পাশের দিকে তাকায় অতীন।এই প্রায় অন্ধকারের মধ্যে লোকটা কখন এসে পাশে। বসেছে সেটা খেয়ালই করেনি অতীন। দেখে অবশ্য ভিখিরি বা চোর ছ্যাঁচড় মনে হয় না। ফরসা, বেঁটেখাটো একটা লোক, সাধারণ একটা হাফ শার্ট আর ট্রাউজার্স পরনে। চোখ দুটো আশ্চর্য রকমের উজ্জ্বল, তাতে যেন কৌতুক খেলা করছে।
অতীনের একটু মায়া হল। হাতের রুটিটা ছিঁড়ে দুভাগ করল সে, তারপর ডানহাতের ভাগটা তুলে দেয় লোকটার হাতে, জিলিপির ঠোঙাটা এগিয়ে দেয়।
লোকটা রুটির টুকরোটা নিয়ে খানিকক্ষণ অদ্ভুতভাবে চেয়ে রইল অতীনের দিকে, তারপর জিজ্ঞেস করল, ডানহাতের বড় টুকরোটাই দিলেন যে? বাঁহাতের ছোটোটাও তো দিতে পারতেন?
অতীন একটু অপ্রস্তুত হয়, অত কিছু মনে করে দিইনি। আপনি বললেন খিদে পেয়েছে… আর নগিন্দর তো একটু পরে বানিয়ে দিচ্ছেই…
লোকটা রুটির টুকরোটা নিয়ে মাথায় ঠেকায়, তারপর স্পষ্ট সংস্কৃতে বলে, শ্রদ্ধয়া দেয়ম, শ্রীয়া দেয়ম, বলেই রুটিটা মুখে পুরে পরম তৃপ্তির সঙ্গে চিবোতে থাকে।
কী জানি, লোকটাকে বেশ ভালো লেগে যায় অতীনের, নিজের রুটির টুকরোটা জিলিপি দিয়ে চিবোতে চিবোতে বলে, দাদার বাড়ি কোথায়?
লোকটা নিমীলিত চোখে বলে, অনেক দুর দাদা, নবদ্বীপ। নদিয়া ডিস্ট্রিক্ট।
হুমম, তা বেশ সংস্কৃত জানেন দেখছি। কী করা হয়?
ওই আর কী দাদা, ছাত্র ঠ্যাঙানো আর পুজোআচ্চা। পারিবারিক ব্যবসাই বলতে পারেন, হে হে।
ও আপনি টিচার? আরে আগে বলবেন তো। আমার বাবাও প্রফেসর ছিলেন।
বাহ, ভালো ভালো। সমস্ত দানের মধ্যে শিক্ষাদান হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম দান।
তা দাদা হঠাৎ নবদ্বীপ ছেড়ে কলকাতার শ্মশানে?
আর দাদা, বলবেন না, একটা বই লিখেছি, বুঝলেন, সেই নিয়ে পাবলিশারের সঙ্গে কথা বলব বলেই কলেজ স্ট্রিটে আসা। তা কাজ হয়ে গেল, ভাবলাম একবার ঘুরেই যাই। শ্মশান অতি বিশুদ্ধ স্থান, চিত্ত পরিষ্কার হয়…
আরিব্বাস, আপনি বইও লেখেন না কি? আরে বাহ। তা কীসের বই?
