*********
ওঁ করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাম।
কালিকাং দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালাবিভষিতাম।
সদ্যশ্ছিন্নশিরঃ খড়্গবামাধোর্ধ্বকরাম্ভুজাম।
অভয়ং বরদঞ্চৈব দক্ষিণোর্ধ্বাধঃপাণিকাম।
মহামেঘপ্রভাং শ্যামাং তথা চৈব দিগম্বরীম।
কণ্ঠাবসক্তমুণ্ডালী-গলদ্রুধিরচৰ্চিতাম।
কর্ণাবতংসতানীতশবযুগ্মভয়ানকাম।
ঘোরদ্রংষ্টাং করালাস্যাং পীনোন্নতপয়োধরাম।
একমনে পুজো করছিলেন দ্বিজোত্তম মিশ্র। প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তি ওঁর বাড়িতে। মায়ের সান্ধ্যকালীন নিত্যপূজাটিই উনি করে থাকেন।
দিনের বাকি কাজ অবশ্য ওঁর পুত্রবধূই করে। ছেলে ব্যাঙ্কের চাকুরে, দরকারে সেও হাত লাগায়। আর এখন তো সারাদিনের জন্যই তো মা নিজের পূজার দায়িত্ব ওঁর কাঁধে তুলে দিলেন। জমিদারবাড়িতে কর্তব্যকর্ম তো ফুরালো। অবশ্য ওঁর নিজের বয়েসই কি খুব কম হল? সামনের জ্যৈষ্ঠমাসে আশিতে পা দেবেন উনি। মা নিজেই তার সন্তানের ভার লাঘব করছেন ধীরে ধীরে।
পূজা শেষ হলে সাষ্টাঙ্গে মাকে প্রণাম করেন উনি। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়েই, থমকে যান।
ঠিক ঠাকুরঘরের সামনেই দুইজন ভক্তি সহকারে বুকের কাছে হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে আছেন। একজন বয়স্ক, আরেকজন তরুণ। এদের পেছনে ওঁর পুত্রবধূ, তিনি মৃদুস্বরে জানালেন, বাবা, এঁরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন কলকাতা থেকে, বলছেন খুব জরুরি দরকার । আপনি পুজো করতে ব্যস্ত ছিলেন বলে আর আপনাকে বিরক্ত করিনি।
দুইজনের মধ্যে যিনি বয়স্ক, তিনি দুহাত তুলে একটু মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার করেন, নমস্কার ঠাকুরমশাই। আমার নাম ভবেশ ভট্টাচার্য। কলকাতা থেকে আসছি।এককালে কলেজে ইতিহাস পড়াতাম, এখন রিটায়ার্ড । আর আমার সঙ্গে এই ছেলেটির নাম সুবেশ আগরওয়াল। পার্ক স্ট্রিটে ওর একটা দোকান আছে পুরোনো জিনিসপত্রের। আপনি বোধহয় আগে দেখেছেন ওকে। _ সুবেশ প্রায় কোমর অবধি ঝুঁকে প্রণাম জানায়, জায়গা পেলে বোধহয় শুয়েই পড়ত। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে জানায়, সেই মাস দুয়েক আগে এই জমিদারবাড়ির পুরোনো জিনিসপাতি কিনে নিয়ে গেছিলাম, আপনি একটা মূর্তি দিলেন ফ্রি অভ কস্ট, মনে নেই?
