জ্বলবেও না অতীন। আজ কোথাও কোনও আলো জ্বলবেনা। কেউ জেগে থাকবে । আকাশের দিকে তাকাও অতীন, কালরাত্রি নেমেছে, দেখতে পাচ্ছ?
অতীনের সব কিছু গুলিয়ে যায়। কালরাত্রিটা কী বস্তু? আর এসব কী বলছেন ভবেশকাকু?
আমি পাড়ার বাইরে ছিলাম এতক্ষণ।তোমার জন্যেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আজ সারা পাড়া মড়ার মতন নিঃসাড়ে ঘুমোবে অতীন। আকাশের দিকে তাকাও অতীন। এ বড় ভয়ানক রাত। মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে এসেছে অতীন, তোমার জন্যে। আজ আমি সারারাত তোমার সঙ্গে থাকব, তোমার বাড়িতেই। আকাশের দিকে তাকায় অতীন, আর তখনই ব্যাপারটা তার বোধগম্যতার মধ্যে আসে।
সমস্ত চরাচর কেমন যেন এক বিস্তীর্ণ নিঝুম স্তব্ধতায় কুঁকড়ে আছে। শুধু যে। আলো নেই তা নয়, শব্দও নেই। ধুলোয় মলিন কলকাতার আকাশ। তারাগুলো যেন লাল রক্তবিন্দুর মত জ্বলছে। কোথাও কোনও প্রাণ নেই, রূপ নেই, রঙ নেই, গন্ধ নেই। ঘোর অমানিশা যেন কোন এক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় মূক।
এই মোড় থেকে শেষ বাড়িটা অতীনের, এখান থেকেই স্পষ্ট দেখা যায়। অতীন। দেখল তার বাড়ির ওপরে খুব ধীরে ধীরে একটা মিহি অন্ধকারের চাদর যেন নেমে। আসছে। যেন একটা সর্বগ্রাসী অমঙ্গল সূক্ষ্ম পাপের মতন জড়িয়ে ধরছে বাড়ির। সর্বাঙ্গ।
দাঁড়াও অতীন, তোমাকে কয়েকটা কথা এক্ষুনি বলা দরকার।
আরও প্রায় আধঘণ্টা। ভবেশবাবুর ও সুবেশের বামুনগাছি যাওয়া ও দ্বিজোত্তম মিশ্রের সঙ্গে কথোপকথনের পুরোটাই বলেছেন অতীনকে। গাঢ় নিকষ কালোর সঙ্গে। মিশে গেছিল ভবেশবাবুর ফিসফিসানি।
চুপ করে থেকেছে অতীন, শুধু একটাই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছে, আজ রাতটা পাড়ার। বাইরে কাটালে হয় না?
আজ রাত্রে এ পাড়ায় যে ঢুকবে, তার আর বেরোবার পথ নেই অতীন। আর। যেখানেই যাও, সেই পিশাচী তোমাকে ছাড়বে না। আজই তার কর্মসমাপ্তির দিন, সমস্ত হিসেব চুকিয়ে দেওয়ার দিন। তার শিকার আজ সে ছাড়বে না অতীন।
কিন্তু কাকু, আপনি কেন স্বেচ্ছায় এর মধ্যে…
অন্ধকারের মধ্যেও ক্ষীণ হাসিটা বুঝতে অসুবিধা হয় না অতীনের, তুমি হয়তো বুঝবে না বাবা। সবাইকে একদিন তার কাছে গিয়ে হাতজোড় করে দাঁড়াতে হয়। সারাজীবনের কৃতকর্মের কৈফিয়ত দিতে হয়। তিনি যদি জিজ্ঞেস করেন বিপদের দিনে। পিতৃহীন-মাতৃহীন ছেলেটাকে একলা ফেলে কোথায় পালিয়ে গেছিলে, কী জবাব দেব অতীন? নিঃশব্দে হাসতে থাকেন সেই প্রৌঢ়।
কালই কে একজন যেন বলছিলেন না অতীনকে, যে ভালোবাসা হল সবচেয়ে। বড়ো তন্ত্র, সবচেয়ে বড় যাদু?
