শুধু তাই নয়, মায়ারানি জানেন, শুধু হিংস্রতাই নয়। সঙ্গে করে এরা নিয়ে আসে। অতলস্পর্শী কামুকতা। লঘুগুরু জ্ঞান থাকে না, সময় অসময় বিচার থাকে না, পাত্র অপাত্র ভেদ থাকেনা, এমনই রাক্ষুসে সর্বগ্রাসী সেই কামস্পৃহা! রতিকান্ত হালদারের বড় ছেলের হাতে তিনি নিজে কতবার নিগৃহীত হয়েছেন, বলতে বলতে কেঁদে ফেলতেন মায়ারানির শাশুড়ি।শেষে নিজের বাবারই এক মুসলমান রক্ষিতাকে নিয়ে সে পালায়, তখন তার বয়েস ষোল! যাবার আগে অবশ্য সে বাবার সঞ্চয়ের বেশ খানিকটা অংশ নিয়ে যেতে, আবার বাবার বুকে একটা আধহাতি তলোয়ার গেঁথে দিয়ে যেতে ভোলেনি!
মায়ারানির তাই ভয় হয়। একে কলোনি এলাকা, উঠতি বয়সের মেয়ে-বউদের ভিড়। আর তা ছাড়া বাঙালদের মধ্যে অন্তরালের আব্রু ব্যাপারটা কম। কবে কী কেলেঙ্কারি হয়ে যায়, ভেবে মায়ারানি কাঁটা হয়ে থাকেন।
*******
অতসী গেছিল সাহাদের বাড়ির পেছনে কী একটা কাজে, ওর ঠিক মনেও নেই। আসার সময় হঠাৎ করেই চোরকাঁটার একটা ঝোঁপ ওর শাড়ি টেনে ধরে, আর সেটা ছাড়াতে গিয়েই ওর নজরে পড়ে লাল বলটা।
অতসীর ছেলের বয়েস তিন। লাল বল দেখলে চকাই খুশিই হবে, ভেবে বলটা তুলতে গিয়েই ফলকটা নজরে পড়ে ওর।
নেহাত কৌতূহল বশেই ফলকটা তুলে নেয় ও, আর তখনই টের পায় যে ফলকটা বেশ ভারী। ওর ছেলের লেখার স্লেট যেরকম, প্রায় সেরকম সাইজেরই, চারিপাশে ভাঙা, কিন্তু তেলতেলে মসৃণ। মানে রীতিমত ব্যবহার হত আর কী! সলিড পাথরের তৈরি বোঝাই যাচ্ছে, নইলে এত ভারী হয় না। কিন্তু অতসীকে যেটা আশ্চর্য করল, সেটা হচ্ছে ফলকের ওপরে খোদাই করা ছবিটা।
পাথরে কুঁদে বানানো চারটে শরীর। একদম নীচে, বাঁদিকে একজন মানুষ বসে আছে পদ্মাসনে, আর দুই হাত তুলে কার যেন প্রশংসা করছে। প্রশংসা করছে অবশ্য দই নর্তকীর, যারা ফলকের মাঝামাঝি এবং স্পষ্টতই তারা নাচছে। যেটা বুঝতে পারল না অতসী, যে দুজনেরই মাথা বাঁদিকে নাচের ভঙ্গিতে হেলানো, আর দুজনারই ডান হাত তাদের ঘাড়ের কাছে। হাতে কি কিছু ধরা আছে?বুঝতে পারল না অতসী। যাগগে যাক। ফলকের ওপরে আবার একজন মহিলা, আশীর্বাদ দেওয়ার ভঙ্গিতে।
ফলকটা ফেলেই দিত অতসী, কিন্তু খেয়াল করে দেখল যে সিঁদুর আর তেলের দাগ রয়েছে নীচের দিকে। মানে পুজোআচ্চা হত বা হয়। ফেলে দেবে অতসী? এমনিতেই দিন ভালো যাচ্ছে না ওর। ওর বরের সঙ্গে রোজ তার মালিকের খিটিমিটি লাগছে। অনেকদিন থেকেই ভোম্বল বলছে ওই মালিকের কাছে ও চাকরি করবে না, এবার একটা টোটো কিনবে।
মা, মা গো, দয়া করো মা, একটু দেখো।
ফলকটা প্রণাম করে নিয়েই নিল অতসী।
*********
সুড়ঙ্গের মধ্যে আদিম অন্ধকার। হাতড়ে হাতড়ে বেশ খানিকক্ষণ গিয়েই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনজন। কারও কাছেই আলোর উৎস কিছু নেই।
