আর যদি পূজারি আর যজমান এক হন?
তিনি কি তন্ত্রবিদ?
না, এমন কি পূজাপদ্ধতিও জানেন না। নিজের খেয়ালে ফুল-বেলপাতা-ধূপ–ধুনো এইসব দিয়ে পূজা করেন। কোনও বিধিও নেই, কোনও মন্ত্রও নেই।
অবিশ্বাস-ভরা স্তম্ভিত চোখে চেয়ে থাকেন সেই বৃদ্ধ, তারপর বলেন, পূজাবিধি, মন্ত্র, নিবেদন, এসব ছাড়া দেবী মাতঙ্গীকে ভোগ? তাও আবার উচ্ছিষ্ট নয় এমন ভোগ? কে সেই বদ্ধ উন্মাদ? আপনার সেই বন্ধুপুত্র না কি? হা ভগবান, আটকান, সে উন্মাদকে এক্ষুণি আটকান! দেবীর ক্রোধ বড় সাংঘাতিক, আমাদের কল্পনার বাইরে! মৃত্যু, সাক্ষাৎ মৃত্যুর পরোয়ানা বেছে নিয়েছে সে! হায় ঈশ্বর, এ আমি কী করলাম? কেন সেই মূর্তির অন্য ব্যবস্থা করলাম না! সন্ধের অন্ধকারের মধ্যে হাহাকার করে আর্তস্বরে বিলাপ করতে থাকেন সেই বৃদ্ধ।
মুহূর্তে সমস্ত পরিবেশ আসন্ন সর্বনাশের আশঙ্কায় যেন শিউরে ওঠে। ভবেশবাবুর হাত পা কাঁপতে থাকে। সেই শিউড়ে ওঠা অন্ধকারে খানিকক্ষণের নৈঃশব্দ।
তারপর এই প্রথম মুখ খোলে সুবেশ, ইতস্ততভাবে জিজ্ঞেস করে, ইয়ে, ঠিক কী ভাবে বিপদ আসবে একটু বলতে পারবেন কি? তা হলে কিছু যদি আটকানোর ব্যবস্থা করা যেত…
বিলাপ বন্ধ করেন বৃদ্ধ, তারপর তার ফিসফিসানি শোনা যায়, যেন এই অন্ধকারের ওপার থেকে ভেসে আসছে কথাগুলো, দেবী সরস্বতীর তান্ত্রিক রূপ ইনি। ইনি বাক ও বুদ্ধির দেবী। আগে হতভাগ্যের বুদ্ধিনাশ করেন। তার বোধ, চিন্তাশক্তি হরণ করতে থাকেন। তার বেঁচে থাকার ইচ্ছে শোষণ করতে থাকেন। তাকে নোংরা, অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরতে, নোংরা জায়গায় থাকতে বাধ্য করেন। তার ক্ষুধা, তৃষ্ণা সবই কমে যেতে থাকে। জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়, বিপুল স্বাস্থ্যহানি ঘটে। তার সম্মান ও প্রতিপতি নষ্ট হয়, আত্মীয় পরিজনদের মহাদুঃখের কারণ উপস্থিত হয়।
আর তাতেও যদি সে হতভাগ্য পূজা ত্যাগ না করে, তখনই শুরু সর্বনাশের। দশমহাবিদ্যার অধীন কোনও এক পিশাচী হতভাগ্যের পিছু নেয়। মহাক্রোধী সে, মহাকালীর সহচরী, সাক্ষাৎ মৃত্যু। স্বয়ং যমও তাকে ভয় পান। তার কালান্তক লোলজিহ্বা যেন মহামারীর সমান। সে এক এক করে তার পরিবার পরিজনের প্রাণহরণ করে। তারপর বীভৎস তাড়নার পর হতভাগ্যকে হত্যা করে।
একটু ইতস্তত করেন ভবেশ, তারপর বলেন, সেই পিশাচীকে চেনার উপায়?
