তারপর ঝড় ওঠে। হঠাৎ করে এক কালো ঝড় পিশাচীকে আচ্ছন্ন করে। বাকি সমস্ত ছায়াতে সেই ঝড়ে মিশে ঘূর্ণির মতন ঘুরতে থাকে। সেই ঘূর্ণন তীব্র হলে পর তা এক দমকে দরজা দিয়ে ছিটকে বেরোয়।
অতীন তার ধাক্কায় মুখ থুবড়ে উলটে পড়ে। কিন্তু আঘাত লাগে না।
সেই কালো ঝড় স্টাডি রুমে ঢোকে।
অতীন বহুকষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে স্টাডিরুমের দরজার কাছে যায় এবং ভিতরের দৃশ্য দেখে পাথর হয়ে যায়। সেই উলঙ্গিনীপিশাচী দেবীর দিকে পিছন ফিরে উবুহয়ে বসেছে, সে ঝুঁকে বসেছে। দেবীর সামনে দেওয়া ভোগের ওপর। সে কী নারকীয় বমনোদ্রেককারী দৃশ্য! ডাকিনী। খিলখিল করে হাসতে হাসতে দুই হাতে সেই ভোগ উগ্র বুভুক্ষুর মতন দুই হাতে মুখে। পুরছে! দুহাতে ছড়াচ্ছে, আবার দুহাত দিয়ে মুখে পুরছে, কিছু ছিটিয়ে ফেলছে থুতুর মতন।কিছু তুলে সারা মাথায় আর মুখে মাখছে।
অতীনের আর সহ্য হল না। কোনওমতে টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়ে সে বুক থেকে বার করে আনে সেই জ্বলন্ত নীল স্ফটিকখণ্ড, তারপর সজোরে ছুঁড়ে মারে সেই উগ্ৰডাকিনীর দিকে।
একটা বিস্ফোরণ ও আর্তনাদের শব্দ। তারপর অতীনের চোখের সামনে দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে আসে। অত রাতে কেউ যদি জেগে থাকত, তবে সে দেখত যে হঠাৎ পাড়ার শেষ বাড়িটায় দপ করে জ্বলে উঠেছে একটা নীল আলো। সারা বাড়িটা থেকে যেন এক নীল আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। অভিশাপের মতন যে কালো ছায়ার পর সারা বাড়িটা ঘিরে নেমে এসেছিল, আস্তে আস্তে তা উঠে যাচ্ছে, গুঁড়ো হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক কিছু উড়ে যাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে। সব শেষে একটা দীর্ঘ কালো ছায়া বেরিয়ে আসে বাড়ি ছেড়ে। এক নারকীয় হাহাকার ও আর্তনাদের সঙ্গে সেও মিশে যায় মহাশূন্যে।
এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল ভবেশবাবুকে। ছাড়া পেয়েই ডান তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের ওপর নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করেন।
অতীন পরের দিন রাতভোরে মূর্তিটা হাওড়া ব্রিজের ওপর থেকে গঙ্গায় ফেলে। দিয়ে আসে।এখন তার শখ হয়েছে ফুলের বাগান করার। তার গোলাপের কালেকশন দেখার মতন।
শুধু মাঝরাতে যখন কোনও ছোট মালবাহী জাহাজ হাওড়া ব্রিজের নিচ দিয়ে। যায়, কোনও কোনও নাবিক মাঝেমধ্যে জলের অনেক নিচ থেকে এক তীব্র লাল আলো দেখতে পায়, আর শোনে অতল জলের নিচ থেকে উঠে আসা সেই আহ্বান, আমাকে উদ্ধার করো নাবিক। আমার খিদে পেয়েছে। আমাকে উদ্ধার করো। মহাক্ষুধা আমার। আমাকে ভোগ দাও, ভোগ!
