এইখানটায় মুহূর্তের এক ক্ষুদ্র খণ্ডাংশের জন্যে অতীন যা দেখল, সেটা হয়তো সে কোনওদিনই প্রমাণ করতে পারবে না। কিন্তু দেখাটাকে সে অস্বীকারও করতে পারবে না।
মুহূর্তের সেই খণ্ডাংশে অতীন দেখে হঠাৎ যেন ডামরির সমস্ত মুখ বীভৎস কালো হয়ে গেল, চোখ দুটো লাল আর বড়ো বড়ো, মাথার চুল সাপের মতন উড়ছে, লাল ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁকা, তীক্ষ্ণ যে দুটি দাঁত বিদ্যুতের মতন ঝিকিয়ে উঠল, ও দুটি কি শ্বদন্ত?
মুহূর্তের খণ্ডাংশ, তার মধ্যেই অতীনের বুকের সেই রুদ্রাক্ষাকার স্ফটিক যেন দপ করে জ্বলে উঠল।
স্পর্ধার বিরুদ্ধে স্পর্ধার মতন!
ওই, মুহূর্তের খণ্ডাংশ মাত্রই। তারপরেই ডামরি একগাল হেসে বলল, বলো। দাদাবাবু, ডাকলে?
অতীন ভ্রু কুঁচকে বলে, জামাকাপড় এত নোংরা, তুমি কি এসব দেখো না? কাল যেন পরিষ্কার জামাকাপড় পাই। এসব কাল সকালে উঠেই কেচে ফেলবে। নোংরা কাপড় আমি পছন্দ করি না।
ডামরির ঠোঁট হাসে, চোখ হাসে না!
অতীন স্নান করে, গিজার চালিয়ে। গলার অদ্ভুত স্ফটিকটাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। বিশেষ কিছুই খুঁজে পায় না। কাঁচের তৈরি স্ফটিকখণ্ড, একটু ভারী এই যা!
স্নান করে অতীন রোজকারমত রক্তবস্ত্র ধারণ করে। তারপর স্টাডিরুমের দরজা খুলে দাঁড়ায়।
বদ্ধ স্টাডি রুম, জানলাগুলো গত দেড়মাস ধরেই বন্ধ। একটা চাপা এঁটোকাটার গন্ধ ঘরের বাতাস আরো ভারী করে তুলেছে। রাস্তার দিকের জানলার ফাঁক দিয়ে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো চুঁইয়ে আসছে। অতীন স্পষ্ট দেখল সেই দেবীমূর্তির মাথার কাছে একটা বিন্দুবৎ লাল আলো জ্বলে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে অতীন লক্ষ্য করল যে, ওর বুকের স্ফটিকনির্মিত রুদ্রাক্ষটি মৃদু নীল আলো জ্বালাতে শুরু করেছে। হঠাৎ ঘরের মধ্যেই হাওয়ায় একটা চাপা ঘূর্ণি অনুভব করল অতীন। মেঝে থেকে দটো। মুখোমুখি হওয়ার স্রোত যেন লড়াই করতে করতে ওপরে উঠছে। খুবই হালকা করে। দুটো সাপের তীব্র শিসের শব্দও যেন শুনল অতীন। আলো জ্বালাল অতীন। তারপর দৃঢ় পায়ে গিয়ে জানালাগুলো খুলে দিল। দেড়মাসের পর, এই প্রথমবার।
এরপর অতীন নিজের মতন পূজাপাঠ শুরু করে দিল, যা সে গত দেড়মাস ধরে করে এসেছে। পূজা শেষে দাঁড়িয়ে উঠে হুঙ্কার দেয় অতীন, ডামরি, ভোগ কই?