দ্বিজোত্তম মিশ্রের মুখে বিস্ময়, ভয়, আতঙ্ক– সবকটি ভাবের ছায়া খেলে যায়। একসঙ্গে– তারপর স্মিতহাস্যে বলেন, হ্যাঁ, হা, মনে আছে বই কী, বিলক্ষণ মনে আছে। বলুন ভাই, কী সেবা করতে পারি আপনাদের! বলেই পুত্রবধূকে বলেন, মা, আমাদের সবার জন্যে এককাপ করে চা এনে দাও না। শুনেই সেই মহিলা দ্রুতপায়ে। ভেতরে চলে যান।
এইখানেই বসি ঠাকুরমশাই? আহা মায়ের মুখটি বড় সুন্দর। জগজ্জননী মহামায়া, মা মা গো!, ফের যুক্ত করে প্রণাম করেন ভবেশ ভট্টাচার্য।
প্রীত হন দ্বিজোত্তম। মন্দিরের চাতালেই পদ্মাসনে বসেন। মুণ্ডিতমস্তক, ঋজ। দেহ, চোখে প্রগাঢ় প্রশান্তি।
বলেন, এই মূর্তি বিশেষভাবে প্রাপ্ত, বুঝলেন। আমাদের এক পূর্বপুরুষ। বহুভাষাবিদ ছিলেন। মল্লভূমের মল্লরাজাদের নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছেন, ও আপনি। তো ইতিহাসের অধ্যাপক। তা আমাদের এই পূর্বপুরুষ নাম দনুজদমন মিশ্র রাজা চন্দ্র মল্লর কাছে চাকরি করতেন। তার কাজ ছিল মল্লভূমবাসী সাঁওতাল আর। মুন্ডাদের সঙ্গে রাজার যোগযোগ রক্ষা করা। একবার ভুল বোঝাবুঝির কারণে মহা। অনর্থ উপস্থিত হয়, রাজা আদিবাসীদের উৎখাত করার আদেশ দেন। চন্দ্র মল্ল প্রবল প্রতাপশালী পুরুষ ছিলেন। আমার পূর্বপুরুষ রাজাকে অনেক বুঝিয়ে, সুকৌশলে রাজার। ক্রোধ প্রশমিত করেন। কৃতজ্ঞচিত্তে মুন্ডাসর্দার তাদের পূজিত দেবীকে আমাদের সেই পূর্বপুরুষকে উপহার দেন। সেই থেকে কষ্টিপাথরের এই মূর্তি আমাদের গৃহদেবী।
সুবেশের চোখ দেখেই বোঝাই যাচ্ছিল সে ভক্তিভরে প্রণাম করবে, না এই অমূল্য মূর্তিটির দাম আন্দাজ করবে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এক চোখে শ্রদ্ধা, আর এক চোখে প্রফিট।
ততক্ষণে চা এসে গেছিল। তাতে চুমুক দিতে দিতে ভবেশবাবু সরাসরি আসল। প্রসঙ্গে চলে আসেন, ঠাকুরমশাই, আপনি একটি দেবীমূর্তি আমাদের এই সুবেশকে এমনি-ই দিয়ে দিয়েছিলেন। সেই মূর্তিটির ব্যাপারেই কিছু জিজ্ঞাস্য ছিল।
দ্বিজোত্তম চোখের পলক অবধি ফেললেন না বটে, কিন্তু মুহূর্তের জন্য, চকিতে সারা শরীরটা একবার কাঠ হয়ে উঠল।
মৃদু হাসলেন ভবেশবাবু। ইনভলান্টারি ডিফেন্স মেকানিজম। দেয়ার মাস্ট বি। সামথিং রং, টেরিবলি রং।
দ্বিজোত্তম গলা খাঁকারি দিয়ে বেশ স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, সে তো মাস দুয়েক আগের কথা। মূর্তি একটা ছিল বটে, দিয়ে দিয়েছি। এমন কি তার দাম অবধি নিইনি। তা সেই নিয়ে এত প্রশ্ন কীসের? আমার তো আর কোনও দায় নেই।
দায়ের কথা আসছে কোথা থেকে ঠাকুরমশাই? আমরা তো আপনাকে কোনও দোষারোপ করিনি। আপনার কি মনে হয় এই মূর্তি থেকে আপনার কি কোনও দায়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে?
পলকে সাদা হয়ে যায় দ্বিজোত্তম মিশ্রের চোখমুখ, তারপর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলেন, আপনারা কি আমাকে ভয় দেখাতে এসেছেন? আপনি জানেন আমি কে? আমরা ঊধ্বর্তন বিশ পুরুষের তান্ত্রিক পরিবার। আপনি জানেন আমি কি করতে পারি আর কি করতে না পারি? আপনারা ভেবেছেন কী? আমি কি আপনাদের চাকর যে কৈফিয়ত দিতে হবে আপনাদের?
