সেই ডাকিনী প্রথমে তার শিরা ওঠা বাম হাত দিয়ে নিজের একটি স্তন নিজের বুক থেকে ছিঁড়ে নেয়। তারপর রক্তঝরা দাঁতদুটি দিয়ে তার স্তনবৃন্তটি ছেঁডে, উপচে পডে গাঢ় কালচে রক্ত। সেই রক্ত ডানহাতে ধারণ করে সে ফেলে সেই হাঁড়ির মধ্যে। তারপর ছিন্ন স্তনটি হাঁড়ির ওপর ধরে মোচড়াতে থাকে যতক্ষণ না রক্তের শেষ বিন্দুটক অবধি পাত্রের মধ্যে পড়ে। অতঃপর সে বিচ্ছিন্ন স্তনটি ফের বুকে লাগিয়ে নেয়, যেন কিছুই হয় নি!
এরপর সে বামহাতটি দীর্ঘ করে সে ঘরের কোণ থেকে একটি কাটা হাত তলে আনে। তারপর শক্ত ও কালচে রঙের হিংস্র নখ দিয়ে সেই কাটা হাত থেকে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে সেই হাঁড়ির মধ্যে দেয়। একটু করে দেয়, আর তারপর ডান হাত সেই হাঁড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে নাড়তে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে অশরীরী খোনা গলায় সুরেলা মন্ত্রোচ্চারণ। ভবেশবাবু দরজা ধরে কাঁপতে থাকেন। অতীনের। মনে হয় সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। চৈতন্য বিলুপ্ত হতে হতে শেষ বারের মতন তার। দৃষ্টি সেই কাটা হাতটির ওপর পড়ে।
হাতের অনামিকাতে একটা আংটি না?
এই আংটিটাই অতীনের মা মারা যাবার আগে সবাইকে সাক্ষী রেখে পুষ্পদিকে দিয়ে যাননি?।
এই আংটি অতীনের চেনা।
এই হাতও অতীনের চেনা।
এ হাত পুষ্পদির হাত!
মা বাবা মরে যাবার পর যে মানুষটা অতীনকে নিজের ছেলের মতন আগলে। রেখেছিল, তার হাত!
সেই বোধবুদ্ধি ভোঁতা করে দেওয়া অলৌকিক ভয়বিহ্বলতার মধ্যেও এই কথাটা। অতীনের বুকে গেথে গেল, এই পিশাচীই খুন করেছে পুস্পদিকে!!
কোথা থেকে একটা অব্যক্ত ক্রোধ অতীনের চোখে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। রাগে তার সারা গা রি রি করে জ্বলতে থাকে। সে দরজার সামনে এসে সজোরে লাথি মারে। দরজায়, দুহাট হয়ে খুলে যায় দরজা। থুতু ছিটিয়ে অতীন খিস্তি করে শয়তান ডাইনি, পুষ্পদিকে তুইই খেয়েছিস, না? আমি আজই তোকে খুন করব রাক্ষুসি, নিজেকে কী ভেবেছিস তুই?
ধীরে ধীরে সেই পিশাচীর ঘাড় ঘোরে এদিকে, শরীর ঘোরে না, শুধু ঘাড় ঘোরে। তারপর সেই প্রেতিনী খলখল শব্দে হেসে ওঠে, দুই হাতে তালি দেয়, হাসতে হাস্য খোনা গলায় বলে, মা কে ভোগ দেবে না দাদাবাবু? মহাভোগ?