অন্ধকারের মধ্যেও মৃদু হাসিটা চোখ এড়ায় না কারোরই, সে আসে মানুষের বেশে, একমাত্র সিদ্ধ যোগীছাড়া তাকে কেউ চিনতে পারে না। তাকে পশুজগৎ এড়িয়ে চলে, তার ছায়া পড়েনা মাটিতে।যেখানে সে অধিষ্ঠান করে, অলৌকিক সব ঘটনা ঘটতে থাকে, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না।সে মূর্তিমান অমঙ্গল, সাক্ষাৎ মৃত্যু! দেবীর ইঙ্গিতে সে তছনছ করে দিয়ে যায় হতভাগ্যের পরিবার, বুদ্ধি, সম্মান, সম্পত্তি ও প্রাণ।
সুবেশ দেখতে পায় এই শীতেও ভবেশবাবুর কপালে বিন্দুবিন্দু ঘামের ফোঁটা। পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মোছেন প্রৌঢ় অধ্যাপক, এর কোনও প্রতিকার?
হেসে ফেলেন দ্বিজোত্তম, ভগবানের মার, দুনিয়ার বার। অন্তত আমার জানা। কোনও প্রতিকার নেই।এক যদি না অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন কোনও অসাধারণ নারী বা পুরুষ কেউ অহৈতুকী কৃপা করেন। সেরকম মানুষ আজকাল আর দেখা যায় না।
উঠে দাঁড়ান তিনজনেই, মন্দিরের চাতাল থেকে নামেন। জুতো পরে চলে যাবেন, আবার ঘুরে দাঁড়ান ভবেশ, কতদিন সময় নেয়, এই পিশাচী কাজ শেষ করতে? কাজ শেষ কথাটা বলার সময় গলাটা একটু কেঁপেই যায় ভবেশবাবুর।
এক মাস,বলেন সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, এক চান্দ্রমাস। এক অমাবস্যাতিথিতে সে হতভাগ্যের পিছু নেয়, পরের অমাবস্যার আগেই সব শেষ।
মনে করার চেষ্টা করেন ভবেশ, ডামরি যেন কবে এসেছিল অতীনের সঙ্গে, মাই গুডনেস… ওঁর গলাটা এবার থরথর করে কাঁপতে থাকে, মানে সে যদি গত মাসের অমাবস্যায় আমার বন্ধুপুত্রের পিছু নেয়, তাহলে আপনার কথামতো…
ঘোর অন্ধকারের মধ্যে একটিমাত্র আঙুল তোলেন তন্ত্রবিদ দ্বিজোত্তম মিশ্র, কালই অমাবস্যা। একদিন, আপনার বন্ধুপুত্রের আয়ু আর মাত্র একদিন।
*********
পরের দিন খুব সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যায় অতীনের। উঠেই অনুভব করে যে শরীরটা খুব ঝরঝরে লাগছে। লেপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সে, জানালাটা খুলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে কিছু দুরন্ত কুয়াশা আর একঝাক সজীব শীত ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে।বল্লমের মতন কিছু দীর্ঘ সূর্যরশ্মি ঘরের এদিক ওদিক গেঁথে যায়।
আশ্চর্য অলৌকিক ভোর।
চটপট ফ্রেশ হয়ে নেয় অতীন। তারপর এক কাপ চায়ের জন্যে বেরিয়ে ডামরির উদ্দেশ্যে হাঁক পাড়ে সে। একবার নয়, বেশ কয়েকবার।
কিন্তু কোনও উত্তর নেই।
চিন্তায় পড়ে যায় অতীন। আবার এর কী হল? ওপরে গিয়ে দেখে আসতে হচ্ছে তো!
দোতলায় গিয়ে অতীনের মনে পড়ে প্রায় দীর্ঘ দুমাস পর দোতলায় পা দিল সে। অবশ্য দোতলায় বিশেষ কিছু নেইও। দোতলার পাশ দিয়ে সিঁড়ি, সিঁড়ি বেয়ে উঠে ছাদ, আর তার পাশেই চিলেকোঠা। ডামরির যেখানে থাকার কথা।
ছাদে পা দিয়েই গা গুলিয়ে উঠল অতীনের। সারা ছাদ জুড়ে বিভিন্ন পশু ও পাখির হাড়, কাকের ভাঙ্গা বাসা, বড় বড় পালক, কাকের কাটা মাথা, এমন কি শকুন বা ওই জাতীয় কোনও পাখির দুটো কাটা পা অবধি পড়ে আছে! দুয়েকটা ভাঙা কুলো। আর ঝটা এক কোনে, তার পাশে সিঁদুরের স্তূপ আর বড় নারকেল মালায় রাখা খানিকটা কীসের তেল যেন! পাশে কিছু কালো সর্ষে ছড়ানো।
