পলকে দ্বিজোত্তম মিশ্রের দুই পা ধরে ফেলেন ভবেশবাবু। সুবেশ এতক্ষণ কাঠ হয়ে ছিল, এবার সেও কিছু একটা খুঁজতে থাকে ধরার জন্য। অবশেষে কিছু না পেয়ে। সোজা উপুড় হয়ে শুয়েই পড়ে।
ভবেশবাবুর গলা কেঁপে যায়, ঠাকুর! আমি বিয়ে করিনি, আমার ত্রিসংসারে কেউ নেই। ছোটবেলার বন্ধুর এক সন্তান, তাকেই নিজের সন্তান বলে জেনেছি। তার আজ বড় বিপদ ঠাকুর। এই মূর্তি সে ঘরে নিয়ে গিয়ে ইচ্ছেমত ছেলেখেলা করেছে। ফলে তার জীবনে আজ ঘোর কালরাত্রি নেমে এসেছে ঠাকুর, তার জীবন বিপন্ন। আমি ব্রাহ্মণ, সদ্বংশের ছেলে, জীবনে কোনওদিন মিথ্যে বলিনি, লোক ঠকাইনি। কিন্তু ওই ছেলেটি আমার নিজের, ঠাকুর।ওকে বাঁচান, মা মহামায়া আপনাকে আর্শীবাদ করবেন।
খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকেন দ্বিজোত্তম মিশ্র। তারপর যখন মাথা তোলেন তখন ওঁর মুখের রেখা অনেক কোমল হয়ে এসেছে। মন্দিরের সামনে চাতাল থেকে আকাশ দেখা যায়। মধ্য ডিসেম্বরের সন্ধ্যা, আকাশ কালচে নীল। স্নিগ্ধ সন্ধ্যাতারাটি ফুটে উঠেছে পশ্চিমে। সেদিকে তাকিয়ে অতীতমগ্ন হন বিখ্যাত বামাচারী তান্ত্রিক দ্বিজোত্তম মিশ্র।
আপনাদের যা বলব সে সব কাহিনি শুধু মৌখিকভাবেই আমাদের বংশপরম্পরায় চলে আসছে, এর কোথাও কোনও লিখিত প্রমাণ নেই।
আমাদের পূর্বপুরুষ দনুজদমন মিশ্র মুন্ডাসর্দারের দেওয়া কালীমূর্তি পেয়ে রাজা। চন্দ্ৰ মল্লর কাজ ছেড়ে পালিয়ে আসেন এই এলাকায়। তখন এলাকার জমিদার ছিলেন। বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী। তিনিও প্রবলপ্রতাপ জমিদার ছিলেন। বাংলাদেশে তখন হুসেন শাহের জমানা। এদিকে শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণবভাবধারায় গোটা বাংলা-বিহার-ওড়িশা ডুবুডুবু। কিন্তু বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী ছিলেন ঘোর শাক্ত। তার এলাকায় বৈষ্ণবরা মাথাই গলাতে পারেনি তেমন।
বিশ্বেশ্বরের এক ভাই ছিলেন, সহস্রাক্ষ চক্রবর্তী। ইনি ব্রাহ্মণ হলেও বিভিন্ন ভেষজ ও প্রাণিজ বিষ সম্পর্কে আশ্চর্য জ্ঞান ছিল। লোকমুখে প্রবাদ, রাজগোখরো অবধি নাকি সহস্রাক্ষ চক্রবর্তীর নাম শুনে মাথা নিচু করে পথ ছেড়ে দিত।
বছর তিরিশেক বয়সে সহস্রাক্ষ হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। বিশ্বেশ্বর বয়সে অনেক ছোট গুণী ভাইটিকে নিজের সন্তানসম স্নেহ করতেন। তিনি পাগলের মতন খোঁজ করেন, কিন্তু সহস্রাক্ষের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না।
ঠিক বছর কুড়ি বাদে সহস্রাক্ষ আবার ফিরে আসেন এই জমিদারিতে। বিশ্বেশ্বর। তখন প্রায় পঁয়ষট্টি বছরের প্রৌঢ়, তার নিজের সন্তানই প্রায় চল্লিশ বছরের তখন। তাও তিনি সহস্রাক্ষকে জমিদারির ভার নিতে অনুরোধ করেন।