নিজের বাড়ির তালা খুলে নিঃশব্দে প্রবেশ করে অতীন, পিছন পিছন ভবেশবাবু। এবং ঢুকেই দুজনে হিম আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যান। একটা তীব্র মড়াপচা গন্ধ হু হু করে। ছুটে আসে দুজনের দিকে, দুজনেই দ্রুত নাকে রুমাল চাপা দেন।এবং ঠিক তক্ষুনি সদর দরজাটা নিজে থেকেই নিঃশব্দে আঁট হয়ে বন্ধ হয়ে যায় পিছনে।
তারপর বাঁ দিকে যেতে চান দুজনেই, ওদিকেই রান্নাঘর। এই জায়গায় একটা চেয়ার থাকার কথা, কারণ তার পাশেই ডাইনিং টেবিল। অভ্যেসমতন হাতটা বাড়ায় অতীন এবং সে হাত শূন্যে ফিরে আসে।
পা ঘষে ঘষে আরেকটু এগোয় দুজনে। আশ্চর্য পিনপতনস্তব্ধদা সারা বাড়ি জুড়ে। কয়েক পা এগোতেই অতীন বুঝতে পারে যে পুরো জায়গাটাই ফাঁকা। এইবার একটা মৃদু টুপ শব্দ দুজনেরই কানে আসে, কয়েক সেকেন্ডের বিরতি দিয়ে, আরেকবার, টুপ। কিন্তু কীসের শব্দ বোঝার উপায় নেই। এর পর রান্নাঘরে হঠাৎ করে একটা লালচে আলো জ্বলে ওঠে। রান্না করবার আলো কি? সেই আলোর অতি সামান্য অংশ এসে পড়ে এদিকে। তাতে দুজনেই দেখে যে সমস্ত মেঝে ফাঁকা, কিচ্ছু নেই।
অতীন আশ্চর্য হয়ে ভাবছিল জিনিসগুলো গেল কই, এমন সময় পাঁজরে একটা মৃদু গোত্তা খেয়ে ভবেশবাবুর দিকে তাকায় অতীন, দেখে ভদ্রলোক আতঙ্ক বিস্ফারিত চোখে সিলিঙের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে অতীনও সিলিঙের দিকে তাকায় এবং আতঙ্কে কাঠ হয়ে যায়।
ডাইনিং টেবিল, চেয়ার, শু-র্যাক, কফি টেবিল, পাপোশ প্রত্যেকটা জিনিষ উলটো হয়ে সিলিঙের সঙ্গে লেগে ঝুলছে এবং প্রতিটা বস্তু থেকে ফোঁটা ফোঁটা করে কোনও এক তরল মেঝেতে এসে ছিটকে পড়ছে, থেকে থেকে হাড় হিম করা শব্দ উঠছে, টুপ!
সেই আবছা আলোতেও বোঝা যায় যে সেই তরলটির রঙ লাল। ঘন লাল। রক্ত!
এইবার থরথর পায়ে দুজনে রান্নাঘরের দিকে এগোন, দু পা দূর এগোতেই একটা খোনা গলায় মন্ত্রোচ্চারণ করার সুর ভেসে আসে।
ধীরে ধীরে দুজনেই উঁকি দেন রান্নাঘরের ভেতরে এবং আধো খোলা দরজার মধ্যে দিয়ে উঁকি দিয়ে বিদ্যুতস্পৃষ্টবত স্থানু হয়ে যান।
ডামরি রান্না করছে! তাকে দেখে দুজনেরই হৃৎপিণ্ড মুহূর্তের জন্যে স্তব্ধ হয়ে যায়। অতীন তাকে দেখে আতঙ্কে অভিভূত হয়ে পড়ে।
কে এই সম্পূর্ণ উলঙ্গ পিশাচী? শুকনো অস্থিসার দেহ, সাপের মতন উড়ছে তার খোলা চুলগুলো। বীভৎস মুখ তার, অক্ষিকোটর থেকে বেরিয়ে এসেছে বড় বড় রক্তবর্ণ চোখ, কালো ঠোঁটের পাশ দিয়ে বেরিয়ে আছে তাজা রক্তস্নাত, ঈষৎ বড় দুটি শ্বদন্ত। গলায় বিভিন্ন পাখির কাটা পা দিয়ে গাঁথা এক বীভৎস মালা ঝোলানো।
ঘরের ঠিক মাঝবরাবর শূন্যে ভেসে আছে সেই পিশাচী। তার কপালে আর সমগ্র অঙ্গে তেল আর লাল সিঁদুর বিশেষ মুদ্রাছাপে অঙ্কিত। তার পা দুটি সামনে প্রসারিত, এবং সেদুটি দাউদাউ করে জ্বলছে। সেই জ্বলন্ত পা দুটির ওপর রাখা একটি হাঁড়ি, তার ভেতর থেকে লালচে ধোঁয়া উঠছে।
