একখান কথা কই মায়া, কারোরে কইবা না। আমাগো পরিবারের উফর একখান অভিশাপ আসে।
আমাগো কোনো এক পূর্বপুরুষকী একখান নাকি খুবনীচ পাপকাজ কইর্যা রাজার। আদেশে দ্যাশান্তরি হন। হেই থিক্যা আমাগো ফেমিলিতে থাইক্যা থাইক্যা একখান কইর্যা অপদ্যাব জন্ম নেয় আর তার মায়ে বাপেরে অ্যাক্কেরে শ্যাষ কইর্যা ফালায়, এই হইল গিয়া আমাগো শাস্তি। এইখান সাবধানে রাখবা তা হইলে আমাগো বংশধারা। থাইক্যা যাইব অনে, শাস্তি ভোগ কইরাও। সাবধানে রাখবা, কারোরে দ্যাহাইবা না। মাইয়ালোগ ছাড়া এয়ার পূজা করায় নিষেধ আসে। অমাবস্যাতিথিতে পূজা দিবা।
পূজার বিধি কী মা? জানতে চেয়েছিলেন মায়ারানি।
পূজাবিধি বলে দেওয়ার পর খানিকক্ষণ চুপ করেছিলেন সেই বৃদ্ধা, তারপর ফিসফিস করে বলেন, যদি কোনওদিন এইডা নিজে নিজে হারাইয়া যায়, খোঁজবা না। জানবা হালদার বংশের শ্যাষ সময় উপস্থিত, হেইদিনই আমাগো বংশলোপ অইবো, হালদার ফেমিলির কেউই আর বাঁইচ্যা থাকবনা।এক মহাপুরুষ আইস্যা এঁয়ারে উদ্ধার কইর্যা লয়্যা যাবেন। হেইডাই হইলো গিয়া আমাগো ফেমিলির মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত।
সামান্য কেঁপেই উঠেছিলেন মায়ারানি, কার কেন কীসের অভিশাপ তা কেউই লিখে রাখেননি, কেউই জানেন না, তাঁর শাশুড়িও নয়। শুধু কে জানে কবে থেকে এই অভিশপ্ত পরিবার বসে আছে পুরুষে পুরুষে অপরাধ ভোগ করার জন্যে আর বংশধারা লোপ করে শাপমুক্তির জন্যে! কত নৃশংস সেই পাপ যে হাজার বছর তার জের টেনে যেতে হয়?– ইনি কে মা? কোন দেবতা?ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন মায়ারানি। শাশুড়ি বলেছিলেন, দেবতা নয়, দেবী। তবে, ইনি কে কইতে পারুম না। অনেক পুরুত মশাইরে জিগাইসি বন্ননা কইর্যা, কেউই কইতে পায় নাই। রক্ষা কইরো এনারে। খুবই জাগ্রত দেবী, অবহেলা কইরো না।
এর কয়েক দিন পরেই শাশুড়ি চোখ বোজেন। তখন মায়ারানির বয়েস সাঁইত্রিশ।
আর তার একমাসের মধ্যেই ঘটে যায় সেই দুর্ঘটনা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মায়ারানি। দশ বছর হয়ে গেল, এখন তার বয়েস হওয়ার কথা। ছাব্বিশ। কে জানে কোথায় আছে, কেমন আছে।
চওড়া বাক্সটা বার করে ডালাটা খোলেন মায়ারানি, আর তারপর আতঙ্কে, ভয়ে। আর বিস্ময়ে নীল হয়ে যান।
বাক্সটা খালি!
