হৃষ্ট মনে গিন্নিমা ফলকটা নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে বললেন, চল তা হলে, মায়ের যখন ইচ্ছে।
অতসী ফিরে যাবার সময় দেখল ছাদে দাঁড়িয়ে চাপা লজ্জারুণ মুখে মোবাইলে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে তিতলি।
*********
একটা দীর্ঘ গুপ্তপথ পেরিয়ে তিনজনে যখন সেই পথের শেষে এসে দাঁড়ালেন তখন তাদের সামনে এক বিশাল গর্ভগৃহ। তার চারিপাশের দেওয়ালে মশাল গুঁজে রাখার ফলে স্থানটি ঈষৎ আলোকিত।
প্রবেশপথের একদম উল্টোদিকের দেওয়ালে লম্বমান একটি চিত্রিত বস্ত্রখণ্ড। তার সামনে, প্রবেশপথের দিকে পিঠ করে বসে একটি বিশাল শরীর, তার উর্ধ্বাংশ অনাবৃত, নিম্নংশে গেরুয়া পট্টবস্ত্র।তার পাশে বিনীতভাবে দাঁড়ানো একটি শরীর, এই সোমপুরা মহাবিহারের একজন শ্রমণ, ভিক্ষু শিবাপা!
চিত্রিত বস্ত্রখণ্ডটিতে যে চিত্রটি অঙ্কিত, চকিতে দেখলে অতিবড় সাহসীরও বুক কেঁপে উঠবে।
চিত্রের মধ্যস্থলে এক ভয়ালদর্শন কালদংষ্ট্রাবিশিষ্ট নীলবর্ণ পুরুষের ছবি। ভয়াবহ আরক্ত চোখদুটি যেন বাইরে বেরিয়ে এসেছে অসীম ক্ষুধায়। তার মাথায় রত্নখচিত বহুমূল্য মুকুট অঙ্কিত। মুখমণ্ডল সামান্য উন্মুক্ত, তার মধ্যে দিয়ে তাঁর শ্বদন্তদুটি প্রকট। গলায় মুণ্ডমালা, বদনমণ্ডল ক্রোধাবেশে উদ্ভাসিত এবং কেশরাজি অগ্নিশিখার ন্যায় ঊর্ধ্বগামী। ইনি আলীঢ় পদে, অর্থাৎ দক্ষিণ পদ অগ্রবর্তী করে এবং বামপদ পিছনে মুড়ে নীচে এক যুগনদ্ধ মূর্তিকে পদদলিত করছেন।
শ্ৰীরত্নাকরশান্তি ও বোধিভদ্র জানেন ওই যুগনদ্ধ মূর্তি কার।
ভৈরব ও কালরাত্রি!
এখানেই শেষ নয়, এক উলঙ্গিনী দেবী, যাঁর গাত্রবর্ণ রক্তের ন্যায় লাল, তিনি এই নীলবর্ণ পুরুষের বাম ঊরুর ওপর আসীনা, তার মুখ সেই ভয়াল পুরুষটির মুখের কাছে, দেবীর শুধুমাত্র উন্মুক্ত পশ্চাৎদেশটি দৃশ্যমান এবং শুধুমাত্র বামপার্শ্বেরমুখমণ্ডলটি উদ্ভাসিত। আহা, কী ক্রোধোদ্দীপ্ত, কী ভয়ংকর সেই মুখমণ্ডল! তারও বামপদ সেই ভৈরব ও কালরাত্রির যুগনদ্ধ মূর্তির উপর স্থাপিত। নীলবর্ণ সেই ভয়াল পুরুষটির ঘাড় জড়িয়ে দেবীর দুটি হাত, এক হাতে উদ্যত কর্তরী, আরেকহাতে রক্তপূর্ণ করোটি। আর দেবীর মাথার পাশ থেকে একটি বরাহমুখ নির্গত হয়ে রয়েছে।
এর সামনে যে বিশালকায় পুরুষটি বসে ছিলেন, তিনি হ্রীঃ হ হ হুঁ হুঁ ফট বলে সেই বিশাল চিত্রাঙ্কিত বস্ত্রখণ্ডের উপর কিছু রক্তচন্দনচর্চিত পদ্ম ছুঁড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে মহাস্থবির রত্নাকরশান্তি গম্ভীরস্বরে বলে উঠলেন, এই সময়ে এত গোপনে আপনি কীসের সাধনায় রত ভন্তে বজ্রকেতু, জানতে পারি?।
সেই বিশালদেহী পুরুষটি চমকে ঘাড় ঘোরালেন, চমকে উঠলেন ভিক্ষু-শিবাপা।
উঠে না দাঁড়িয়ে, ঘুরেই গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন বিশাল পুরুষটি, চক্ৰসম্বর। হেরুকের আরাধনা তো আপনার অজানা নয় স্থবিরশ্রেষ্ঠ, আর চক্ৰসম্বর হেরুক ও দেবী বজ্রবারাহীর যুগনদ্ধ মূর্তি কি আপনার মতন পণ্ডিতের অদেখা? ইনি দেব সপ্তাক্ষর। দেবী বজ্রবারাহী…..