হঠাৎ করে রত্নাকরশান্তির হাতে জ্বলে উঠল একটি প্রদীপ। শান্ত, কিন্তু ভারী উজ্জ্বল। চকিতে আলোময় হয়ে উঠল অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ।
প্রথমটা হকচকিয়ে গেছিলেন সোমেশ্বর আর বোধিভদ্র। তারপর সামলে নিয়ে। বললেন, এই উজ্জ্বলতম আলোকরশ্মি কোথায় পেলেন গুরুদেব? আমরা তো শুধু…
হাত ঠোঁটে তুলে শশশস করলেন রত্নাকরশান্তি। একবার শুধু চাপা গলায় বললেন যে, দ্রুত যেতে হবে ভদ্র, অসহায় তিনটি বালিকার কান্না আমি স্বকর্ণে শুনেছি। আর এই আলো? এর উৎস কিছু চৈনিক অগ্নিমশালা, আমার প্রিয়শিষ্য অতীশ তিব্বতেই এর সন্ধান পেয়ে কিছুমাত্র মশালাচূর্ণ আমাকে পাঠায়। তারই কিছু সাবধানে, বিশেষ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করলাম। চলুন সামনে এগোনো যাক। অতীশ বলে পাঠিয়েছে যে খুব সাবধানে এর নাড়াচাড়া করতে। এ দিয়ে নাকি প্রাচীন কালের ব্রহ্মাস্ত্র বা পাশুপতাঙ্গের মতন মহাধ্বংসলীলা চালানো সম্ভব। অতীশের ধারণা মহাভারতীয় অস্ত্রের যা-কিছ বিবরণ আছে সবই নাকি স্বাভাবিক সাংখ্য যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যায়। যাই হোক, তে ভদ্র, আসুন, আপাতত সোমপুর মহাবিহারের অদ্যাবধি অনাবিষ্কৃত গুপ্ততম প্রকোষ্ঠে সযতনে প্রবেশ করি, এইবার আপনাদের চোখের সামনে উন্মুক্ত হোক…
চোখের সামনের দৃশ্যটির জন্যে অবশ্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না।
.
স্নান করছিলেন মায়ারানি। তাঁর বয়েস সাতচল্লিশ। বিধবা মায়ারানির যৌবন এখনও যায় যায় করেও যায়নি, তার ওপর তিনি সুন্দরী। রাস্তায় বেরোলে এখনও লুব্ধ পুরুষের। নজর তার সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে যায়। শিরশির করে ওঠে মায়ারানির গা। কুপ্রস্তাব কী কম। পেয়েছেন নাকি এই এক জীবনে?
স্নান করে পুজোয় বসলেন মায়ারানি। আরাধ্যদেবতার পুজো করেঠাকুরের আসনের নিচ থেকে একটা চওড়া, বাচ্চা ছেলেদের স্লেটের আকারের একটি অ্যালুমিনিয়ামের বাক্স বার করলেন।
মায়ারানির শ্বশুর-শাশুড়ি সাতচল্লিশে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসার সময় প্রায় কিছুই আনতে পারেন নি এই বাক্সটা ছাড়া। এ নাকি তাদের পরিবারের অনেক প্রাচীন বিগ্রহ। এ জিনিস হালদার পরিবারের বাইরে কারো দেখার অধিকার নেই। এবং পরিবারের বউ বা মেয়ে ছাড়া কোনও পুরুষের পূজা করবার অধিকার নেই।
শাশুড়ি যতদিন বেঁচে ছিলেন, তিনিই এর পূজা করতেন, প্রতি অমাবস্যাতিথিতে। মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে আর পাঁচটা জিনিসের সঙ্গে এইটাও সঁপে দিয়ে যান। মায়ারানির হাতে, আর বলে যান কয়েকটি গুহ্য কথা
