এতটুকু বলে সেই বৃদ্ধ থামলেন, তারপর চোখ সরু করে জিজ্ঞাসা করলেন, তন্ত্রের অভিচার ক্রিয়া নিয়ে কোনও ধারণা আছে শিক্ষক মশাই?
গলা খাঁকারি দেন ভবেশবাবু, তারপর বলেন, জানি বই কী। মারণ, উচাটন, স্তম্ভন ইত্যাদি।
খানিকক্ষণ চুপ থাকেন দ্বিজোত্তম, তারপর আরও ধীর গলায় বলতে থাকেন, হিন্দু ও বৌদ্ধতন্ত্র মিলিয়ে যা যা অভিচারক্রিয়া শিখেছিলেন সহস্রাক্ষ, তাই দিয়ে তিলে তিলে মূর্তির বীজক্রিয়া তৈরি করেছিলেন। ফল ফলতে বেশি সময় নেয়নি, শাসক রিন্সপাংম্পা রাজবংশ সবংশে ধ্বংস হয়। কর্মা সেন্তেন সমগ্র তিব্বতের রাজা হন।
এর পর কর্মা সেন্তেন সহস্রাক্ষের ওপর চাপ দিতে থাকেন মূর্তিসহ তার কাছে থেকে যেতে। রাজগুরুর পদ নিতেও অনুরোধ করেন। কিন্তু বিধির লীলা বোঝা বড় দায়। উড়ে বেড়ানো পাখিকে কি আর সোনার খাঁচায় বন্দি রাখা যায়? আর সহস্রাক্ষ এও জানতেন, ওই পৈশাচিক শক্তির আকরস্বরূপ মূর্তিটি আর কোনও নিম্নগোত্রীয় তান্ত্রিকের হাতে গেলে কী প্রলয় ঘটতে পারে।
ফলে একঝড়জলের রাতে অন্ধকারে মূর্তিটি নিয়ে সহস্রাক্ষ পালিয়ে যান। না, উনি আর গুরুর কাছে যাননি, তা হলে মূর্তিটা বাঁচানো যেত না। উনি সোজা ফিরে আসেন। নিজের বাড়ি, এই বামুনগাছিতে।
এখানে এসে মহা সমারোহে সেই মূর্তিটি নিজের জমিদারবাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন। আর তার নিত্য তান্ত্রিকপূজার ভার পড়ে আমাদের পূর্বপুরুষ, দনুজদমনের হাতে।
দনুজদমন কালীভক্ত ছিলেন, তান্ত্রিক ছিলেন না। সহস্রাক্ষ তাকে নিজের হাতে বামাচারী তন্ত্রসাধনা শেখান। গুরু উপযুক্ত শিষ্যই পেয়েছিলেন বটে। কোনও এক তান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তিনি দনুজদমনকে নিয়ে রক্তপ্রতিজ্ঞা করিয়ে নেন যে, যতদিন এই জমিদারবাড়ি চক্রবর্তী বংশের নামে থাকবে, ততদিন দনুজদমনের বংশধররা সেই সহস্রাক্ষের আনা মূর্তির নিত্য তন্ত্রসেবা করে যাবে। সেই মূর্তির জোরে ব্রিটিশ শাসন, মন্বন্তর, দুখানা বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা, দেশভাগ কোনও কিছুর অচইএ বাড়িতে পড়েনি। আর সেই থেকে আমরা, মিশ্র পরিবারের প্রতিটি সন্তান তন্ত্রজ্ঞ এবং বংশানুক্রমে চক্রবর্তী পরিবারের পুরোহিত।
সহস্রাক্ষ কিন্তু এরপরেও সংসারে থাকেননি। দাদা বিশ্বেশ্বর মারা যান বছর দুয়েক বাদে। যেদিন শ্রাদ্ধশান্তি শেষ হয়, সেদিনই উনি বিশ্বেশ্বরের ছেলে বিশ্বনাথের নামে বিশেষ হোমযজ্ঞ করেন, বিশ্বনাথ তখন বিয়াল্লিশ বছরের যুবক। আর সেইদিন রাতে তিনি দ্বিতীয় ও শেষবারের মতন গৃহত্যাগ করেন। এর পরে তার খোঁজ আর কেউ পায় নি!