রক্তফলক
প্রবল উত্তরে হাওয়ার রাত ছিল সেটি, আর সেবছর মধ্য মাঘ মাসে নেমেছিল বৃষ্টি। প্রত্যাশিতভাবেই সমগ্র মহাবিহার ঘুমে আচ্ছন্ন, শুধু একজনই জেগে আছেন এই দুর্যোগের রাতে।
প্রধান চৈত্যটির পাশ দিয়ে লম্বা বারান্দা, আর তারপরেই শ্রমণদের থাকার সারিসারি ঘর। ভন্তে শিবাপা তাঁর অঙ্গবস্ত্র দিয়ে প্রদীপটি আড়াল করে সাবধানে বাঁচিয়ে শেষ ঘরটির মধ্যে এসে দাঁড়ালেন। তারপর এদিকওদিক দেখে উত্তরপূর্বের কোণের একটি পাথরের ওপর মৃদু চাপ দিতেই সেটি ভেতরে ঢুকে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে কালো দেওয়ালের একটি অংশ খুলে উন্মুক্ত হল একটি গুপ্তপথের মুখ। সন্তপর্ণে এদিকওদিক তাকিয়ে তার ভেতরে ঢুকে দেওয়ালের অংশটি ঠেলে গোপন রাস্তাটি বন্ধ করে দিলেন ভিক্ষু শিবাপা।
খানিকক্ষণ বাদে ঠিক সেই ঘরের বাইরে যেন ভোজবাজির মতই আবির্ভূত হলেন তিনজন। তাঁদের মধ্যে একজন দ্রুত এসে পাথর চেপে সরিয়ে সেই গুপ্তসুড়ঙ্গের পথ উন্মুক্ত করলেন, তারপর চাপা গলায় বললেন, আসুন স্থবিরশ্রেষ্ঠ, আসুন পণ্ডিতাচার্য, দ্রুত গেলে হয়তো কন্যা তিনটিকে বাঁচালেও বাঁচাতে পারি।
দ্রুত সেই গুপ্তপথে প্রবেশ করলেন পালসম্রাট কুমারপালের প্রধান অমাত্য সোমেশ্বর গর্গ, মহাপণ্ডিতাচার্য বোধিভদ্র এবং অঙ্গ থেকে হরিকেল তথা সমগ্র পৌণ্ড্রবর্ধনের অহঙ্কার, সোমপুর মহাবিহারের মুখ্যস্থবির, পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের আধ্যাত্মিক গুরুদেব, শীরত্নাকরশান্তি।
*********
রক্ত দেখতে খুব ভালোবাসে টেনিয়া, ছোটবেলা থেকেই। ওর যখন পাঁচবছর বয়েস, তখন থেকেই আরশোলা আর ইঁদুর ধরে ব্লেড দিয়ে কেটে দেখা ওর প্রিয় শখ ছিল। নেতাজিনগরের উদ্বাস্তু কলোনির ছেলেটির এহেন শখ দেখে আত্মীয়স্বজনরা হেসে কুটিপাটি হতেন, অ মায়া, দেইখ্যা যাও, তুমার পোলা ডাক্তার অইব মনে লয়।
হাসিটা অবশ্য মিলিয়ে গেছিল যেদিন সাতবছর বয়েসি টেনিয়া মায়ের কাপড় কাটার কাঁচি দিয়ে একটা দু-সপ্তাহ বয়েসি বিড়ালবাচ্চার মুন্ডু কেটে ফেলে। মা বিড়ালের করুণ মিউমিউ কান্না শুনে সেদিন মায়ারানি হালদার মুখে ভাত তুলতে পারেননি। এরপর টেনিয়াকে শোধরাবার অনেক চেষ্টা করা হয়, ফল হয় উলটো।নিজের ছেলের মধ্যে শীতল নিষ্ঠরতা আর শিয়ালের ধূর্ততা নজর এড়ায়নি তাঁর। ডাক্তার-বদ্যি, মানত জলপড়া, চেষ্টা সবই হয়, বলাবাহুল্য লাভ কিছুই হয়নি।
.
মায়ারানি জানতেন যে হবে না।
তাঁর শ্বশুরবংশে কারও কারও এরকম উন্মাদ ও হিংস্র হয়ে ওঠার ইতিহাস আছে। তাঁর শাশুড়ির ভাসুরের বড়ছেলের নাকি এরকম অভ্যেস ছিল। নিজের হাতে মুরগির মাথা ছিঁড়ে ফেলা, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কুকুরছানার চোখ তুলে ফেলা, খাঁচার মধ্যে কয়েকটা হিংস্র ক্ষুধার্ত সড়ালে কুত্তার মধ্যে বাচ্চা সমেত মা-বিড়াল ছেড়ে দেওয়া, এসবের। মধ্যে লোকটা পৈশাচিক উল্লাস খুঁজে পেত। আর চট্টগ্রামের উত্তর চর মজলিশপুরের জমিদার রতিকান্ত হালদারের বড় ছেলের সেইসব কাজে বাধা দেবে, এমন সাহস গোটা চট্টগ্রামে কারো ছিল না।
