা কি সিদ্ধাচার্য। কাহ্নপাকে নিয়ে সদ্যঘটিত কাহিনিটি শোনেননি? মেখলা আর কনখলা নামের দুটি। মেয়ে…..
ওরে পাপমতি মূঢ়, ও কাহিনি সত্য নয়, রূপক মাত্র। জ্ঞানখঙ্গে নিজের অহঙ্কার। বলি দেওয়ার রূপক, আর্তনাদ করে উঠলেন রত্নাকরশান্তি, আর তুই তাকে সত্যি ভেবে তিনটি নিরীহ শিশু বধ করলি? হায় প্রভু শাক্যসিংহ, হায় পঞ্চবিংশতি বোধিসত্ত, হায় প্রভু অবলোকিতেশ্বর, দেখো, তোমাদের সদ্ধর্মের কী নিদারুণ অধঃপতন।
নিজের অসি কোষমুক্ত করলেন সোমেশ্বর গর্গ, ক্রোধে তাঁর সর্বাঙ্গ কাঁপছিল, দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন, একবার শুধু অনুমতি দিন স্থবিরশ্রেষ্ঠ, এই নরপশুটির বোধিলাভের ইচ্ছেটা জন্মের মতন ঘুচিয়ে দিই।
হাত তুলে মহামাত্যকে নিরস্ত করলেন মহাস্থবির, কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে অস্ফুটে। কিছু উচ্চারণ করলেন, তারপর দক্ষিণহস্ত সামনে প্রসারিত করে, তর্জনী ও কনিষ্ঠা দুটি উত্তোলিত অবস্থায় রেখে বৃদ্ধাঙ্গুলিটি দিয়ে অন্যান্য অঙ্গুলিগুলি বদ্ধ করে করণমুদ্রা। ধারণান্তে গম্ভীর গলায় বললেন, শোন রে পাপমতি ক্রুরাত্মা, এই পবিত্র মহাবিহারে। আমি আর নরহত্যা হতে দেব না, তাই তোকে মহামাত্যের হাতে সমর্পণ করলাম না। এইদণ্ডে তুই দূর হয়ে যা, তোকে পাল সাম্রাজ্যের বাইরে নির্বাসিত করা হল। হরিকেল থেকে অঙ্গ, তাম্রলিপ্ত থেকে প্রাগজ্যোতিষপুর, সমগ্র সমতট বা পৌণ্ড্রবর্ধন, কোথাও। কোনও ভূমিতে যেন তোর অপবিত্র ছায়া অবধি না পড়ে, হরিকেলের এদিকে যেন তোর ওই পাপিষ্ঠ মুখ কেউ না দেখে। আরও শুনে রাখ, আজ থেকে তোর বংশকে। আমি দেবী একজটার নামে অভিশপ্ত ঘোষণা করলাম। তোর বংশে প্রতি পুরুষে একটি করে বদ্ধ উন্মাদ শিশু জন্মাবে যার জন্যে তোর বংশাবতংসদের অশেষ দুঃখ ও ক্লেশ। স্বীকার করতে হবে। এই ভাবে একহাজার বছর ধরে এই জ্বালা ভোগ করার পর তোর পুনর্জন্ম হবে, আর সেই জন্মে দেবী বজ্রবারাহী নিজহস্তে তোর পাপ নাশ করবেন। যে পাপিষ্ঠ ফলকটির সামনে এই ঘৃণ্য পাপকর্মটি করেছিস, তাকেও অভিশাপ দিলাম। একহাজার বছর ধরে এই অভিশপ্ত ফলক তোদের বংশে পূজিত হতে থাকবে আর। তোদের এই অভিশাপের কথা মনে করিয়ে দিতে থাকবে। যেদিন এই ফলক স্বেচ্ছায়। আমার বংশের কারও কাছে ফিরে আসবে, সেদিন জানবি তোদের পাপভোগের শেষ। সেইদিন তোর বংশধারা লোপ পাবে এবং তোর যাবতীয় পাপের বিনাশ হবে। ততদিন পর্যন্ত তোর মুক্তি নেই, নেই, নেই।
***********
মায়ারানি খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন ফাঁকা বাক্সটার দিকে। কেউ নিয়ে গেছে এই বাক্স তা হতেই পারে না, কারণ এই পরিবারের বাইরে কেউ এর অস্তিত্বই জানে না। আগেরবার নিজে পূজা করে নিজের হাতে তুলে রেখেছিলেন, স্পষ্ট মনে আছে।