রূঢ় কণ্ঠে তাকে থামিয়ে দেন সোমেশ্বর গর্গ, উঠে দাঁড়ান ভন্তে, ওইভাবে কারও সঙ্গে কথা বলা ভব্যতাবিরুদ্ধ, সে কি আপনি জানেন না?
এইবার সম্পূর্ণ উঠে দাঁড়ালেন সেই দীর্ঘকায় বলশালী পুরুষটি। এদিকে ফিরে তাকাতে প্রকাশ পেল তার পেশীবহুল চেহারা। মাথায় অবিন্যস্ত কেশরাশি জটাকারে চূড়া করে বাঁধা, শ্মশ্রুগুম্ফময় মুখ। তবে সবচেয়ে দর্শনীয় বুঝি চোখদুটো।
মনে হয় যেন সহস্র বছরের আদিম ক্রুরতা সেই চোখের অতলে লুকিয়ে আছে, লুকিয়ে আছে আগ্নেয়গিরির মতন। বিষধর কালনাগিনী যেন ফণা তুলবে যে কোনও মুহূর্তে, কিন্তু আপাতত শীতল বিষের সঞ্চয় নিয়ে সে অপেক্ষমান।
সামান্য কৌতুক কি খেলে গেল বজ্রকেতুর মুখে? সাড়ম্বরে মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, প্রণত হই মহামাত্য গর্গ। কী সৌভাগ্য, আচাৰ্য্য বোধিভদ্রও উপস্থিত দেখছি। অধীনের প্রতি কী আদেশ প্রভু?
প্রশ্ন তো আগেই করেছি ভন্তে বজ্রকেতু। এই সময়ে এত গোপনে সপ্তাক্ষর। বজ্রবারাহীর পুজোর কী প্রয়োজন? সোমপুর মহাবিহারের যে কোনও চৈত্যে বা প্রকোষ্ঠে। আপনি এ পূজা করতে পারতেন ভন্তে। শান্ত গলায় প্রশ্ন করলেন রত্নাকরশান্তি।
মন্ত্রযানে আসনসিদ্ধির উপায় ও প্রকরণ যে একান্ত গোপনীয়, হে মহাস্থবির।
কীসের এত গোপনীয়তা বজ্রকেতু? সামান্য অস্থির গলায় প্রশ্ন করলেন বোধিভদ্র, সোমপুর মহাবিহার সম্পূর্ণত সদ্ধর্মের মহাযানপন্থা অবলম্বন করে। যেখানে বোধিসত্ব অবলোকিতেশ্বরের পথানুসারে বহুজনসুখায় বহুজনহিতায়। করুণাবিতরণ করে জগতের উদ্ধারই একমাত্র লক্ষ্য। যদি ব্যক্তিগত সম্বোধিই একমাত্র লক্ষ্য হয়, ধর্মকায়ে এবং তথতায় যদি একাই আগত হতে চান, তা হলে মহাযানপন্থা। আপনার পথ নয় ভন্তে, আপনি থেরবাদী, স্বার্থপরহীনযানী।আপনি কীসের আকাঙ্ক্ষায়। ব্যক্তিগত সিদ্ধির পথ বেছে নিলেন ভন্তে বজ্রকেত? এত গোপনীয়তা কীসের? প্রভু শাক্যসিংহ তো আমাদের এই রাস্তা দেখাননি ভন্তে।
আহ, তত্ত্বকথা রাখুন পণ্ডিতাচার্য, আমার প্রশ্নের উত্তর চাই। ভন্তে বজ্রকেতু, আমার চরেরা খবর দিয়েছে একটু আগে পাশের গ্রাম থেকে আপনি আর আপনার এই অনগত শ্ৰমণ শিবাপা মিলে তিনজন শিশুকন্যা চুরি করে এনেছেন। তারা কোথায়? সোজা প্রশ্ন সোজা ভাবে করাই মহামাত্য সোমেশ্বর গর্গের বৈশিষ্ট্য।