*********
বালুরঘাটের বিবেকানন্দ পাড়ায় দত্তগুপ্ত গিন্নির সুনাম আছে ধর্মপ্রাণা মহিলা বলে। ভদ্রমহিলা ঝাড়া হাত পা; ছেলে মেয়ে দুজনেই বিবাহিত, বাইরে চাকরি করে। স্বামী ভদ্রলোকটি ভারী ভালোমানুষ, বহুদিন বালুরঘাট কলেজে দর্শন পড়িয়েছেন। ফলে কাগিন্নির ইহজীবনের জাগতিক দায়দায়িত্ব আপাতত শেষ। মাঝেমধ্যে ছেলের কাছে মুম্বাইতে বা মেয়ের কাছে ব্যাঙ্গালোরে ঘুরে আসা, গান শেখানো, গিন্নিদের দ্বিপ্রহরিক আলাপ, কার অবসরপ্রাপ্ত বন্ধুদের নিয়ে বৈকালিক আড্ডা দেওয়া, এই নিয়েই কেটে যাচ্ছে। তবে গিন্নিমার দিনের বেলায় প্রায় পুরোটাই যায় ঠাকুরসেবায়। দত্তগুপ্ত গিন্নির বিশাল ঠাকুরঘরে খুঁজলে নাকি তেত্রিশ কোটি দেবতার কমকরেহলেও অন্তত অর্ধেককে পাওয়া যাবেই, পাড়ায় প্রচলিত প্রবাদ। এছাড়াও ভদ্রমহিলা দরিদ্র প্রতিবেশীদের প্রয়োজনে দেখেন, পাড়ার কয়েকটি শিশুর পড়াশোনার ব্যয়ভার চালান, সব মিলিয়ে। বেশ জনপ্রিয়ই বলা চলে।
অতসীর এ বাড়িতে যাতায়াত ছোটবেলা থেকেই। বস্তিবাড়ি থেকে প্রায় কুড়িয়ে এনে একে মানুষ করেছিলেন গিন্নিমাই। নইলে নেশাখোর বাপ আর বহুগামিনী মায়ের সংসারে যে এতদিনে সে ভেসে যেত, সেটা অতসী ভালো করেই জানে। লেখাপড়া বেশি হয়নি অতসীর। আঠারো বছর বয়সে খানিকটা গিন্নিমার সঙ্গে জোরাজুরি করেই সে ভোম্বলকে বিয়ে করে। সে বিয়েও গিন্নিমাই দেন। আজ ফলকটা পেয়ে সে সোজা এসে গিন্নিমার দরবারে উপস্থিত। গিন্নিমা আজ বেজায় ব্যস্ত ছিলেন। গ্রাম থেকে তার দেওরের বড় মেয়ে তিতলি। এসেছে, প্রায় দুবছর পর। এই দেওরকে তিনি পুত্রসম স্নেহে মানুষ করেছেন। সে। এখন তাদের গ্রামের দিকের পৈতৃকসম্পত্তির দেখাশোনা করে, দাদাবৌদিকে সাক্ষাৎ দেবতাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করে। ফলে তার মেয়ে যে ওঁদের চোখের মণি হবে সে তো বলাই বাহুল্য। আর কী দেখতে হয়েছে মেয়েকে! সবে মোল বছর বয়েস, আহা, সাক্ষাৎ
দেবীপ্রতিমা যেন, রূপ যেন একেবারে ফেটে পড়ছে। উজ্জ্বল গম রঙের ত্বক, তাতে লালচে আভা, একটাল কোকড়ানো চুল, পদ্মফুলের পাপড়ির মতন চোখ আর তেমন মিষ্টি ব্যবহার। গিন্নিমা তো ঘুরে ঘুরে দেখেন, আর আশ মেটে না। থেকে থেকেই থু থু করে যাচ্ছেন, আহা, যদি নজর লাগে!
পাশের মুখুজ্জে বাড়ির যমজ মেয়ে সোনাই আর রূপাই তো তিতলির খুব ন্যাওটা। তারা তো দিদিকে দুবছর বাদে পেয়ে কী করবে বুঝেই উঠতে পারছে না। সেই সক্কাল থেকে চিলেকোঠায় গল্প জুড়েছে তিনজনে। ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে হা হা হি হি শুনেছেন তিনি বার দুয়েক। এই বারো বছর ষোল বছর বয়সে এত কী তোদের গোপন গল্প রে বাপু, অ্যাঁ?
অতসী যখন আসে, দত্তগুপ্ত গিন্নি তখন খেয়েদেয়ে শোবার উদ্যোগ করছিলেন, ফলকটা দেখে বললেন, তোর হাতে ওটা কীরে অতসী?
অতসী হাত পা নাড়িয়ে বেশ বর্ণনা সহকারে তার প্রাপ্তিকাহিনিটি জানাল, মনে হচ্ছে খুব বড় তিন দেবী, বুইলে গিন্নিমা, আমি তো ভাবলুম তোমার কাছে দিলে সেবাযত্ন পাবে, তাই নিয়ে এলুম। এর বেশি কিছু বলার দরকারও ছিল না গিন্নিমাকে। ঠাকুরদেবতার মূর্তিগুলোকে উনি মানুষ জ্ঞান করেই যত্ন সেবা করেন। গরমের আলাদা জামা, শীতের আলাদা জামা, তার ওপর মরসুমের নতুন ফল কী সবজি, সবই আগে ঠাকুরসেবায় যায়। গরমকালে ঠাকুরঘরে এসি চলে, কর্তার অনুযোগ উপেক্ষা করে।