অন্যদিনের মতন কিন্তু ডামরী আর গলবস্ত্র হয়ে ভোগ নিয়ে আসে না, দরজার কাছেই থালা রেখে যায়, পাশের রান্নাঘরের দরজা থেকে মৃদুস্বর ভেসে আসে, ভোগটা নিয়ে নিন দাদাবাবু, শরীলটা ভালো নেই আজ।
ভোগের থালা তুলে নিয়ে এসে মায়ের সামনে রেখে প্রণাম করে অতীন। তারপর নিজের হাতে স্টাডিরুমের তালাচাবি বন্ধ করে। ডামরিকে জানিয়ে দেয় যে আজ তার। খিদে নেই, কোথাও রুটি তরকা জিলিপি খেয়ে এসেছে। তারপর নিজের ঘরে শুতে যায় অতীন।
বড় গাঢ় ঘুম হয় অতীনের সেদিন। প্রশান্ত, নিশ্চিত, নির্ভার ঘুম। হায় অতীন যদি জানত, কত সহস্র ছায়ামূর্তি তার ঘরের আশেপাশে নিষ্ফল আক্রোশে, রক্তক্রোধে ঘন হয়ে ঘুরছে আর মাথা কুটে মরছে।
সারারাত অতীনের বুক থেকে জুলা এক নীলাভ আলো সারা ঘর অধিকার করে। রইল।
*********
দ্বিজোত্তম খানিকক্ষণের জন্যে দম নিয়ে নেন, তারপর শুরু করেন,
দেবী মাতঙ্গীকে বলা হয় সরস্বতীর তান্ত্রিকরূপ। নিগুঢ় অতিপ্রাকৃত শক্তিলাভের জন্যে তান্ত্রিকরা এঁর সাধনা করেন।শত্রুনাশ, বশীকরণ ও গুঢ়বিদ্যা আহরণ করার জন্যে। এর পূজাই প্রশস্ত। দেবী প্রসন্ন হলে মহাবিদ্যা দান করেন, সাধকের ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়। কিন্তু এঁর পূজাপদ্ধতি অতি কঠোর। সিদ্ধ সাধক ছাড়া এঁর পূজা সম্ভব না। সামান্য বিচ্যুতিতে দেবী ক্রোধাবিষ্ট হন, সংকল্পকারীর মহাসর্বনাশ উপস্থিত হয়।
বলা হয় ইনি চণ্ডালরাজ মাতঙ্গের কন্যা। দেবী তাই চণ্ডালিনীরূপে পূজিতা হন। দেবী বন-জঙ্গল-পশু-পাখি ইত্যাদির রক্ষাকত্রী, এবং যৌবনমদমত্তা। মত্ত মাতঙ্গা যেমন হয়!
দেবী মাতঙ্গীর উল্লেখ আছে বৌদ্ধতন্ত্রেও এবং একই রূপে।তাই বোধহয় সহস্রাক্ষ এই দেবীকেই বেছে নিয়েছিলেন তার অভীষ্টসিদ্ধির জন্যে। আপনারা যে মূর্তিটি নিয়ে গেছেন, ওটি দেবীর রাজ-মাতঙ্গী রূপ। খেয়াল করে দেখবেন, দেবীর পায়ের কাছে খুব ক্ষুদ্র দুটি শুকপাখি আছে, যাদের আমরা বলি টিয়াপাখি!
দেবী মাতঙ্গীর পূজার একটি বিশেষ বিধি আছে যা বাকি সমস্ত দেবদেবীদের থেকে আলাদা। ইনি যা কিছু অশিষ্ট, অপবিত্র, নোংরা, ফেলে দেওয়া হয় তার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্টই এর খাদ্য, রজঃস্বলা নারীর রক্তরঞ্জিত লাল কাপড় এঁর পরিধেয়।
অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলেন ভবেশ, কেন ঠাকুরমশাই, আমরা তো পরিশুদ্ধ না হলে ঈশ্বর আরাধনার কথা চিন্তাও করতে পারি না। এই দেবীর আরাধনার এই রীতি কেন?
মৃদু হাসেন সেই তন্ত্রজ্ঞ বৃদ্ধ। বলেন, তন্ত্রে অশুচিরও স্থান আছে এইটে বোঝাতে। মহামায়ার আনন্দযজ্ঞে সবারই অধিকার। যা কিছু বন্য, যা কিছু প্রাকৃতিক, শোভন, অশোভন, শুচি, অশুচি সবই সেই জগদ্ধাত্রীর অংশ, তা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে। দেবী উচ্ছিষ্ট খাদ্যই ভোগ হিসেবে নেন, তাই দেবী মাতঙ্গীর আরেক নাম উচ্ছিষ্ট চণ্ডালিনী।
আর সেই জন্যেই এনাকে ভোগ দেওয়ার একটি বিশেষ বিধি আছে।ইনি বাকিদের মতন সাজিয়ে গুছিয়ে দেওয়া ভোগ গ্রহণ করেন না। যেমন বলেছি,ইনি শুধুমাত্র উচ্ছিষ্ট আহার স্বীকার করেন। অন্যথায় দেবী ভোগ নেন না এবং ক্ষুধার্ত দেবীর ক্রোধ কালান্তক হয়ে নেমে আসে যজমানের ওপর। পূজারিও তার কোপ এড়াতে পারেন না। কাঠ হয়ে যায় ভবেশবাবুর সমস্ত দেহ, সুবেশও সতর্ক হয়ে ওঠে।