তারপর সমস্ত রান্নাঘর, সমস্ত পাড়া, সমস্ত জগৎ, অতীনের সমস্ত চৈতন্য জুড়ে ঝড় ওঠে, কালরাত্রির মহাঝড়। অতীন দেখে সে যেন শূন্যে উত্থিত।তার চোখের সামনে। আকাশের নীল চাদর যেন একঝটকায় কে ছিঁড়ে নিল। তখন অতীনের সামনে মহাশূন্য, আর সেই মহাশূন্যে সে একা, চারিধারে সর্বগ্রাসী, সর্বনাশী, সর্বধ্বংসী কালক্ষুধা। তার চারিপাশে শ্মশানের আগুন আকাশ বাতাস জ্বালিয়ে গলিয়ে সেই গলানো লালটকটকে পাপ যেন তরল মোমের মতন তার চৈতন্যের ওপর ফেলছে। কোন রসাতল থেকে যেন উঠে এসেছে হিংস্র শিয়ালেরা আর বীভৎসদৰ্শন দুই কুকুর, তাদের হিংস্র শ্বদন্ত। আর রক্তলোলজিহ্বা থেকে রক্তফেনা উড়ে উড়ে পড়ছে। গলিত শব আর কঙ্কালের দল। খলখল করে হাসতে হাসতে তাকে ঘিরে তালি দিয়ে নাচছে। অতীনের দিকে উড়ে আসে সিঁদুরমাখা হাড়ের টুকরো, কালচে রক্তের ছিটে। পচা চর্বি আর রক্ত পোড়া অভিশপ্ত পতিগন্ধে তার চেতনা বিলীয়মান। তবুও শরীরের সমস্ত শক্তি সংহত করে সে দেখে সেই পিশাচী সম্পূর্ণ উলটো হয়ে সিলিং বেয়ে বেয়ে ধীর এবং নিশ্চিত পদক্ষেপে তার দিকে আসছে, উলটো হয়ে ঝুলছে তার অভিশাপের মতন উড়ন্ত চুল। খোনা গলায় সে জিজ্ঞেস করছে, মায়ের মহাভোগ দেবে না দাদাবাবু? খিঃ খিঃ খিঃ।
অতীনের একদম কাছাকাছি এসে গেছে সে, মড়াপচা অভিশপ্ত গন্ধে অতীনের চৈতন্য বিলুপ্তপ্রায়, সেই পিশাচিনী দীর্ঘ হাত বাড়িয়েছে অতীনের গলা লক্ষ্য করে…
দুম করে যেন একটা আলোর বিস্ফোরণ ঘটে গেল ঘরের মধ্যে। দপদপ করে অতীনের বুকের কাছে একটা আগ্নেয়গিরি নীল আভা উদগিরণ করতে শুরু করল পাগলের মতন। তার প্রথম ধাক্কাতেই সব অশরীরী অপ্রাকৃত অশুচি আত্মারা ছিটকে পড়ল চারিদিকে। সেই পিশাচী এক মরণান্তিক আর্তনাদ করে মেঝেতে ধপ করে পড়ে যায়। ধীরে ধীরে অপসৃত হতে থাকে যাবতীয় নরকভোগী পূতিগন্ধ।
অতীন বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে তার বুকের স্ফটিক থেকে সঞ্জাত সেই আলো তার। শরীরের চারিপাশে এক অলৌকিক বলয় তৈরি করেছে। শুধু সে নয়। মাটিতে লুটিয়ে থাকা অজ্ঞান ভবেশবাবুর শরীরের চারিপাশেও এক আবরণ তৈরি করে রেখেছে।
ভালোবাসা হল সবচেয়ে বড় তন্ত্র, সবচেয়ে বড় যাদু!
আর সেই নীল বলয় ঘিরে সব অভিশপ্ত, নারকীয়, ভয়াল, পিশাচযোনিসম্ভূত ছায়া অব্যক্ত ক্রোধে নাচতে থাকে, সেই বলয় ছিঁড়ে ঢুকে আসতে চায়। উফফ কী বীভৎস তাদের চাউনি! কী উগ্র তাদের আক্রোশ! অতীনের সমস্ত জাগ্রত চেতনা ওলটপালট হয়ে যেতে থাকে।
কিন্তু কেউই সেই বলয় ভেদ করে আসতে পারে না।
এরপর মেঝে থেকে একটা খড়ড়ড়ড়ড় শব্দ ওঠে। সেই ভূলুণ্ঠিতা পিশাচী নিজের গলার হার থেকে শুকনো পাখির পা ছিঁড়ে নিয়ে নিজের কপালে লেপ্টে থাকা রক্তসিঁদুরে মাখিয়ে নেয়, তারপর বিড়বিড় করতে করতে তা নিক্ষেপ করে অতীনের দিকে।
জবাবে অতীনকে ঘিরে থাকা সেই আলো দপ করে জ্বলে ওঠে। আর কিছুই হয় না।
পিশাচী খানিকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দেখে।