কিন্তু যে সহস্রাক্ষ গেছিলেন, তিনি যুবক বিষবৈদ্য। যিনি ফিরেছেন, তিনি ঘোষ বামাচারী তান্ত্রিক। তিনি রক্তাম্বর ছাড়া কিছু পরেন না, স্বপাক ছাড়া আহার করেন না, সারা মুখে দাড়িগোঁফ আর জটাজুট ।তিনি শুধু বামাচারী তান্ত্রিক সন্ন্যাসী নন, তিব্বতীয়। বজ্রযানতন্ত্রও তার করায়ত্ত তখন। জমিদারি নেওয়া তো দূরস্থান, এসেই কী একটা যজ্ঞ করে ঘোষণা করলেন যে, এরপর থেকে চক্রবর্তী পরিবারে যেই কখনও কোনও ভ্রাতবিরোধ শুরু করবে, তার সর্বনাশ হবে। পুত্রসম ভ্রাতুস্পুত্রকে কী একটা যজ্ঞসম্ভব। মাদুলি বানিয়ে দিলেন, যাতে তার ও তার বংশজদের সম্পত্তিলাভ নিষ্কণ্টক ও নির্বিঘ্ন। হয়। যেন কোনও ভ্রাতৃদ্রোহের ছায়া এ বাড়ির আনাচে-কানাচে না পড়ে।
এতটা বলে দম নিলেন দ্বিজোত্তম। পরের রাউন্ডের চায়ের আদেশ দেন, তারপর শুকনো ঠোঁট চেটে বলতে থাকেন,
ক্রমে জানা যায়, সহস্রাক্ষ পালিয়ে প্রথমে নেপাল ও তারপর তিব্বতে গেছিলেন। নেপালের তরাই অঞ্চলে এক তান্ত্রিকের কাছে বামাচারে দীক্ষা নেন। বছর দশেক সেখানে থেকে চলে যান তিব্বত। সেখানে তখন বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের গৌরবময় অধ্যায়। চলছে। সহস্রাক্ষ এক বিখ্যাত তান্ত্রিক গুরু জুটিয়ে বজ্রযান তন্ত্রসাধনায় মগ্ন হন।অত্যন্ত মেধাবী হওয়ার দরুন খুব তাড়াতাড়ি সহস্রাক্ষ বজ্রযানের সবকটি মার্গ অতিক্রম করতে পারেন। সঙ্গে সহজাত বিষবৈদ্যগিরি তো চলছিলই।
তিব্বতে তখন ভয়ানক অরাজক সময়। গের উপজাতীয় শাসক রিন্সপাংশা রাজবংশের শেষের শুরু।রাজধানী শিগাৎসের গর্ভনরকর্মা সেন্তেন বিদ্রোহী হয়েছেন। তিনিই গোপনে সহস্রাক্ষের গুরুকে ডেকে পাঠান, তন্ত্রশক্তির সাহায্যে জয়ী হওয়ার জন্যে ।
সেই তিব্বতীয় ধর্মগুরু নিজে গেলেন না, পাঠালেন সহস্রাক্ষকে। সহস্রাক্ষ গিয়ে দেখলেন অবস্থা খুবই সঙ্গীন। ইতিমধ্যেই কৰ্মা সেন্তেনের একমাত্র মেয়ে শত্রুপক্ষের কূটচালে মরোমরো প্রায়। সহস্রাক্ষ আবিষ্কার করলেন যে মেয়েটি ধীর বিষক্রিয়ার শিকার। তার সতর্ক বিষনিবারণী বিদ্যার দৌলতে সামন্তকন্যার দ্রুত রোগমুক্তি ঘটে।
কিন্তু এতেই ঝামেলা শেষ হল না। যারা চাইছিল কন্যাকে মেরে কর্মা সেন্তেনকে দুর্বল করবে, তারা এবার সহস্রাক্ষের পিছনে পড়ল। তখন সহস্রাক্ষ এই মূর্তিটি বানান।
আপনারা যদি খুব ভালো করে মূর্তিটাকে দেখতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন যে আদতে এটি হিন্দুমূর্তি, সহস্রাক্ষের কাছে মৌখিক বর্ণনা শুনে এক তিব্বতীয় মূর্তিকার বানিয়েছে বলে দেখলে তিব্বতীয় মনে হয়। এই মূর্তি তৈরি হবার পর এক অমাবস্যায় রাত্রে, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণও ছিল সেদিন, সহস্রাক্ষ নিজে এর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন।