এটাই কি সেই স্ট্যাচু যেটা আমাকে দিয়েছিলেন? তড়বড় করে বলে ওঠে সুবেশ।
ম্লান হাসেন সেই বৃদ্ধ পুরোহিত, হ্যাঁ বাবা। সেইরকমই নির্দেশ ছিল দনুজদমনের নিজেদের বংশধরদের প্রতি। যেদিন চক্রবর্তী বংশের উত্তরাধিকারী এই প্রাসাদকে আর নিজেদের বাড়ি বলবে না, সেইদিনই যেন আমরা যেনতেনপ্রকারেণ এই মূর্তির মায়া ত্যাগ করি।
কিন্তু কেন ঠাকুর? কে এই দেবী? এত তন্ত্রবিদ্যা প্রয়োজন কেন? ইনি এত ভয়ংকরীই বা কেন? কে ইনি?
ফের খানিকক্ষণ চুপ থাকেন দ্বিজোত্তম, তারপর বলেন, এটি আসলে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মন্ত্রসিদ্ধ দশমহাবিদ্যা মূর্তি। আগেই বলেছি আপনারা যদি খুব ভালো করে মূর্তিটাকে দেখতেন, তা হলে বুঝতে পারতেন যে আদতে এটি হিন্দুমূর্তি এবং ইনি দশমহাবিদ্যার কোনো দেবী।
কে ইনি? কোন দেবীর মূর্তি ঠাকুর?! প্রায় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করেন ভবেশ ভট্টাচার্য।
একটা আবছা আতঙ্কের ছায়া খেলে গেল চক্রবর্তী বাড়ির শেষ পুরোহিত দ্বিজোত্তমের চেহারাতে। তিনিও মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলেন, ইনি যে সে দেবী নন। ইনি দশমহাবিদ্যার নবম মহাবিদ্যা, ভয়ংকরী দেবী মাতঙ্গী।
**********
মেট্রোয় করে বাড়ি আসার সময় অতীনের একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।যেন মাথাটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেছে, কী যেন একটা ছিল, এখন নেই।কীসের যেন কী একটা মগজে চেপে ছিল, আস্তে আস্তে গুঁজে গুঁড়ো হয়ে উড়ে যাচ্ছে, যেন সেই উড়ে যাওয়াটাও টের পাচ্ছে অতীন। মাথার মধ্যে একটা ঠান্ডা শিরশিরানি ভাব, শীতের রাত্রে কর্পূর। দেওয়া জলে স্নান করার মতন। মস্তিষ্কের পরত কেটে কে যেন ভাবনাগুলোকে আরও সতেজ, সুতীক্ষ্ম করে তুলছে।
বাড়ির একটা চাবি ওর কাছে থাকেই। রাতে বাড়ি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একটা অস্বস্তিকর চাপা গন্ধ যেন পাঁচিলের মতন সামনে দাঁড়াল অতীনের। যেন সে পাঁচিল। গায়ের জোরে ভেঙে অতীনকে ঢুকতে হবে।
ঠিক এই মুহূর্তে অতীন খেয়াল করল, তার বুকের কাছে থাকা রুদ্রাক্ষ স গরম হয়ে উঠেছে। তাতে বুকে ছ্যাকা লাগছে না বটে, কিন্তু গরম হওয়াটা স্পষ্ট বোঝা। যাচ্ছে। অতীন দরজার পাশে, শু-ব্যাকের সামনে চপ্পল খোলে, তারপর জামা খুলতে খলতেই নিজের টকপচা ঘামের গন্ধে ওয়াক তোলে, ইশ, কদ্দিন কাঁচা হয়নি জামাটা? তারপর ট্রাউজারের দিকে নজর যায়, নোংরা ধুলোপড়া, ঘাম-নুনের সাদা দাগওয়ালা এই ট্রাউজার্সটা পরে ও ঘুরছে?
হঠাৎ মাথা গরম হয়ে যায় অতীনের, বাড়িতে কাজের লোক রেখেও এই অবস্থা কেন? চেঁচিয়ে ডাকে, ডামরি, ডামরি, গেলে কোথায়?
রান্নাঘর থেকেই ডামরি ছুটে আসে এবং অতীনের দিকে চোখ পড়তেই সবেগে ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
