আতঙ্কিত বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছিল এসব অতীন। এসব কী তার বাড়ির ছাদে? কারা করেছে? মানে কী এ সবের? ডামরি দেখেনি এ সব?
হঠাৎ তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে জানান দিল যে তার এখানে থাকা ঠিক নয়। তাকে নীচে যেতে হবে। এক্ষুনি নীচে যেতে হবে। একমুহূর্তও সে যেন এখানে দাঁড়িয়ে না থাকে। তার ঘাড়ের সমস্ত রোঁয়া দাঁড়িয়ে গেল, হঠাৎ করে দুরন্ত শীতে তার দাঁতকপাটি লাগার উপক্রম।
কাঁপতে কাঁপতে সে নীচে নেমে এল। বাথরুমে ঢুকে গিজারের গরম জলে স্নান করার পর তার হাতে পায়ে কিছু সাড় আসে। স্নান করে সে ঝটপট জামাকাপড় পরে নেয়। তারপর ঘর থেকে বেরিয়েই দেখে ডাইনিং টেবিলের পাশে ডামরি।
তার দিকেই স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
সাতসকালেই ডামরিকে দেখে বিভ্রান্ত হয়ে যায় সে। এ কি সেই নিঃসহায় নিঃসম্বল গ্রাম্য মহিলা, যাকে সে প্রায় রাস্তা থেকে তুলে এনে ঘরে জায়গা দিয়েছে? ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে?
মুখটা একটু লম্বাটে দেখাচ্ছে ডামরির, গালগুলো ভাঙা ও শুকনো। একরাত্রেই যেন গায়ের রঙ কয়েক পোঁচ গাঢ় কালো হয়ে এসেছে। হাতের শিরা অস্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে আছে, নখগুলোও দীর্ঘ, কালো ও বাঁকানো। শুকনো চুলগুলো হাহাকারের। মতন উড়ছে হাওয়ায়।
শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল ডামরি, তুমি ছাদে গেছিলে?
গলা শুনেই চমকে উঠলো অতীন। সেই গ্রাম্য বিধবার করুণ গলার স্বর কই? এই কর্কশ, তীক্ষ্ণ ও সামান্য সানুনাসিক গলা কার? আর শ্বদন্তদুটি অত বড় হল কী করে?
ভেতরে ভেতরে কাঁপুনি ধরছিল অতীনের। ঠিক এই সময়েই সে টের পায় তার বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে সেই স্ফটিকখণ্ড।
আর কোথা থেকে তার সেই শিরশিরানি ভাবটা উধাও হয়ে গিয়ে স্বাভাবিক সাহসটা ফিরে আসছে। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, ছাদে অত নোংরা কেন? তুমি থাকো। ছাদে, এগুলো দেখতে পাও না? কীসের জন্যে রাখা হয়েছে তোমাকে?
এরপরের ঘটনাটার জন্যে প্রস্তুত ছিল না অতীন। ধক করে জ্বলে ওঠে ডামরির চোখ দুটো, যেন চোখের কোটরে দুটুকরো কাঠকয়লা জ্বলছে। ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা হাতটা প্রবল আক্রোশে মুঠো করতে চায় সে, নখের আঘাতে কাঠের গা থেকে একটা ক্যরররররর আওয়াজ উঠে আসে অশ্লীল বিভীষিকার মত।
আর সেই ঠিক সেই মুহূর্তেই, অতীন বুঝতে পারে আরও জ্বলে উঠেছে তার বুকের সেই স্ফটিক। না তাকিয়েও বুঝতে পারছে বুকটা পুরো নীল আভায় ভরে গেছে।
দুইজনেই দুইজনের দিকে প্রতিস্পর্ধীর ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
তারপর যা ঘটল সেটা ম্যাজিক ছাড়া কিছু নয়। যেন কিছুই হয়নি, এমন ভঙ্গিতে আগের মতই লাজুক স্বরে ডামরি বলল, শরীলটা ঠিক নেই গো দাদাবাবু, পাখিতে এনে কিছুমিছু ফেলেছে বোধহয়, আমি আজই পোস্কার করে দিচ্ছি।
ডামরি ফের সেই গ্রাম্য বালাটি। গোলগাল স্নেহময় মুখ, স্বাভাবিক চোখ ও নখ। লাবণ্যময় হাত দুখানি। যেন এক মূহুর্ত আগের সেই পৈশাচিক রুদ্রমূর্তির সঙ্গে এর কোনও সম্পর্কই নেই!