ওই, পুজোপাঠের বই দাদা। এদিক ওদিক থেকে বিভিন্ন পুজো, প্রথা, তন্ত্র, মন্ত্র, এক জায়গায় নিয়ে একটা সংকলন মতো করেছি। তেমন বিশেষ কিছু না…
বাহ বাহ, পূজারি মানুষ, তন্ত্র মন্ত্র এসব দিকেও ইন্টারেস্ট আছে, আপনি তো ইন্টারেস্টিং লোক মশাই। বহুদিন বাদে কারও সঙ্গে কথা বলতে পেরে অতীনের সত্যিই খুব ভালো লাগছিল।
তন্ত্রমন্ত্র তেমন ইম্পর্ট্যান্ট কিছু না দাদা। মানুষকে ভালোবাসার থেকে বড় তন্ত্র আর কিছু হয় না। এই যে আপনি একটা মাত্র রুটি দুইভাগ করে ভালোবেসে বড়ভাগটা ডান হাতে আমার হাতে তুলে দিলেন, এর চেয়ে বড় তন্ত্রমন্ত্র কিছু আছে না কি? বুঝলেন, অনেক পুজোপাঠ করে এই সার বুঝেছি, ভালোবাসা হল সবচেয়ে বড় তন্ত্র, সবচেয়ে বড় যাদু
অতীন চুপ করে রইল। ভদ্রলোক তীক্ষ্ণ চোখে একবার তাকান অতীনের দিকে, তারপর বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়েই থাকেন। বাপরে, সে কী দৃষ্টি! অতীন সিটিয়ে যায়। তারপর আপনমনে বলেন, তিনি ত্রিগুণাতীতা, রাজরাজেশ্বরী। অপশক্তির সাধ্য কী তার সন্তানের ক্ষতি করে? বলে পকেট থেকে একটা কী বার করলেন।
অতীন দেখল একটা লালসুতোর মালা, শুধু একটি রুদ্রাক্ষ আকারের স্ফটিক আছে। তাতে, আর কিছু নেই। অতীন কিছু বলবার আগেই ভদ্রলোক একটু ঝুঁকে মালাটা পরিয়ে দেন অতীনকে, তারপর হাসিমুখে বলেন, নিন দাদা, একটা জিনিস দিয়ে গেলাম। কক্ষনো গলা থেকে খুলবেন না। যখন এর কাজ শেষ হবে, আপনা থেকেই। আমার কাছে চলে আসবে। আহা, ব্যস্ত হতে হবে না। নিরন্ন ক্ষুধার্তকে যিনি নির্দ্বিধায়। নিজের গ্রাস তুলে দিতে পারেন, মহামায়া তাকে রক্ষা করুন।
অতীন প্রথমে হতচকিত ও পরে বিরক্ত হয়ে ওঠে, তারপর বলে, আরে, কথা। নেই বার্তা নেই, ও দাদা কী পরিয়ে দিয়ে গেলেন? আরে এ জিনিস আমি পরবই বা কেন? আচ্ছা লোক তো আপনি।
ভদ্রলোক বোধহয় একটু লজ্জাই পেলেন, আহা, রাখুন না মশাই। ক্ষতি তো কিছু। নেই। বিপদে আপদে তো মানুষই তো মানুষের কাজে আসে, না কি?
বিপদ? কীসের বিপদ? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
বুঝতে হবে না। শুনুন, ঝড়ঝঞ্ঝা, বজ্রপাত যাই ঘটুক, পৃথিবী এদিক থেকে ওদিক হয়ে যাক, আপনি এই মালা খুলবেন না। যদি বাঁচতে চান, এই আপনার প্রাণভোমরা। এটি কাছছাড়া করবেন না। যা বললাম, মনে থাকে যেন। এই প্রথম ভদ্রলোকের কণ্ঠ গাঢ় আর গম্ভীর হয়ে এল।
শুনে চমকে গেল অতীন। ভদ্রলোক ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন। অতীনও উঠে দাঁড়ায়, কঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, আপনি কে দাদা? নামটা একটু বলবেন?
ভদ্রলোক হেসে বললেন, নাম জেনে কী করবেন? আপনার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আর নেই বললেই চলে। তবুও যখন জানতে চেয়েছেন তখন তো নামটা বলতেই হয়, আমার নাম হচ্ছে কে এন মৈত্র, বাবা মহেশ মৈত্র। নবদ্বীপের মৈত্র বংশের ছেলে আমি।
বলে একটু চুপ করেন। অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে এসেছে তখন, সেই অন্ধকারে ভদ্রলোক যেন মিলিয়ে যেতে থাকেন, সেখান থেকেই তাঁর গলার স্বর ভেসে আসে, অবশ্য যে বইটা লিখেছি, তাতে আপনি দেখবেন আমার নামের পাশে অন্য উপাধি লেখা আছে। লোকে আমাকে সেই উপাধিতেই বেশি চেনে, আগমবাগীশ। আমার পুরো নাম কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ।