তারপর মাথা নামিয়ে খুবই দুঃখের সঙ্গে বলে, তবে একটা খারাপ খবর আছে। দাদাবাবু, সকালে উঠে চাবি দিয়ে তালা খুলে দেখি মা আজ ভোগ নেননি। আমার রান্নায় নিশ্চয়ই কিছু খুঁত ছিল, নইলে মা নেবেন না কেন? আজ তুমি একটু রাত করে ফিরো, কেমন? আজ অমাবস্যা, আজ মায়ের জন্যে মহাভোগ রান্না করে দেব। ঠিক আছে? মাকে আজ খুশি না করে ছাড়বই না। বলে খিলখিল করে হেসে ওঠে ডামরি।
খিলখিলের মধ্যে একটা শিউড়ে ওঠার মতন খলখল হাসির শব্দও কিমিশে ছিল? মেট্রোতে যেতে যেতে সে কথাই ভাবে অতীন।
অফিসে সবাই অতীনের এই আপাত পরিবর্তন স্পষ্টতই খুশি হয়। বহুদিন বাদে সহকর্মীরা চুটিয়ে গল্প করে। রিজিওনাল ম্যানেজার সাহেব এসে একসঙ্গে সিগারেট খান, কুশল জিজ্ঞেস করেন এবং যথারীতি একগাদা কাজ চাপিয়ে দেন!
অফিস থেকে বেরোতে বেশ রাত হয়ে যায় অতীনের। নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ হবে। তার প্ল্যান প্রোগ্রাম বানিয়ে, রিজিওনাল ম্যানেজারকে দিয়ে অ্যাপ্রুভ করিয়ে, সেলস ম্যানেজারদের পাঠিয়ে অফিসের ঝাঁপ বন্ধ করতে করতে প্রায় সাড়ে নটা।
পাড়ায় ঢুকতে ঢুকতে প্রায় সাড়ে দশটা কী এগারোটা হয়ে যায় অতীনের। আর ঠিক সেই সঙ্গে লোডশেডিং। দাঁড়িয়ে পড়ে অতীন।
যাঃ, একে অমাবস্যার রাত, তার ওপর লোডশেডিং। রাস্তার ত্রিফলাগুলো অবধি জ্বলছে না। মোবাইলেরও ব্যাটারি তলানিতে, ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাবার প্রশ্নই নেই। হাতড়ে হাতড়ে কোনওরকমে এগোচ্ছিল অতীন। অদ্ভুতভাবে তাদের পাড়াটাও আজ নিশ্চুপ। এমনিতে নেতাজিনগর বাঙালদের এলাকা। লোকে নিজেদের মধ্যে প্রেমের কথাও সারা পাড়া না জানিয়ে বলতে পারে না। সেই এলাকা এমন নিঃশব্দ, এ তো ভাবাই যায় না! এই সময় তো লাইট জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন, আড্ডা ইত্যাদি চলার কথা। লোডশেডিং বলে এরকম বিলকুল শুনশান হয়ে যেতে হয় না কি? এ কী গ্রামগঞ্জ, আটটা বাজলেই রাস্তাঘাট ফাঁকা?
অনেক কষ্টে, পা প্রায় ঘষে ঘষে এগোচ্ছিল অতীন। হঠাৎ করে কে যেন তার কাধ খামচে ধরে। সে চমকে ওঠে প্রথমে, তারপর সেই আগন্তুকের গলায় অতীন ডাক শুনে নিশ্চিন্ত হয়, কাকু, আপনি এখানে? এত রাতে? সারা পাড়া এত শুনশান কেন? সবাই কোথাও গেছে না কি? কোথাও একটা টর্চ, হ্যারিকেন, মোমবাতি কিছুই জ্বলছে না দেখছি।
